পদ্মাবতী রাজপুতদের গৌরবের ছবি

0

তসলিমা নাসরিন, টিডিএন বাংলা : মুক্তি পাওয়ার প্রথম দিনই, ২৫ জানুয়ারিতে, দিল্লির সিনেমাঘরে দেখে নিলাম ‘পদ্মাবতী’ ছবিটি (পদ্মাবত না বলে পদ্মাবতীই বলছি। সন্ত্রাসীদের চাপে কোর্ট কাচারি করে নাম বদল করায় বিশ্বাস করি না বলেই নতুন দেওয়া নামটি নিচ্ছি না)। একটু ভয়ে ভয়েই ছিলাম, কোনও বোমা টোমা ফাটে কিনা সিনেমাঘরে। না, কোনও চরমপন্থী রাজপুতের দেখা পাইনি, বরং দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বসে ছিল মাল্টিপ্লেক্সের সামনে। পুলিশ দেখে নির্ভয়ে দেখলাম পদ্মাবতী। কে বলে লোকে ভয় পেয়ে পদ্মাবতী দেখতে যাচ্ছে না? পদ্মাবতী হাউজফুল যাচ্ছে। সামনের রো’ও, যেখানে কেউ বসতে চায় না, উপচে পড়ছে দর্শকে। কায়ক্লেশে টিকিট পেয়েছি সন্ধ্যের শো’র। ছবিটি যখন দেখছিলাম মনে হচ্ছিল নিষিদ্ধ কিছু দেখছি। ছবিটি নিষিদ্ধ করার জন্য গত বছর থেকেই রাজপুতদের একাংশ বিষম খেপেছে, এমনই তাণ্ডব শুরু করেছে যে ছবি মুক্তি পাওয়ার তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, ছবি সেন্সর বোর্ডে গেছে দু’দুবার, কাটাকাটি, নাম বদল অনেক কিছুই ঘটেছে, শেষ অবধি সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছে এ ছবি মুক্তি পাবে সারা দেশে, কোনও রাজ্য যেন ছবিটিকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা না করে।  ছবি মুক্তি পেয়েছে বটে, তবে সব রাজ্যে নয়। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মানতে বয়েই গেছে সবার। কেউ কেউ বলে দিয়েছে, ছবি মুক্তি পাওয়া মানে রক্তারক্তি ঘটা, ওটি ঠেকানো যাবে না। হাঙ্গামা যারা করে, তাদের বেঁধে নিয়ে যাও, না, ওটি করতে কোনও রাজ্য রাজি নয়। কর্ণী সেনার হাতে হাতকড়া পরায়, এত বুকের পাটা সরকারি দলেরও কারও নেই।
কর্ণী সেনা নামের একটি চরমপন্থী রাজপুত দল কিছুকাল আগে গজিয়েছে, আগুন লাগাচ্ছে নানা জায়গায়, বাচ্চাদের স্কুল বাসেও হামলা করেছে, দোকানপাট ভেঙেছে, দলবল নিয়ে যত্রতত্র সন্ত্রাস চালিয়েছে, তাদের একটিই কথা, পদ্মাবতীকে মুক্তি পেতে দেবে না তারা, কেউ যেন ছবিটি দেখতে কোনও সিনেমাঘরে না যায়।  জনগণের সম্পত্তি যারা ভেঙে দিচ্ছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে- তাদের কেউ শাস্তি পাচ্ছে না। কোনও কোনও রাজ্য সরকার তো একরকম পক্ষই নিল চরমপন্থীদের। এখানেও নাকি ভোটের হিসেব আছে। এতকাল শুনেছি মুসলিমদের ভারতের ভোট ব্যাংক হিসেবে দেখা হয়, এখন শুনি হিন্দুরাও ভোট ব্যাংক। হিন্দুরাই হিন্দুত্ববাদি আর হিন্দু-জাতীয়তাবাদীদের ভোট ব্যাংক।

আমি ভেবেই নিয়েছিলাম, সঞ্জয় লীলা বানসালি তার পদ্মাবতীতে রাজপুতদের অসম্মান করে কিছু দেখিয়েছেন, তা না হলে এত কেন তাণ্ডব হচ্ছে দেশ জুড়ে! বানসালি রাজস্থানে শুটিং করতে গিয়ে মার খেলেন, মৃত্যুর হুমকি পেলেন, মাথার দাম ঘোষণা হলো তার, ছবির নায়িকা দীপিকার নাক কেটে নেওয়া হবে, তাকেও নাকি মেরে ফেলা হবে! কিন্তু সারা ছবিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম কোথাও রাজপুতদের সামান্যও অসম্মান করা হয়েছে কিনা, কোথাও আলাউদ্দিন খিলজিকে ভালো মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে কিনা। না, হয়নি। বাস্তবে এত ঘৃণ্য ছিলেন কিনা খিলজি, জানিনা; কিন্তু পদ্মাবতী ছবিতে তাঁকে শুধুই বর্বর, শুধই বিশ্বাসঘাতক, শুধুই বীভৎস, শুধুই অসৎ, অসভ্য, অসুস্থ, অত্যাচারী, অমানবিক, অনৈতিক একটি ধর্ষক আর খুনি হিসেবে দেখানো হয়েছে। রাজা রতন সিং এবং রাণী পদ্মাবতী মানুষ হিসেবে এত নিখুঁত ছিলেন কিনা জানি না, পদ্মাবতী ছবিতে তাঁরা সম্পূর্ণ নিখুঁত, নিষ্পাপ, নির্দোষ নর-নারী। মহামানবও বলা চলে। আর গোটা রাজপুত সম্প্রদায় অসম্ভব সাহসী, অসম্ভব দেশপ্রেমিক। রাজপুত পুরুষেরা যেমন বীর, তেমন বীর রাজপুত রমণীরা। তাহলে ছবির কোন গল্প, বা কোন দৃশ্য কর্ণী সেনাকে ক্ষুব্ধ করেছে? আমি তো বিন্দুমাত্র নিরপেক্ষও কিছু পাইনি! সবই একপক্ষ, সবই রাজপুতপক্ষ। অবশ্য কর্ণী সেনারা তো ছবিটি এখনও দেখেনি। না দেখে শুধু সন্দেহ করেছে। শুধু সন্দেহের বশে সন্ত্রাস ঘটানো! কী অদ্ভুত! কেউ তাদের থামাতে পারেনি। বিজেপি সমর্থক মিডিয়াও কর্ণী সেনাকে প্রাণ খুলে দোষারূপ করছে, তাতেও কাউকে দমানো যায়নি। আমার কিন্তু মনে হয় কর্ণী সেনারা যদি পদ্মাবতী দেখে, তাহলে তারা প্রেমে পড়ে যাবে এটির। ছবিটিকে তারা রাজপুতদের জাদুঘরে রাখবে। রাজপুতদের পক্ষে এর চেয়ে ভালো ছবি আগে কখনও বানানো হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। অবশ্য কর্ণী সেনার যদি অন্য কোনও বদ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে মনে মনে তারা ছবিটাকে ভালো বললেও মুখে বলবে না, বরং আগুন ধরাবে জনগণের সম্পত্তিতে, দৌড়ে যাবে সিনেমা হল পোড়াতে।

পদ্মাবতী ছবিটিকে সঞ্জয় লীলা বানসালি বিশাল ক্যানভাসে দিয়েছেন, চোখ ফেরানো যায় না এমন সব দৃশ্য দিয়েছেন। ১৫৪০ সালে লেখা এক সুফি কবির কবিতা অবলম্বনে ছবিটি বানিয়েছেন তিনি। কবিতা যেমন সহজ সরল। ছবিও তেমন। যারা ভালো, তারা খুব ভালো, তাদের কোনও মন্দ দিক নেই আর যারা মন্দ, তারা খুব মন্দ, তাদের কোনও ভালো দিক নেই। মনস্তাত্বিক জটিলতা এ ছবিতে অনুপস্থিত। অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। পদ্মাবতীতে ইতিহাস কতটুকু, আর রূপকথা কতটুকু, তা ষ্পষ্ট করে কেউ বলতে পারেনি।  আলাউদ্দিনের চিতোর দখল ইতিহাসে থাকলেও, পদ্মাবতীকে পাওয়ার জন্য দিল্লির সুলতান উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন, তা নেই। মুখে মুখে অনেক গল্পই তো প্রচার হয়। হতে পারে পদ্মাবতীর পুরো গল্পটা শুধই গল্প। অথবা ছিল পদ্মাবতী নামে রূপে গুণে অনন্যা এক রমণী, যার আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা না হলেও মানুষের মনেই লিখিত হয়ে আছে। শতাব্দির পর শতাব্দি পার হয়, পদ্মাবতী রয়ে যায়। রয়ে যায় গল্প-কবিতায়।

আলাউদ্দিন খিলজির সৈন্য দ্বারা নিহত রাজপুত পুরুষদের বিধবা স্ত্রীদের নিয়ে রাণী পদ্মাবতী আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন।   কারণ শত্রুর হাতে তারা ধরা দেবেন না এই ছিল তাদের প্রতিজ্ঞা।  ঘটনা সত্য হোক, বা না হোক, বানসালির তৈরি আত্মাহুতির দৃশ্য বড় মনোমুগ্ধকর।  শত্রুর যৌনদাসি হওয়ার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়; এটি মানা যায়, কিন্তু স্বামী নেই বলে আমিও নেই, আমার কোনও মূল্য নেই, অস্তিত্ব থেকেও অস্তিত্ব নেই-এটি মানা যায় না। সঞ্জয় লীলা বানসালি ছবির শুরুতে বলে দিয়েছেন এ ছবি সতী প্রথার পক্ষে নয়। বলে দিলেই যে সবাই কথা শোনে, তা তো নয়। উপদেশবানীর চেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষকে প্রভাবিত করে বেশি। হয়তো কোনও বিধবা ঠিক যেভাবে পদ্মাবতী মাথা উঁচু করে, গর্বভরে, এগিয়ে যান আগুনের দিকে, সেভাবেই ঐতিহ্য রক্ষা করতে এগিয়ে যাবেন।

চিতোরের রাণীর নাম ছিল পদ্মিনী। পদ্মিনীকে নিয়ে গল্পকথা লেখা হয়েছে, নাটক হয়েছে, এমনকী সিনেমাও বানানো হয়েছে এই ভারতবর্ষে। কিন্তু ওসবের বিরুদ্ধে রাজপুতরা ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করেনি। ১৯০৬ সালে প্রসাদ বিদ্যাবিনোদের নাটক ‘পদ্মিনী’তে দেখানো হয়েছে আলাউদ্দিন খিলজি কামনা করেছিলেন পদ্মিনীকে, পদ্মিনী উদ্ধার করেছিলেন বন্দি স্বামীকে, স্বামীর পরাজয় হলে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন আগুনে। ১৯০৯ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন  ‘রাজকাহিনী’। এই গল্পে চিতোরকে রক্ষা করার জন্য রাজা রতন সিং পদ্মিনীকে খিলজির হাতে সমর্পন করার প্রস্তাব দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অন্য রাজপুতরা মানেনি সেই প্রস্তাব। ১৯৬৩ সালে ‘চিতোর রাণী পদ্মিনী’ নামে একটি তামিল ছবি বানানো হয়েছিল। পদ্মিনী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বৈজয়ন্তিমালা। রতন সিং-এর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শিবাজি গণেশন। ১৯৬৪ সালে তৈরি হয় হিন্দি ছবি, নাম ‘মহারাণী পদ্মিনী’। এসব ছবি নিয়ে কোনও হাঙ্গামা হয়নি। আগে যা হয়নি, এখন তা হলো। মানুষ শুনেছিলাম দিন দিন সভ্য হয়, সহিষ্ণু হয়, আমাদের অঞ্চলেই বুঝি সবাই অসভ্য আর অসহিষ্ণু হচ্ছে। টেলিভিশনেও পদ্মিনীর গল্প দেখানো হয়েছে। শ্যাম বেনেগালের ‘ভারত এক খোঁজ’ এর একটি অংশেও পদ্মিনীর গল্প আছে। ২০০৯ সালেও টেলিভিশনে দেখানো শুরু হয়েছিল ‘চিতোর কি রাণী পদ্মিনী কা জওহার’। আলাউদ্দিন খিলজির পদ্মিনী-মোহর কথা নাটকে সিনেমায় সবখানেই বলা হয়েছে। কিন্তু রাজপুতরা কখনও এমন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেনি। সত্যি কি তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে, এমন কিছু এই ছবিগুলোর কোথাও আছে?  অনুভূতি হঠাৎ এমন দুর্বল হয়ে উঠলো কেন রাজপুতদের সেটাই ভাবি। এর পেছনে রাজনৈতিক বদ উদ্দেশ্য থাকলেই কর্ণী সেনা ক্ষমা চাইবে না। তা না হলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য,মানুষের মাথার দাম ধার্য করার মতো অপরাধের জন্য ক্ষমা তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চাইবে। সঞ্জয় লীলা বানসালির মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর কারো বোধহয় প্রয়োজন নেই। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশে হিন্দুকে উচ্চ মর্যাদা দিয়ে, হিন্দু ঐতিহ্যের ভূয়সী প্রশংসা করে, বহিরাগত মুসলিমের বর্বরতা আর নীচতা তুলে ধরে ‘পদ্মাবতী’ নামের চলচ্চিত্র তিনি নির্মাণ করেছেন। ভারতের অধিকাংশ মানুষের মতের চেয়ে ভিন্ন কোনও মত তিনি প্রকাশ করেননি। বরং কেউ কেউ বলতে পারেন, খিলজির কি গুণ বলতে একেবারেই কিছু ছিল না? অন্তত অর্থনীতির সংস্কার করতে বা কালো বাজারি বন্ধ করতে তার ভূমিকা ছিল- একথাও বলা হয়নি ছবিতে। কর্ণী সেনা যা চেয়েছে, তাই আছে ছবিতে। খিলজি ঘৃণ্য লোক, রাজপুতরা মহান। এ ছবি রাজপুতদের গৌরবের ছবি।  ১০০ ভাগ।
(সৌজন্যে-বাংলা ট্রিবিউন)