‘অাম্মা’র জন্য এখনও কান্না, দেবী মেনে করা হচ্ছে পুজো

0
টিডিএন বাংলা ডেস্ক : জয়ললিতা, জয়রাম, জে জয়ললিতা, কুমারী জয়ললিতা, জয়, পুতরাচি থালাইভ এমন সব নামেই তিনি সমীহান। সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে যে সিঁড়িতে পা রেখেছেন সেখানেই নয়া অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। যশ অার খ্যাতির মহিমায় তিনি ভারতীয় রাজনৈতিক অাঙিনায় অনন্য।
কত নাম তার! তবুও সকল নামের চৌকাঠ পেরিয়ে তিনি ‘অাম্মা’ নামে যে মুকুট পরেছিলেন, তা মৃত্যুর পর যেন অারও সমুজ্জ্বল।
‘অাম্মা’র জন্য এখনও কাঁদছে চেন্নাই। কাঁদছে গোটা তামিলনাড়ু। তামিল মুল্লকে তিনি দেবী, তিনি মা, তিনি স্বয়ং ভগবান যেন! ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে অার কোনো নেতার জন্য অনুসারীরা এতো অাবেগের পেয়ালা ঢেলেছেন -এমন নজির নেই, সম্ভবত। তিনি দেবদূত। নইলে এতো ভালোবাসা অাগলে রাখেন কী করে?
‘অাম্মা’র চলে যাওয়া বছর গড়িয়েছে গত ডিসেম্বরে। তবুও তাজা ফুলের মালায় পূজা মিলছে রোজ রোজ। সাগর পাড়ের শহর চেন্নাইয়ের অানাচে কানাচে মায়ের ছবি সাটানো। পোস্টারে পোস্টারে ‘অাম্মা’। দোকানে দোকানে পূজো হয় ‘অাম্মা’র ছবিতেই। গাড়ি, টেক্সি, এমনকি মোটরসাইকেলও আম্মার ছবি সাটানো। কতক মন্দিরেও ঠাঁই মিলেছে ভালোবাসার পূজারি ‘আম্মা’ জয়ললিতার ছবি।
পড়নে তামিল লাড়ুর ঐতিহ্যবাহী শাড়ি। কোনো ছবিতে কপালে লাল টিপ, কোনোটিতে কালো। অাবার মঙ্গল ফোটাও অাছে মাঝ কপালে। বাম হাতে ঘড়ি। হাত জোড় করে প্রণামরত ছবিগুলো যেন নগরবাসীর সুরক্ষা দিচ্ছে। সেই চিরচেনা হাসির ছবিগুলো থেকেই বেরিয়ে অাসতে চাইছে ‘মা’ জয়া।
দুর্গম পথ মাড়িয়ে শ্রদ্ধা অার ভালোবাসার যে অাসনে বসেছিলেন তামিল এ অভিনেত্রী, তার নিদর্শন মিলছে মেরিনা সুমদ্র সৈকতেও। সৈকত পাড়েই শায়িত ‘অাম্মা’। খোলা অাকাশ। সাগরের নির্মল বাতাস। অার ভারত মহাসাগরের উত্তাল ঢেউগুলো যেন পাহাড়া দিচ্ছেন এ সাগর কন্যাকে। গর্জনে গর্জনে মেলে ধরছেন জয়ললিতার রাজনৈতিক জীবনের গল্পগাঁথা। অার মানুষের ভালোবাসা তো অাছেই। বিকেলের পর তিল ধরার ঠাঁই মেলে না জয়ললিতার সমাধিস্থলে। ফুল অার অশ্রু জলে শ্রদ্ধা নিবেদন চলে দিনরাত।
পাশেই জয়ার রাজনৈতিক গুরু তামিল লাড়ুর সাবেক মূখ্যমন্ত্রী এমজি রামচন্দ্রণের সমাধি। তামিল অভিনেতা রামচন্দ্রনের হাত ধরেই সিনেমা জগতে প্রবেশ জয়ার। প্রচার রয়েছে কৈশোর প্রেমে বিচ্ছেদ ঘটায় পুরুষে অার অাস্থা রাখেতে পারেনি তিনি। অভিনয় অার রাজনীতির গুরু এমজি রামচন্দ্রনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা শোনা গেলেও জয়ললিতার ব্যক্তিগত জীবনে পুরুষের যে অনুপ্রবেশ ছিল না, এটিও সর্বজন স্বীকৃত।
রামচন্দ্রণের দ্বিতীয় স্ত্রী জানকিও বাধা ছিলেন গুরু-শিষ্যের ব্যক্তি জীবনে। তবে মরণের পর অার অালদা থাকতে পারেনি। মেরিনা সুমদ্র সৈকত ঘেঁষেই দু’জনের পাশাপাশি সমাধি। একই থালার ফুলে পূজো মেলে দু’জনায়।
১৯৪৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মহীশূরের মাণ্ড্য জেলার পাণ্ডবপুরায় জন্ম নেন জয়ললিতা। দু’বছর বয়সেই বাবাকে হারান। সংসার চালাতে মা চেন্নাইয়ে এসে অভিনয় জগতে পা রাখেন। মায়ের দেখানো পথে পা বাড়িয়ে ১৯৬১ সালে জয়ললিতাও অভিনয়ে নাম লেখান। ১৯৮০ পর্যন্ত প্রায় ১৪০টি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি।
১৯৮২ সালে অভিনেতা তথা তামিলনাড়ুর প্রাক্তণ মূখ্যমন্ত্রী এমজি রামচন্দ্রণের দীক্ষা নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন জয়ললিতা। ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভায় সাংসদ হিসাবে কাজ করেন তিনি। ১৯৮৭ সালে রামচন্দ্রণ প্রয়াত হলে দলে বিভাজন তৈরি হয়। একদল ছিলেন এমজিআরের স্ত্রী জানকি রামচন্দ্রণের দিকে আর একদল ছিলেন জয়ললিতার সঙ্গে। তার দুই বছরের মধ্যেই তামিলনাড়ুর মূখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন জয়া। তারপর ধীরে ধীরে রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে মহীরূহ হয়ে ওঠেন। জনতার ভালোবাসায় পাঁচবার মূখ্যমন্ত্রী হয়ে কেন্দ্রীয় অনুঘটক বনে যান।
২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জয়ললিতা। তার মৃত্যুতে গোটা রাজ্যজুড়ে শোকের ছাঁয়া নেমে অাসে। অাম্মার চলে যাওয়ার শোক সামলাতে না পেরে অনেকে আত্মহত্যাও করেন।
চেন্নাই শহরের রত্নানগরেরর বাসিন্দা কুমার বিশ্বাস। কুমার ট্রাভেল এজেন্সির সত্বাধিকারী। কথা হয় প্রিয় নেত্রী জয়ললিতা প্রসঙ্গে। বলেন, অাম্মা (জয়ললিতা) অামার মুক্তির দেবী। রাজনীতি নিয়ে এখানে বিভাজন থাকতে পারে কিন্তু আম্মার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাতে কোনো বিভাজন নেই। তিনি এখনও জীবিত তামিলদের কাছে।
সায়েম সাবু >> চেন্নাই থেকে