প্রজাতন্ত্র দিবসের আগেই পদ্মাবত নিয়ে উগ্রহিন্দুবাদী সংগঠনের হাঙ্গামা, নিন্দা বুদ্ধিজীবীদের

0

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ঠিক প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে পদ্মাবত নিয়ে হিন্দুবাদী সংগঠনগুলি যেভাবে হাঙ্গামা চালাচ্ছে তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বাংলার বুদ্ধিজীবীরা। বৃহস্পতিবার ছবিটি মুক্তি পাবার পর দর্শকরা জানিয়েছে, ছবিতে হিন্দু ধর্মকে আঘাত করেছে এমন আপত্তিকর কিছু নেই। এদিকে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে যেভাবে তান্ডব চালিয়েছে এক শ্রেণীর লোক তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। ভাষা ও চেতনা সমিতির সম্পাদক অধ্যাপক এনামুল হক এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে টিডিএন বাংলাকে বলেন,”ফ্যাসিবাদী সরকার চলছে দেশে। পরিকল্পিত ভাবে আগুন জ্বালিয়ে বিদ্বেষ ছড়িয়ে মেরুকরণের চেষ্টা। বিচারক লোয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত অমিত শাহ।
সেই ঘটনা যাতে মানুষের মনে দাগ না কাটে, সংবাদ মাধ্যম এই সব বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাই করণি সেনার নামে আর এস এস, বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এই সব করছে। দেশে সেনাবাহিনী আছে।
তো করণি সেনা, হিন্দু সেনা , রণবীর সেনা নাম থাকা তো দেশদ্রোহের সামিল।
এই তাণ্ডব, আগুন শিশুদের স্কুল বাসে আক্রমণ যদি কাশ্মীরে হতো তবে পেলেট গান চলতো। মেশিনগান দখল নিত রাস্তার।
বিভেদমূলক আচরণ করছে মোদি সরকার। সুপ্রিম কোর্টের রায় মানছে না, সিনেমা হল পোড়াচ্ছে, বিভাজনের হুমকি দিচ্ছে– তবু বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারগুলি চুপ। এই সরকারকে বরখাস্ত করা উচিত সুপ্রিম কোর্টের ।”
দলিত নেতা শরদিন্দু উদ্দীপনের মন্তব্য,”মোদী ঘনিষ্ট একজন শিল্পপতিইতো পদ্মাবত ছবির জন্য ফিন্যান্স করেছে।পরিকল্পিত ভাবেই এই তান্ডব করা হচ্ছে। পদ্মাবতকে নিয়ে যেভাবে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে তা সংবিধান বিরোধী।অবাক ব্যাপার এইসব হিন্দুবাদী শক্তি সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ মানছে না। যদি এই তান্ডব কোনও মুসলিম করতো তবে দেশে কী হতো ঠিক নেই। আসলে বিজেপির কোনও জনসমর্থন নেই। সামনে ভোট আছে কিছু রাজ্যে। সেই জন্য এইসব করছে।”
কবি কৃষানু বসুর প্রতিক্রিয়া,”আমিতো ছবিটা দেখিনি এখনো। তবে এক্ষেত্রে প্রযোজক, পরিচালকদের ভূমিকাও কিন্তু সন্দেহের উর্দ্ধে নয়। ছবিটির ব্যবসা এবং প্রচারের দায়িত্বও তো নিয়ে ফেলেছে তথাকথিত ‘হিন্দুসেনা’!”
ইতিহাসের শিক্ষক ও লেখক কাজী মাসুম আখতারের মন্তব্য,” ইতিহাস নিয়ে এহেন বিকৃতিতে আমি শোকাহত।
ইতিহাসে কোথাও পদ্মাবতীকে নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। পদ্মাবতীর গল্প  দিল্লির অন্যতম শ্রেষ্ঠ  সুলতান আলাউদ্দিন খলজির চিতোর অভিযানের ২৪০ বছর পর প্রখ্যাত লেখক ও কবি মালিক মহম্মদ জয়সীর লেখা একটি কাব্যগ্রন্থ-এর অংশ। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে রচিত ওই গ্রন্থটির আসল নাম ‘পদুমাবৎ’। ১৬৪৮ সালে কবিতাকারে ‘পদ্মাবতী’নামে ওই গ্রন্থটিকে বাংলায় অনুবাদ করেন মধ্যযুগের বাংলার বিখ্যাত কবি আলাওল। যা আসলে চিতোরের রাজা রতন সিং ও রানী পদ্মাবতীর অপূর্ব প্রেম কাহিনী।অথচ ইতিহাসের সঙ্গে প্রায় সম্পর্করহিত কাব্যরস সমৃদ্ধ একটি গল্পকে চিত্রনাট্যের রূপ দিয়ে সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘পদ্মাবত’ সিনেমাকে ঘিরে কয়েকটি রাজ্যে  যে তান্ডবলীলা চলছে, মধ্যযুগেও তেমন পাগলামির  নজির প্রায় বিরল। দু বেলা অন্নের অভাবে অভুক্ত থাকে যে দেশের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ, ধর্ম ও জাতিগত অহমিকার নামে,সিনেমাটি না দেখেই, ইতিহাসের বিন্দুবিসর্গ না জেনে, রাজনৈতিক ব্যাবসায়ী তথা কিছু ধর্মের ঠিকাদারদের উস্কানিতে এহেন দুষ্কর্ম–মনে হয় এই উপমহাদেশেই সম্ভব। সুপ্রিম কোর্ট তথা গণতন্ত্রের এহেন অবমাননা আর আমরা কতদিন সইবো?”
কিন্তু ঠিক প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে হিন্দু সংগঠন গুলির এই হিংসা আশ্রিত কার্যক্রম কেন? উঠছে প্রশ্ন। এসআইও-র প্রাক্তন কেন্দ্রীয় নেতা কলকাতার সাদাব মাসুম বলেন,”আসলে ওরা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর। প্রজাতন্ত্র দিবস নিয়ে আলোচনা ছেড়ে এখন ওই ছবি নিয়ে আলোচনা চলছে।”
ডিএনপির ইমতিয়াজ আহমেদ মোল্লা টিডিএন বাংলাকে বলেন,”পদ্মাবত ছবি নিয়ে করনী সেনা বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তি যে তান্ডব শুরু করেছে তাতে মনে হচ্ছে ভারতের  পুরানো অন্ধকার যুগ ফিরে এসেছে। সেই বৈদান্তিক যুগ, যখন সাধারন মানুষের মানবাধিকার বলে কিছু ছিল না। শক হুন মুঘল পাঠান ফ্রেঞ্চ পর্তুগিজ ও বৃটিশদের হাতে পড়ে ভারত যেটুকু সভ্য হয়েছিল মানে যেটাকে আমরা ভারতীয় সভ্যতা বলে থাকি,মনে হয় তার এক্সপায়ারি ডেট পার হয়ে গেছে।”

head_ads