নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সবথেকে অনুগামী সমর্থক ছিলেন মুসলিমরা

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

নির্মলেন্দু কুণ্ডু

Advertisement
head_ads

বর্তমান ভারতের প্রেক্ষাপটে একটি বড় সমস্যা হল সাম্প্রদায়িক সমস্যা৷ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সমস্যাটির বিষময় ফল সম্পর্কে আমরা সকলেই ওয়াকিবহাল৷ অথচ আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল চিত্র৷ যুগে যুগে সম্রাট-সুলতান-বাদশাহের আমল থেকে আধুনিক রাজনৈতিক নেতাদের আমল পর্যন্ত বিভেদের বদলে ঐক্যের সুর শোনা গেছে বারে বারে৷ বাঙালির চিরন্তন যুগনায়ক তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারি সুভাষচন্দ্র বসুও তার ব্যতিক্রম নন৷

শিশু বয়স থেকেই সুভাষের মনে কোন ধর্মীয় বিভেদ গড়ে ওঠেনি৷ কটকের ওড়িয়া বাজারের যে এলাকায় তাঁদের বাড়ি ছিল, তার আশেপাশে বহু মুসলিম পরিবার বাস করতেন৷ তাঁর পিতা জানকীনাথ বসুও মুসলিম পাচকদের রান্না করা খাবার খেতেন৷ মহরমের মতো  অনুষ্ঠানে বসু পরিবার যোগ দিতেন৷ তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী “An Indian Pilgrim”-এ সুভাষ তাই বলেছিলেন, ”I was lucky, however, that the environment in which I grew up was on the whole conducive to the broadening of my mind. “সুতরাং এ’ কথা বলা যায় যে, পিতা-মাতার প্রভাবেই সুভাষচন্দ্রের মধ্যে একটা ভেদাভেদহীন আধ্যাত্মিক মনোভাব গড়ে উঠেছিল৷ স্বামী বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য সুভাষের মধ্যে এই মনোভাব আজীবন বজায় ছিল৷ তিনি বিশ্বাস করতেন, ভারতের প্রগতি তথাকথিত পিছিয়ে পড়া অস্পৃশ্যদের উন্নতির ওপর নির্ভরশীল৷ তিনি ভারত থেকে জাতিভেদ প্রথাকেই তুলে দিতে চেয়েছিলেন এবং সেই মর্মে ‘অস্পৃশ্যতা-বিরোধী সপ্তাহ’ পালন করেছিলেন৷ তিনি সমস্ত ধর্মের প্রতি পক্ষপাতহীন মনোভাব পোষণ করতেন৷ তাঁর মতে, স্বাধীন ভারতীয় সরকারেরও উচিৎ সর্বধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ মনোভাব বজায় রাখা ও প্রত্যেক ভারতীয়কে তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালনের সুযোগ দেওয়া৷ ধর্মের মতো একটি ব্যক্তিগত ব্যাপারে রাষ্ট্র কখনোই হস্তক্ষেপ করতে পারে না৷ তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, কোন সন্ধিচুক্তি বা ক্ষমতার বন্টন সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান করতে পারে না৷ অবিশ্বাস দূরীকরণ ও প্রত্যয় জাগানোটাই হল আসল কথা৷ হরিপুরা কংগ্রেসের (১৯৩৮) সভাপতির ভাষণেও তিনি ভিন্ন ভাষা ও ধর্ম-অধ্যুষিত অঞ্চলের ধর্ম ও সংস্কৃতির বিষয়ে কোনরকম হস্তক্ষেপ না করার ওপর জোর দেন৷

আন্তজার্তিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র ছিলেন ওয়াকিবহাল৷ সোভিয়েত রাশিয়ার দৃষ্টান্ত তুলে তিনি বারবার বলতেন, এত ভিন্নগোত্রীয় মানুষ থাকা সত্ত্বেও যখন রাশিয়া একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচিতিতে আবদ্ধ হতে পেরেছে, তখন ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য আসবে না কেন? বার্লিন রেডিও থেকে সম্প্রচারিত বার্তাতেও সুভাষ (১৯৪১,৭ই ডিসেম্বর) আগত সুযোগকে কাজে লাগাতে জাতি ও ধর্মনির্বিশেষে সংঘবদ্ধ হওয়ার ওপর জোর দেন৷ তাঁর বুকপকেটে সর্বদা ভগবদ্গীতার একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ থাকতো এবং সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন তিনি প্রায়শই শেষ রাতে রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে ধ্যানমগ্ন হতেন৷ তবে তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মচিন্তাকে তিনি কখনোই বাকিদের ওপর চাপাতে চাননি৷ ১৯৪৩ সালে সুভাষ বলেছিলেন, “আমার জাতীয় আন্দোলনে ধর্মীয় প্রশ্নের কোন স্থান নেই৷ সমস্ত ভারতীয়দের মধ্যেই আমার অনুগামী আছে, বিশেষত সেইসব মুসলমানদের মধ্যে যাদের ইংরেজরা বিচ্ছিন্নতাবাদী লক্ষ্যের অনুগামী বলে মনে করে৷”

সুভাষচন্দ্রের কথা বলতে গেলে আজাদ-হিন্দ-ফৌজের কথা এসেই যায়৷ভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের সেনাদের নিয়ে নেতাজী সুভাষ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ফৌজ৷ এঁদের লিখিত স্মৃতিকথায় দেখা যায়, তাঁরা ভারতীয় হিসেবে পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করতেন৷ তাঁদের এই মনোভাবের পশ্চাতে ছিল তাঁদের নেতা নেতাজীর প্রতি গভীর শ্র্রদ্ধাবোধ, যাঁর কাছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ছিল অভিশাপস্বরূপ৷ ফৌজে সবার জন্য একটি সাধারণ রান্নাঘরের ব্যবস্থা ছিল৷ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন এই ব্যবস্থাকে “সাম্প্রদায়িক সমস্যার চমৎকার সমাধান” বলেছেন৷ ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীতটি নিয়ে যাতে বিভেদ মাথাচাড়া না দেয়, তাই তিনি কবিগুরুর ‘জন-গণ-মন’-কে ফৌজের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যার ভাষা ছিল সকলের গ্রহণযোগ্য হিন্দুস্থানী৷

সুভাষের অন্যতম সেনাপতি শাহনওয়াজ খান বলেছিলেন,সুভাষের কাছে কোন ধর্মীয় বা প্রাদেশিক বিভাজন ছিল না৷ হিন্দু-মুসলিম ও শিখ সৈন্যদের শেখানো হয়েছিল যে, তাঁরা একই মাতৃভূমির সন্তান৷ এটাও দেখা গিয়েছিল, নেতাজীর সবথেকে অনুগামী সমর্থকরা হচ্ছেন মুসলমান৷ দৃষ্টান্তস্বরূপ লেফটেনান্ট কর্ণেল শাহনওয়াজ খান রেঙ্গুনের এক  ধনী বণিক মি. হাবিবের কথা বলেছেন, যিনি নেতাজীর গললগ্ন একটি মালার জন্য তাঁর ১ কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছিলেন৷ আমরা আজাদ-হিন্দ-ফৌজের দিকে তাকালেই দেখতে পাই উচ্চপদে আসীন ছিলেন বিভিন্ন মুসলমান অফিসার৷নিচে একটি সারণী দেওয়া হল—

পদ/রেজিমেন্ট       |  সেনাপতি

ফার্স্ট ফিল্ড ফোর্স   |  লেফটেনান্ট কর্ণেল
রেজিমেন্ট              | এস.এম.হুসেন
———————————————————
সেকেন্ড গেরিলা     |  লেফটেনান্ট কর্ণেল
রেজিমেন্ট             |  আই.জে.কিয়ানি
———————————————————
ফোর্থ নেহরু          | লেফটেনান্ট কর্ণেল
রেজিমেন্ট            | আর.এম.আর্শাদ
———————————————————
ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ | লেফটেনান্ট কর্ণেল
| শওকত মালিক
———————————————————
রিইনফোর্সমেন্ট  | লেফটেনান্ট কর্ণেল
গ্রুপ                    | তাজাম্মুল হুসেন
———————————————————

এছাড়া ১৯৪৩-র ২১ শে অক্টোবর যে আজাদ-হিন্দ-সরকার স্থাপিত হয়েছিল, তাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদে লেফটেনান্ট কর্ণেল আজিজ আহমেদ, এহেসান কাদির, শাহনওয়াজ খান, এম.জেড.কিয়ানির মতো ব্যক্তিরা ছিলেন৷ নেতাজীর উপদেষ্টা ছিলেন করিম ঘানি ও ডি.এম.খান৷ মেহেবুব আহমেদ ছিলেন মিলিটারি সেক্রেটারি৷ সুভাষের সাবমেরিন যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন মেজর আবিদ হাসান এবং ফরমোজায় তাঁর শেষ যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন হাবিবুর রহমান৷ ইম্ফলের মৈরাঙে যখন প্রথম স্বাধীন ভারতের মাটিতে ভারতীয় জাতীয় পতাকা ওড়ানো হল, তখন সেই কাজটি করলেন শওকত মালিক৷ সাইগন ও ব্যাঙ্ককে নীতি প্রচারের কাজে রত ছিলেন লেফটেনান্ট কর্ণেল এহেসান কাদির ও ইনায়েত হাসান৷

ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের মতে, নেতাজী কখনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়ায় বিশ্বাস করতেন না৷ তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকে স্বাভাবিক হিসেবেই ধরতেন৷ আবিদ হাসানও লিখেছিলেন, নেতাজী জাতীয়তার সঙ্গে ধর্মের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন৷ নিজে ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনই প্রকাশ্যে ধর্মচর্চা করেননি৷ এভাবেই ধর্মের প্রতি আসক্তি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জায়গায় এমনভাবে চলে গিয়েছিল, যা কখনোই কর্মক্ষেত্রে ছাপ ফেলতো না৷নেতাজী বিশ্বাস করতেন, কাজ ও সম্পদের অসম বন্টন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিহীনতার কারন৷ তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতীয়দের কাছ থেকে যত অনুদান আসতো, তা আজাদ-হিন্দ-ফৌজের সমস্ত সেনার  রেশন ও ইউনিফর্মের জন্য সমানভাবে বন্টিত হত৷ এমনকি খাবারের বন্টনও হত সমানভাবে৷ তিনি বিশ্বাস করতেন, আর্থিক নানা কারন সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে দূর করতে পারে৷ কারন-দারিদ্র ও বেকারত্বের সমস্যা, অশিক্ষা, অসম করব্যবস্থা ও ঋণগ্রস্ততা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে সমানভাবে প্রভাবিত করে৷ তাই তিনি এগুলি দূরীকরণে সচেষ্ট হতে বলেন৷ তাঁর মনোভাব যদি বর্তমান দিনেও কার্যকর হয়, তবে সম্প্রীতির চেতনাই আরও সম্প্রসারিত হবে৷

ঋণস্বীকার:—
১)Social,Economic and Political Philosophy of Netaji Subhas Chandra Bose—Dr. R.C.Roy
২)An Alternative Experiment:Indian National Army—Sarbani Guptoo
৩)আমি সুভাষ বলছি—শৈলেশ দে
৪)আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে—ডাঃ সত্যেন্দ্রনাথ বসু
৫)তরুণের স্বপ্ন—সুভাষচন্দ্র বসু

(টিডিএন বাংলায় প্রকাশিত লেখাটি ‘আমার সৃজন প্রয়াস’থেকে নেওয়া হয়েছে)

head_ads