বাস দুর্ঘটনায় নিহত সুফিয়া ম্যাডামের মৃত্যুর এক মাস অতিবাহিত, মা হারা সন্তানগুলো কেমন আছে? 

0

টিডিএন বাংলা, মুর্শিদাবাদ : সম্প্রতি মুর্শিদাবাদের দৌলাতাবাদে বাস দুর্ঘটনায় ৪৫ টি তরতাজা প্রানের সাথে মারা গিয়েছিলেন সামশেরগঞ্জের জয়কৃষ্নপুর এ বি এস বিদ্যাপীঠের শিক্ষিকা সুফিয়া মমতাজ। কেমন আছে তার মা হারা সন্তান গুলো? কেমনই আছে বা তার পরিবার?  তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে কিছু কথা লিখেছেন তার স্বামী মফিউল আলম মন্ডল। হুবহু সেটা তুলে ধরা হলো –

” হ্যাঁ বুল্টি।আমি বলছি। শুনছ।সেদিন ২৯শে জানুয়ারী। সোমবার।সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। তখন সকাল ৫ টা ৩০ মিনিট ।আমাদের শেষ বারের মতো একসাথে চা খাওয়া। তারপর আর ৩০ মিনিট একসাথে সময় কাটানো।৬টা ৫ মিনিট। আমাদের এক দশকের শেষ একসাথে মিনিট পাঁচেক এর পথচলা। ৬টা ১০ মিনিটে তোমার বাসে ওঠা।সেই শেষ হাত নাড়া। বহরমপুরের উদ্দেশ্যে তোমার ঘন্টা দেড়েকের যাত্রা শুরু।আমার পত্রপাঠ বাড়ি ফিরে আসা। তখনও তোমার প্রানের চেয়ে  প্রিয় ছেলে ও মেয়ে ঘুমিয়ে ছিল যে।তারপর। মাত্র ৫০ মিনিট। হ্যাঁ। আর মাত্র ৫০ মিনিট তুমি বেচে ছিলে প্রিয়া। সেটা যে তোমার শেষ যাত্রা ছিল।এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। প্রানপ্রতিম সন্তানদের ছেড়ে,স্বামী সংসার ছেড়ে অনন্ত কালের যাত্রা ছিল—আমার  মতো এই পৃথিবীর অধমের জানার কথা নয়। জানতে পারিওনি।

Advertisement
head_ads


এক মাস কাল অতিক্রান্ত। এতটা সময়ের বিচ্ছেদ। তোমার সন্তান তো দুরের কথা। বিগত এক দশকের দাম্পত্যজীবনে তোমার স্বামীর সাথে ও হয়নি। কিন্তু  এটা এখন নির্মম বাস্তবতা। দিন গড়িয়ে মাস আসবে। মাসের পর মাস বছর আসবে। কিন্তু তুমি আর আসবে না প্রিয়তমা। তোমার  সন্তানেরা  তোমাকে আর মা বলে প্রান খুলে ডাকার সুযোগ পাবেনা।হ্যা এটাই তো নাকি পৃথিবীর নিয়ম। নিষ্ঠুর বাস্তবতা!

ধর তোমার  দু বছরের কোলের মানিশ। প্রথম প্রথম নির্দিষ্ট সময়ে দরজা খুললে মা আসছে ভেবে চোখ জ্বলজ্বল করত। ফোনে মেয়ে কন্ঠস্বর ভেসে এলে মা ভেবে মা মা করত। বাকযন্ত্রের প্রথম আন্দোলনে উচ্চারিত শব্দ। প্রথম অভ্যস্ত শব্দ।একমাত্রিক শব্দ। বহুমাত্রিক তাত্পর্য ।ওর আর কি দোষ বল সাথী। এতো নাড়ির টান। উদাহরণ কিংবা উপমা নয়।আদি অকৃত্রিম টান। সেও এখন হয়তো খানিকটা  বিস্মৃত। হয়তো খানিকটা বাস্তবতার স্বীকার। দিন দুয়েক আগের কথা।মায়ের সাথে সাকিল এসেছিল বুল্টি। ওর মাসতুতো দাদা। বড় জোর ওর থেকে বছর চারেকের বড়ো। খানিকটা সান্ত্বনার সুরে যখন মানিশ কে মা কোথায়  জিজ্ঞাসা করে। খানিকটা  তোমার ছেলে হতভম্ব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় উত্তর দেয়। ‘বাসে আসবে বাসে। ভুম করে চলে আসবে।’বাসই যে তার মাকে কেড়ে নিয়েছে। মা যে আর কোনো দিন আসবে না। একথা তাকে জানানো বা বোঝানোর মতো আপনাদের কারো বুকের পাটা আছে কিনা আমার আন্দাজ নেই।আমি জীবনে যত প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছি।বা হয়তো দাঁড়াব। নিঃসেন্দহে এটি কঠিনতম যে “আমার  মা কোথায়? “পারবেন সদ্য মাতৃহারা দুবছরি একটা বাচ্চার সহজ প্রশ্নের জানা উত্তরটা দিতে। আশা করি  সকল মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান  এখানে ব্যর্থ। জানিনা  কেন গতকাল সকালে বায়না জুড়ে ছিল ।আন্টি না। আমার মাকে ডাক। জানিনা বিরহ যন্ত্রণা আমাদের মতো দুধের শিশুটাকেও কুরে কুরে খাচ্ছে কিনা।অনুভূতি হয়তো ভাষার অভাবে জন্মের আগেই মারা যাচ্ছে। যেমন ও মাকে চিনে ওঠার আগেই হারিয়ে ছে!

আর তোমার গিন্নি মেয়ের কথা ভাবছ।চিন্তা করো না সখি।ও নিজের থেকে বাবাকে  নিয়ে বেশি চিন্তিত। সদা তটস্থ কি বাবার চোখ চিকচিক করছে কিনা। বা অন্ধকারে গাল গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে কিনা এক ফাঁকে  আঙুল দিয়ে তা দেখে নেওয়া। কিংবা কথার মাঝে গলা জড়িয়ে গেলে বাকা দৃষ্টিতে পরখ করা বাবা আবার কাঁদছে  কিনা। ওর ব্যথা যে কোনো অংশে কম নয় বরং অন্যের থেকে ঢের বেশি তা তুমি জানো আমিও জানি। হয়তো সকলেই জানে। ঘটনার দিন সকাল আটটায় যখন শেষ  আশা নিয়ে বাড়ি বেরোয় আর রাত্রি বারোটা নাগাদ তোমার নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে  বাড়ি পৌছয় এই দীর্ঘ ষোলো ঘন্টা ঐ কচি মনে না জানি সারাদিন কি ঝড় বয়ে গেছিল এখন তা ভেবে ভীষণ কান্না পায়।

তোমার সন্তানেরা তোমাকে ভুলবে না। জীবনে যতবার দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা শুনবে আজীবন তাদের বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠবে। কিংবা যখন সলিল সমাধি কি প্রথম জানবে  হয়তো সকলের অগোচরে চোখ দুটো  ভিজে আসবে। যতবার যাতায়াতের পথে বালিরঘাট ব্রীজে উঠবে ততবারই ওদের বুক ধড়ফড় করে উঠবে। কিংবা স্কুলে বাগ্ধারায়( ইডিয়মস্)বিনা মেঘে বজ্রপাতের অর্থবহ বাক্য রচনা করবে ততবারই নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আকাশে কচি দুজোড়া চোখ তোমাকে খুজতে থাকবে।

আর তোমার অভাগা কাঙাল টার কথা নাই বা বেশি বললাম।দশ দশটা বছর হাতে হাত পায়ে পায়ে নির্ঝঞ্ঝাট পথচলার পর আকস্মিক সম্পূর্ণ নীরোগ জলজ্যান্ত উনত্রিশ বছর বয়সী দুবছর বয়স্ক ছেলের মা,সাড়ে সাত বছরি মেয়ের মা আর নিজের জীবনসঙ্গিনীকে অকালে হারালে যা হয় আমার অবস্থা ঠিক সেই রকমই। তার একটুও  বেশি বা কম নয়।আমি  ভগ্ন হৃদয়ের আশাহত এক পথিক সখি। আমার বিলাপ আমার বিরহ শুধু অরণ্যে রোদন মাত্র। শুধু স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা।একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বেঁধেছিলাম ঘর সখি। আমাদের সে খেলাঘর ভেঙে গেল।তোমার যা পাওয়ার ছিল পেলে না যা নেওয়ার ছিল নিলে না।শুধু  দিয়ে গেলে সকলকে। ঋণী করে চলে গেলে প্রিয়তমা। কি পরিণত জীবন দর্শন ছিল তোমার। সকলের সাথে চলার সকলের সাথে মানিয়ে নেওয়ার কি অদ্ভুত  ক্ষমতা ছিল তোমার। স্বল্পে খুশি অল্পে তুষ্ট ছিলে সুন্দরী তুমি।কি উদার ছিলে তুমি। কতটা অগাধ আস্থাশীল ছিলে স্বামীর প্রতি। কোনো দিন কোনো হিসেব নিলেনা। নিজে চার বছর চাকরি করে কোনো দিন  ব্যাঙ্কে বা এটিএমে নিজের রোজগারের টাকাটাও কভু তুললে না। আমার  সকল কাজের অন্ধ সমর্থক। আমার সকল  প্রেরণার উতস। আমার সকল আশা আকাঙ্খার প্রতীক তুমি সখি। তোমাকে হারিয়ে আমি নিঃসঙ্গ আমি নিঃস্ব ।তোমাকে যারা চেনে তারা নিশ্চয় জানবেন তোমার প্রশংসায় আমি মিথ্যাচার করছি না।বা মৃত্যুতে মানুষ মহান হোন এমনটি নয়।তোমার সংগ্রাম কে আমি সম্মান  জানিয়ে ছিলাম।যে সংগ্রাম তোমার আমৃত্যু জারি রইল। স্বল্প পরমায়ুর এই সময়ে  তুমি দশ বছর সংসার করলে,পড়াশোনা করলে,ছেলে মেয়ে রেখে গেলে। আর কিবা করা যায়  এই সময়ে। তোমার কৃতিত্ব টা কম নয়।আল্লাহ্  নিশ্চয়ই  এই পর্যন্ত  প্রসন্ন ছিলেন। তাঁর বিবেচনায় যা ঠিক  তিনি তাই করেন।

সত্যি বলতে কি চব্বিশ ঘন্টার একটা দিনে যে কত বিচিত্র মানসিক পরিস্থিতি তৈরি হয় বলতে পারবনা।মাঝে মাঝেই নিজেকে ভীষণ অসুস্থ লাগে। ছেলে মেয়ে কে মাঝে মধ্যে কান্না পায়। আবার  ওদের খেলা ধুলোয় যখন স্বাভাবিক লাগে তখন মনে হয় আমরা তোমাকে দ্রুত ভুলে যাচ্ছি। আবার মনপীড়া শুরু  হয়।এভাবেই  আমাদের দুঃখ পর্যায়ক্রমে ফিরে ফিরে আসে। জানতাম সময় নাকি সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু এখন দেখছি  তার সবটাই সত্যি নয়।আমার  সংঙ্গে স্বজন হারানো প্রতিটি পরিবার একমত হবেন যে মানসিক অবস্থা আগের থেকে এখন অনেক বেশী খারাপ।

বাঁচার জন্য বেচে আছি।বাঁচতে  হলে খেতে হবে ।খায়।শ্বাস নিতে হয়। নিই।এই পর্যন্তই।জীবনের আনন্দ শেষ হয়ে গেছে। এটাই বাস্তবতা। সুখ ভাগ করলে নাকি বাড়ে।আর দুঃখ ভাগ করলে নাকি কমে।সহানুভূতি তো এখন আর নেই যে তা বাড়াব।দুঃখটা আপনাদের সাথে ভাগ করে কমায়।জানিনা  এটাও কখনো ভুল মনে হবে কিনা

প্রিয় বুল্টি। তুমি আমাদের মধ্যে আর নাও।কিন্তূ  তুমি আমার  হৃদয়ে রয়েছো।তোমার ভালো লাগা খারাপ  লাগা।তোমার  ইচ্ছা অনিচ্ছা। তোমার স্বপ্ন।আমি সব জানি। তুমি নিশ্চিত  থেকো প্রিয়া সেগুলো পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা করব।আল্লাহ্ সদয় থাকলে সেগুলো পূরণ হবে।

 

ভালো  থেকো সখি।আল্লাহ্ যেন তোমাকে জান্নাতবাসী করেন  এই দোয়া করি ও সকল কে এই দোয়া আবেদন রাখি।(ফেসবুক থেকে সংগৃহিত)

head_ads