৫ বছর ৯ মাস জেল খাটার পর সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন মেটিআব্রুজের মুহাম্মদ হারুন রশিদ

0

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: আবার বেকসুর খালাস। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন জেল খাটার পর অনেকেই মুক্তি পাচ্ছেন। আর এইসব ঘটনা সামনে আসার পর এসটিএস, এনআইএর কিছু অফিসারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। নিরীহ মুসলিমদের এই ভাবে সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেপ্তারের নিন্দাও জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
এবারের জায়গা কলকাতা। ৫ বছর ৯ মাস জেল খাটার পর অবশেষে সন্ত্রাসের অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেলেন গার্ডেনরিচ মেটিআব্রুজের লিদিপাড়ার বাসিন্দা মুহাম্মদ হারুন রশিদ। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁকে সিটি সেশন কোর্টের বিচারক কুমকুম সিনহা বেকসুর খালাস দিলেও প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ছাড়া হয় ১৮ মার্চ সন্ধ্যায়।

জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মুহাম্মদ হারুন রশিদ মঙ্গলবার টিডিএন বাংলাকে জানান,২০১২ সালের ১৭ জুলাই  আমাকে বাড়ি থেকে এক দল লোক সিভিল ড্রেসে এসে জোরপূর্বক নিয়ে যায়। কেন নিয়ে যাচ্ছে জানিনা, পুলিশ বলে থানায় গিয়ে বলবো। কিন্তু স্থানীয় থানায় না নিয়ে গিয়ে সোজা লালবাজারে নিয়ে যায় আমাকে। সেখানে আমার পুরো ঠিকানা নিলো পুলিশ। পরের দিন কোর্টে হাজির করায়। তখনও আমাকে জানানো হয়নি কোন কেসে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার উকিলের মাধ্যমে জানতে পারলাম যে,আমাকে জাল নোটের কেসে যুক্ত করা হয়েছে। তারপর রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় অন্য কেস জুড়ে দেয়।”

Advertisement
head_ads

দ্বিতীয় কেসটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে হারুন রশিদ বলেন,” শিয়ালদাহ মুচিপাড়া থানায় আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ আনে হোটেল বিউটি লজের ম্যানেজার সুমন দাস। ২১ জুলাই ২০১২ তে অভিযোগ করা হয় যে আমি নাকি ১৭ জুলাই ২০১২ সালে হোটেল বুক করে ১১৪ নম্বর রুমে যায় ও একটি ব্যাগ রেখে চলে আসি। আমার কাছ থেকে নাকি নিষিদ্ধ সংগঠনের কাগজ ছিল ও ব্যাগে বোম বাধার জিনিস ছিল। কিন্তু কোর্টে সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে ও আমাকে মুক্তি দিয়েছে।”

চার্জশিটে লেখা ছিল, মুহাম্মদ হারুন রশিদের লক্ষ্য ছিল নাকি জৈসে মুহাম্মদ, সিমি, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন, দার্সগাহ জিহাদ ও শাহাদাৎ এর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা। মুসলিম যুবকদের নাকি জেহাদে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মিটিং, ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু সেই অভিযোগ কোর্টে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় হারুনের মুক্তি হয়েছে।

কলকাতা এসটিএফ মুহাম্মদ হারুন রশিদকে গ্রেপ্তার করেছিল। হারুন টিডিএন বাংলাকে আরও বলেন,”আমাকে অনেক সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয় পুলিশ। নেট থেকে আমার সামনে সব কাগজ প্রিন্ট করে আর সই করিয়ে নেয়, বলে আমার কাছে নাকি নিষিদ্ধ জেহাদী, লিফলেট, বই পাওয়া গেছে। এইসব মিথ্যা অভিযোগ করে আমার মতো নিরীহ মানুষকে বছরের পর বছর জেলে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমার গ্রেপ্তারের দুই মাস পর ছেলে মারা যায়। বহু দুঃখ যন্ত্রনা নিয়ে বেঁচে আছি। পাঁচ বছর নয় মাস অর্থাৎ প্রায় ছয় বছর জেল খাটার পর আমাকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু এতটা জীবন যে নষ্ট হলো তার মূল্য কে দেবে? আমার পরিবার না খেয়ে থেকেছে। ছেলেদের পড়াশোনার খোঁজ নিতে পারিনি। আমার ব্যবসা শেষ। আমি এখন কী করবো? জেলে বসে চোখের জল ফেলেছি আর আল্লাহর কাছে বিচার চেয়েছি। আমার অনুরোধ, আমার মতো কাউকে যেন মিথ্যা কেসে না ফাঁসানো হয়। মানুষ হিসাবে মানুষ যেন একটু বাঁচতে পারে। ”

এদিন রশিদের বড়ো ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীর তালহা রশিদ বাবার মুক্তি প্রসঙ্গে বলছিল,” আমি আজ খুশি। বাবাকে যখন ধরে নিয়ে যায় তখন আমি স্কুলে ছিলাম। তখন ছোট। সেই সময়ের কথা মনে নেই। কিন্তু বাবাকে জেলে দেখতে যেতাম। পাড়ার মানুষ জিজ্ঞেস করতো যে, বাবা কবে আসবেন।”
স্ত্রী রাফাত সুলতানা সেদিনের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে বলছিলেন,”সিভিল ড্রেসে আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাবার পর আমি মেটিআব্রুজ থানা ও গার্ডেনরিচ থানায় অভিযোগ করি। কিন্তু পুলিশ অভিযোগ নেয়নি। সেদিন বাড়িতে জোর করে সিভিল ড্রেসে পুলিশ ঢোকে। কোনও অনুমতি নেয়নি বা কেন স্বামীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেনি।” কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন,”এতটা বছর লোন করে সংসার চালিয়েছি। প্রতিটি রাত কেঁদেছি আর দুআ করেছি। মিডিয়ায় কত বদনাম হয়েছে, আজ মুক্তি পাবার পর আমার স্বামীর খবর কেউ করেনি। সেইসব মিডিয়া আজ কোথায় যারা দিনরাত সন্ত্রাসী বলে মিথ্যা প্রচার করেছিল?”

মুহাম্মদ হারুন রশিদ এখন আল্লাহকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন। আর আইনজীবীদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছেন। মিরাজ আহমেদ, সাহিদ আনসারী, ফজলে আহমেদ খান ও নব কুমার ঘোষ, এই চারজন আইনজীবী পরিশ্রম করেছেন হারুন রশিদের জন্য। নবকুমার ঘোষ ছিলেন সিটি সেশন কোর্টে রশিদের মূল আইনজীবী। ওই আইনজীবী এই কেস সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই টিডিএন বাংলাকে বলেন,” মুহাম্মদ হারুন রশিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ ছিল। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলাও ছিল। বিভিন্ন জেহাদী কাজে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু কোর্টে সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।”

৪২ বছরের মুহাম্মদ হারুন রশিদ বাড়ি ফিরেছেন। চেনা মানুষগুলিকে অনেকদিন না দেখায় একটু যেন কেমন কেমন লাগছে। জেলে থেকে তিনি আইন নিয়ে পড়েছেন। মিডিয়ায় তাঁকে ‘জঙ্গি’ বলে প্রচার করা হয়েছে। কিছু অঘটন ঘটলেই গোয়েন্দা সূত্র বা ওই ধরণের সূত্র দিয়ে মেটিআব্রুজের হারুন রশিদের নাম জুড়ে খবর হতো। কিন্তু সেসব অতীত। হারুন বাকি জীবনটা সুন্দর ভাবে কাটাতে চান। তাঁর দাবি, মানবতা যেন অবহেলিত না হয়। তাঁর মতো আর একজনকে যেন বিনাদোষে জেল খাটতে না হয়। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে, সকলে যেন ন্যায় বিচার পায়।

head_ads