শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙার পরিপ্রেক্ষিতে  নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করলেন জেল মুক্ত আন্দোলকারীরা

0
ওই বামপন্থী নেত্রী আরও লিখেছেন, “মাননীয় নরেন্দ্র মোদী, আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু গৌরী লঙ্কেশের মত প্রতিবাদী সাংবাদিককে যেদিন গুলি করে হত্যা করা হয় সেদিন আপনাকে মুখ খুলতে দেখা যায় নি। আখলাক, জুনেইদ এর ঘটনার পর, উনায় দলিত নিধনের পর, নৃশংসভাবে আফরাজুলকে হত্যা করার পর, ভীমা কোরেগাঁও এর ঘটনার পর আপনাকে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। দেশের মানুষের সারা জীবনের গচ্ছিত সম্পদ চুরি করে নীরব মোদিরা পালিয়ে গেলেও আপনাকে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। লেনিন থেকে বাবাসাহেব আম্বেদকর, পেরিয়ারের মূর্তি ভেঙে যখন রণহুঙ্কারে তান্ডবনৃত্য করছে আপনার সংগঠনের কর্মীবাহিনী তখনও আপনাকে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। মুখ খুললেন কখন যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে হাতুড়ির ঘা পড়ল। হে হিন্দুত্বের কাণ্ডারী, অত্যাচার সহ্য করতে করতে মানুষের ধৈর্য একদিন সহনশীলতার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো শাসকই মানুষের সেই অনন্ত ঘৃণার আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে নি।”
যুবি সাহার মন্তব্য, “আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি, আমরা মূর্তি ভাঙার বিরুদ্ধে। কারণ আমরা জানি মূর্তি ভেঙে শুধুমাত্র কোনো মতাদর্শকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি, যায়ও না। এমনকি সত্তর দশকে যে নকশালপন্থীরা রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিলেন আমরা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখার পক্ষপাতী তাকেও। কিন্তু এখানে দুটো কথা বলার। প্রথমত বিদ্যাসাগর, রামমোহনের মতো মানুষ যারা নিজেদের গোটা জীবন সমাজের কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন তাঁদের সাথে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো হিন্দু মহাসভার নেতা, গোটা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যে মহাসভার কোনো ভূমিকা নেই, ব্রিটিশ রাজশক্তি আর ক্ষমতার বৃত্তের কাছাকাছি থেকেছেন বরাবর যে শ্যামাপ্রসাদ, তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনের; রামমোহন, বিদ্যাসাগরের সাথে তার কোনো তুলনাই করা চলে না। আমরা জানি না কোন সম্প্রদায়ের ভোটব্যাঙ্ককে তুষ্ট করার জন্য পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের মতো মহান মানুষের সমাধিস্থলে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি স্থাপন করেছিলো। আর দ্বিতীয়ত ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে মানবতা, বিবেক আর মননশীলতার সমস্ত ক্ষেত্র যখন আক্রান্ত হয়েছিলো একদিন, রোমা রোল্যাঁর মতো বিশ্ববরেণ্য মানুষও সেদিন বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, “when order is injustice, disorder is the beginning of justice.” শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ভাঙার পর মোদী-অমিত শাহ-রাজনাথ সিং চক্রের সরব হওয়ার মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার যে শ্রমিকের হাতুড়ি ভুল জায়গায় আঘাত করেনি।

ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলি মতাদর্শগতভাবে বামপন্থাকে তার প্রধান শত্রু বলে মনে করে। কারণ তারা জানে দেশের নিপীড়িত জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে প্রতিফলিত করার বাস্তব ক্ষমতা আর কারও নেই। বামপন্থার বিপদ যদিও শুধু বাইরে থেকে নয়, এসেছে তার ভিতর থেকেই। সংসদীয় বাম রাজনীতির ভোটবাজি আর ভাঁওতাবাজী আর ‘সেকুলার প্রগতিশীল বাম’দের মিনমিনে প্রতিবাদ দেখতে দেখতে মানুষ ক্লান্ত। অসহায় মানুষের অনিশ্চয়তাকে আজ গ্রাস করছে ফ্যাসিবাদ। শুধুমাত্র ভোটের মধ্যে দিয়ে এই ফ্যাসিস্ট শক্তিকে হারানোর স্বপ্ন যারা দেখছে, মূর্খের স্বর্গে বাস করছে তারা। আজ সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে বামপন্থাকে নতুনভাবে সাজানোর, দেশের জল-জঙ্গল-জমির আর অধিকার রক্ষার প্রতিটি আন্দোলনের সাথে এই মতাদর্শকে যুক্ত করার। নির্বাচনী রাজনীতির মোহ থেকে না বেরোলে কখনো সম্ভব নয় এই মরণপণ লড়াই। কৃষকের কাস্তে আর শ্রমিকের হাতুড়ির মর্যাদা রক্ষার দায় তাই আমাদের সবার, প্রত্যেকের।
আমরা আমাদের পোস্টারে লিখেছিলাম ‘ভেঙেছি বলেই সাহস রাখি গড়ার/ ভেঙেছি বলেই সাজিয়ে দিতে পারি/ স্বপ্নের পর স্বপ্ন সাজিয়ে তাই আমরা এখনও স্বপ্নের কান্ডারী’। আমরা তো শুধুমাত্র একটা সামান্য মূর্তি ভেঙেছি। মা-মাটি-মানুষের সরকার যদিও তার জন্যই আমাদের দুদিনের পুলিশি হেফাজত ও চারদিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু জাতিতে-জাতিতে, ধর্মে-ধর্মে বিরোধ আর বিভাজন ঘটিয়ে গোটা সমাজকে ভেঙে দিতে চাইছে যারা, প্রতিদিন বিক্রি করে দিচ্ছে যারা দেশের মূল্যবান সম্পদ কি শাস্তি তাদের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত? আগামী সময় আর আমাদের দেশের মানুষ নিশ্চিতভাবেই এর বিচার করবেন।”

(টিডিএন বাংলায় প্রকাশিত যুবি সাহার পুরো মন্তব্যটি তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া)