জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় নেই,দূর কল্যানীতে পড়ে সবার সেরা হলেন মুর্শিদাবাদের ফারহানা ফিরদৌস

0

ফারুক আহমেদ, টিডিএন বাংলা, কল্যাণী : মুর্শিদাবাদ জেলার রাণীনগর থানার অন্তর্গত কাতলামারী গ্রামের মেয়ে ফারহানা ফিরদৌস। বাবার নাম ফিরোজ শাহজাহান, মায়ের নাম নাজমুন নেসা বেগম,দাদু আনোয়ারুল ইসলাম। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাহারপাড়া বর্ডার থেকে এক কিমি দূরে পদ্মানদীর কোলে কাতলামারী গ্রাম। পিতা, মাতা, কাকু আর ছোট বোন আছে ফারহানা ফিরদৌসের পরিবারে। সে বাড়ির বড় মেয়ে। ফারহানা মাধ্যামিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কাতলামারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। স্কুলজীবন থেকেই পড়াশোনায় সে মেধাবী ছাত্রী হিসেবেই নজর কাড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সে ভালবাসে।  যারফলে ফারহানা বরাবরই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে বড়ই উৎসাহ ও স্নেহ পেয়েছে। ২০০৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সে ৮২.৪ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করে। পড়াশোনায় খুব মেধা সম্পন্ন না হলেও বরবরই সে পরিশ্রমী। বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ফারহানা ৭২ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করে। ফারহানা ফিরদৌস টিডিএন বাংলাকে জানান
কাতলামারী, নবীপুর, সেখপাড়া তিনটি উচ্চতর বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেয় এখানকার ছাত্র-ছাত্রীদের খুবই সংগ্রাম করেই বিজ্ঞান শিক্ষা অর্জন করতে হয়। কারণ এই তিনটি উচ্চতর বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকের চরম অভাব থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ৫৫ কিমি দূর ডোমকলে এবং বহরমপুর গিয়ে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, অঙ্ক ও বাইলোজি পড়তে যেতে হত। একটা মেয়ে হয়েও তাকে সাইকেলে করে কাতলামারী গ্রাম থেকে প্রথমে সেখপাড়ায় এসে সাইকেল রেখে আবার বাসে করে ইসলামপুর আসতে হত তারপর আবার বাস ধরে ডোমকল গিয়ে বিজ্ঞান পড়তে হয়েছে। আবার একই ভাবে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে পড়ত যারফলে উচ্চমাধ্যমিকে সে ৭২ শতাংশ নম্বর পেলেও মনের মতো ফল করতে পারিনি। এরপর ফারহানা ফিরদৌস কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বহরমপুর গার্লস কলেজ থেকে শরীর বিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে ২০১৪ সালে ৬৭.৮ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করে। সে অনার্সে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫ম হয়। মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হিসেবে তার পড়াশোনা হয়তো এখানেই বন্ধ হয়ে যেত। একদিকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার চাপ। আবার অন্যদিকে মুর্শিদাবাদ জেলায় কোনও বিশ্ববিদ্যালয় না থাকার জন্য বহু ছাত্র-ছাত্রী আর্থক দিক দিয়ে সচ্ছল না হওয়ায় সুদূর কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা অধরা থেকে যায়। ব্যতিক্রম যারা তারা বহু কষ্টে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে। এই মুর্শিদাবাদ জেলার বহু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী শুধুমাত্র জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় উচ্চশিক্ষা থেকে চরম ভাবেই বঞ্চিত হচ্ছে। ফারহানা ফিরদৌস মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর কাছে আবেদন করছে তাঁদের মতো বহু মেয়েদের কথা ভেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে এগিয়ে আসুক।


বাড়িতে ফারহানা ফিরদৌস জানিয়ে দেয় সে শরীর বিজ্ঞানে এমএসসি করবে এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। এবার সে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আবাসনে থেকেই পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করবে এবং ভালো রেজাল্ট করে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবে সে। ফারহানার দাদিমা নূরনাহার বেগম এগিয়ে আসে এবং তাকে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিও করে দেয়। ফারহানা ফিরদৌস এবার সে শুধু তার দাদিমার স্বপ্ন পূরণ করেছে তাই নয়, সে তাদের বংশের প্রথম মেয়ে যে বিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছে এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথমও হয়েছে ফারহানা। ৮৬.৮ শতাংশ নম্বর নিয়ে ২০১৭ সালের ২৮তম কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে ফারহানা ফিরদৌস ফিজিওলজি বিভাগেরও মুখ উজ্জ্বল করে একই সঙ্গে সোনা, রুপো এবং বোঞ্জ পদক অর্জন করে। সে শুধু ফিজিওলজি বিভাগেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম নয় গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের মধ্যে ফারহানা ফিরদৌস সর্বচ্চ ৮৬.৮ শতাংশ নম্বর নিয়ে প্রথম হয়েছে।


‌ফারহানা ফিরদৌস তার এই সাফল্যের জন্য সে তার সকল শিক্ষক ড. এস সাহু ও ড. এল লাহিড়ী ম্যামের কাছে কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে প্রফেসর ও বিজ্ঞানী গৌতম পালের উৎসাহতেই সে এতো ভাল ফল করতে পেরেছে। নানান কঠিন পরিস্থিতিতে তাকে পড়া চালিয়ে যাওয়ার সাহসও দিয়েছেন গৌতম পাল। আগামীতে ফারহানা ফিরদৌস তার আর্দশ শিক্ষক গৌতম পালের মত গবেষণা করে একজন আর্দশ অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী হতে চায় সে। গবেষণার কাজে যুক্ত থেকে সে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্যেও কাজ করতে চায় এবং সে বিভিন্ন আলোচনাতে অংশ নিয়ে বলতে চায় সংগ্রাম করেই মেয়েদেরকে এগিয়ে আসতে হবে সুস্থ সমাজ গড়তে।