আইসক্রিম বিক্রেতার ছেলে জয়েন্ট বিডিও, খুশির জোয়ার রাজ্যের পিছিয়ে পড়া সমাজে

0
নিজস্ব প্রতিনিধি, টিডিএন বাংলা, বারুইপুরে : বাবা আইসক্রিম বিক্রেতা। গ্রামের অলিতে গলিতে মাথায় করে আইসক্রিম ফেরি করে বেড়ান। কিন্তু তাই বলে কি স্বপ্নওয়ালারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাবে? এবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুর থানার অন্তর্গত বেলেগাছি নামক এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে জয়েন্ট বিডিওর খাতায় নিজের নাম পাকা করলেন আইসক্রিম বিক্রেতা লতিফ লস্করের ছেলে হাবিবুল্লাহ্ লস্কর। বাবা আইসক্রিম বিক্রি করেই চার ভাই ও তিন বোনের পড়াশোনার খরচা বহন করে গেছেন নীরবে। নুন আনতে পান্তা ফুরোনো পরিবারের এহেন ট্রাজেডি পিছিয়ে পড়া সমাজের কাছে আজ না বললেই নয়,  তাই আবারও কলম ধরেছি অন্য এক স্বপ্ন পরীর গল্প শোনাব তাই!
বাবার বয়স হয়েছে! এখন আর মাথায় করে আইসক্রিম এর বাক্স বইতে পারেনা! ধর্মপ্রাণ  অতি সাধারণ এই মানুষটি তাই বেছে নিল গ্রামের মসজিদের ইমামতির কাজ। দীর্ঘ কয়েরবছর ধর্মভীরু মুসল্লিদের নেতৃত্বও দিলেন। কিন্তু শরীরের অপারকতা তো আর কারোর কথা শুনবে না! সংসারের হাল ধরলেন বড় ভাই আবদুল রাজ্জাক লস্কর। শিক্ষিত এক বেকার যুবক। আরবি থিওলজি নিয়ে পড়াশুনো। কিন্তু চাকরীটা তখনও জোটেনি। নিতান্তই বেছে নিতে হল দিনমুজুরের কাজ।
ছোট ছেলে হাবিবুল্লাহ্ লস্কর ওরফে হাবিব। ছোট বেলা থেকেই এলাকার মেধাবী ছাত্র হিসাবে সুনাম কুড়িয়েছে। ভাই বোনদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আইসক্রিম বিক্রেতা এক পিতার মুখে হাসি ফোটাতে একই সারিতে দাঁড়িয়ে পড়েছে হাবিব। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ঘোলা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা। বরাবরই ক্লাসের প্রথম হয়ে শিক্ষক শিক্ষিকাদের মন জয় করেছে এই মেধাবী সন্তান। অবশেষে সন্ধান পেল স্বপ্ন নীড়ের। এক শিক্ষকের সহযোগিতায় আল আমিন মিশনে ভর্তি পরীক্ষায় বসে হাবিব।
সেখানেও সফল উত্তরণ তার। সাল ২০০৪, হাবিব আল আমিন মিশন দক্ষিণ দিনাজপুরের বেলপুকুর শাখায় নবম শ্রেনীতে ভর্তি হল। ২০০৬ সালে ওখান থেকেই মাধ্যমিক। প্রাপ্ত নম্বর ৭০৭। তারপর একাদশ শ্রোণীতে আল আমিন মিশনের হাওড়া খলতপুরে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয় সে। ২০০৮  সালে উচ্চমাধ্যমিক। প্রাপ্ত নম্বর ৩৯৪। সেবছরেই হাবিব জয়েন্ট এন্ট্রান্স এ ১৬৭৫ রাঙ্ক করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিন্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনোর সুযোগ পায়। ২০১২ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কলেজ ক্যাম্পাসিং এর মাধ্যমে হিন্দুস্তান টাইমস্ ও এসডি অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড নামের দুটি সংস্থায় চাকরী পায়।
 তবে দ্বিতীয় চাকরিটিই বেছে নেয় হাবিব।
কিন্তু পিছিয়ে পড়া সমাজের জন্য কিছু দরকার, এই ভাবনা থেকেই ২ বছর ৮ মাস চাকরী করে এসডি অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড থেকে ইস্তফা দেয় সে। প্রাশাসনিক পদে রাজ্যের পিছিয়ে থাকা সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি একেবারেই কম। তাই সেই শুণ্যতা পুরনের ভাবনা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং এর লোভনীয় চাকরী ছেড়ে হাবিব শুরু করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডব্লিউবিসিএস এর প্রস্তুতি শুরু করে হাবিব। তারপর ২০১৬ সালের ২৮ শে জানুয়ারি প্রিলি পরীক্ষায় বসে।
প্রিলিতে সফলতার পর ২০১৬ জুলাই মাসে মেইনস পরীক্ষাতেও সফল। তারপর ২০১৭ এপ্রিল মাস নাগাত পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এ গ্রুপের ইন্টারভিউ এর জন্য ডাক পায়। সেখানেও মাজিমাত করে আল আমিন মিশন পরিবারের এই মেধাবী ছাত্র তথা বারুইপুরের এক আইসক্রিম বিক্রেতার ছেলে হাবিবুল্লাহ্। গত ১৫ ই মার্চে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চূড়ান্ত মেধা তালিকায় জয়েন্ট বিডিও হিসাবে নিজের নাম পাকা করেছে সে।
হাবিবের এই সাফল্যে এখন খুশির জোয়ার বইছে আল আমিন মিশন সহ গোটা পিছিয়ে পড়া সমাজে। ফোনে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আল আমিন মিশনের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সহ একাধিক শিক্ষক শিক্ষিকা। পিছিয়ে পড়া সমাজের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে হাবিবের বক্তব্য, “আমেরিকার কালো মানুষ গুলোকে যেভাবে নিজেদের মেধাসত্বার প্রমান দিতে হয়, তেমনি এ দেশে আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া সমাজের মানুষদেরকেও প্রমান করতে হবে আমরাও পারি। সুতরাং হাল না ছেড়ে লড়াই চালিয়ে যাও, এক সুন্দর সকাল তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
ছেলের সাফল্যে খুশিতে বাগ বাগ বৃদ্ধ বাবা। মা ছফুরা লস্করের চোখ বেয়ে নামে আনন্দাশ্রু। ছেলে আমার পেরেছে, হাবিবকে বুকে জড়িয়ে মায়ের হৃদয়ভাঙা উক্তি ছেলেকে মানসিকভাবে আরও বেশি শক্তিশালী করে তোলে। বড় ভাই আবদুল রাজ্জাক আজ আর বেকার নেই, আজ সে একটি হাইমাদ্রাসায়  শিক্ষকতা করছে। মেজো ভাই বাকিবিল্লাহ্ লস্কর জয়নগরের একটি হাইস্কুলের শিক্ষক। ছোট বোন রজিনা খাতুন জীবনতলায় একটি প্রাইমারী স্কুলে চাকরি করছে। সত্যিই এক সোনালী সকাল ধরা দিয়েছে বেলেগাছি গ্রামের আইসক্রিম ওয়ালা লতিফ লস্করের পরিবারে।
“দারিদ্রতায় হচ্ছে পিছিয়ে পড়া সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাস। তাই পিছিয়ে পড়া সমাজ থেকে দারিদ্রতা নামক সন্ত্রাসীকে দূর করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।” অকপট স্বীকারোক্তি হাবিবের। পিছিয়ে পড়া সমাজে নারী শিক্ষা নিয়েও কাজ করতে চায় হাবিব। আর এই কাজে সে পাশে পেয়েছে নিজের সহধর্মিণী তথা আল আমিন মিশন প্রাক্তনী ও চিত্তরঞ্জন মেডিকেল কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী উম্মে হানিকে। নারী শিক্ষার প্রতি উম্মে হানির উদ্দীপনা ও হাবিবের আগ্রহ  দুজনকে কাছা কাছি নিয়ে আসে বলে জানিয়েছে হাবিব। তারপর, গত ১লা নভেম্বর পরিণয় সুত্রে আবদ্ধ আল আমিন মিশনের এই দুই প্রাক্তনী হাবিবুল্লাহ্ লস্কর ও উম্মে হানি।
আজ আর মাথায় করে আইসক্রিম এর বাক্স বইতে হয়না লতিফ লস্করকে। কেবল সুখের আলোয় আলোকিত এক পরিবারের উদ্দেশ্যে বৃদ্ধ বাবার করুণ আকুতি, “তোরা অনেক উপরে উঠবি খোকা, তবে মনে রাখিস পিছিয়ে পড়া হতভাগা এ জাতিকে যেন ভুলে যাস না।”