বেকারত্বের যন্ত্রনায় হৃদয় থেকে রক্ত প্রতিটি সেকেণ্ডে ঝরে চলেছে অনবরত : প্রতিবন্ধী চাকরিপ্রার্থীর আর্তনাদ

0

পাঠকের কলমে, টিডিএন বাংলা : আমি মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের ষষ্ঠ এসএলএসটি-র সফল প্রার্থী। সাথে শারীরিক প্রতিবন্ধী। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করে ভেবেছিলাম এবার বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারবো। কিন্তু এখন এতটায় অসহায় যে, সেই বৃদ্ধ পিতা-মাতার দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছি না। বেকারত্বের যন্ত্রনায় হৃদয় থেকে রক্ত আর চোখ থেকে জল প্রতিটি সেকেণ্ডে অনবরত ঝরে চলেছে।

বিশেষ কোনো সম্প্রদায় সার্বিকভাবে পিছিয়ে গেলে সেই জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। প্রান্তিক গোষ্ঠীর ও পিছিয়ে পড়া মুসলমান জনগোষ্ঠীর উন্নতিতে ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য মাদ্রাসা শিক্ষার কোন বিকল্প নেই৷ আর মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কমিশনের কোন রূপ বিকল্প নেই। একজন শিক্ষা অাধিকারিকের প্রশ্ন মাদ্রাসায় কী শুধু কোরান শরীফ পড়ানো হয়? একথা শুনে আমি ‘থ` হয়ে যায়! তাই অবাক লাগে শিক্ষিত নাগরিক যখন অসচেতন আশ্চর্য হই সংখ্যালঘু মুসলিমদের উন্নয়নে খোদ সংখ্যালঘু নেতাদেরই অনীহা! যাই হোক শিক্ষাকে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিতে হলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাণ ফিরিয়ে দিতেই হবে। আর এই শুভ কাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর দায়িত্বশীল ও সচেতন নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

Advertisement
head_ads

ইন্টারভিউ সম্পূর্ণ হলেও পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে সরকার ও কমিশন শুধু টালবাহানা করেই চলেছে। এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে আমাদের খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে।এমন কী খুবই দুঃখজনক ঘটনা আমার গ্রামের অনেক মানুষই এখন বলতে শুরু করেছে, আব্দুল্লাহ্ তো প্রতিবন্ধী। এখনও চাকরী পায়নি। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেগুলারে বাংলায় এমএ, বিএড করে বসে আছে। তোরা আর পড়াশুনা করে কী করবি! তাতে লাভই বা কী! সবাই রাজমিস্ত্রির কাজে চলে যা!!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে , আমিও সংখ্যলঘু। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফিজ্ দিয়ে ফর্ম ফিলাপ করে, রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, পড়াশুনা করে লিখিত পরীক্ষায় সফল হয়েছি। আজ প্রায় বছর দেড়েক থেকে আমি ভুক্তভোগী। তাই যারা সংখ্যালঘু তকমাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে গোটা জাতিকে পথে বসাতে চায়ছেন! তাদের কাছে অামার চূড়ান্ত প্রশ্ন- তাহলে অামি কী চাকরির নায্য দাবীদার নই? অামার মতো পোলিও রোগগ্রস্থ প্রতিবন্ধী মানুষকে কোলকাতার রাজ পথে বিভিন্ন সময়ে সমাবেশ ও অান্দোলনে পা মেলাতে হয়েছে। এর জন্য দায়ী কে বা কারা? অামার মতো হাজার হাজার অসহায়ের চোখের জলের দাম কে দেবে?

এপ্রসঙ্গে উল্লেখ্য, রাজ্য সরকার কমিটির মাধ্যমে ৪২ জন অযোগ্য শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজন-পোষন, জাল ডিগ্রী, এমনকী বয়সের ক্রমও মানা হয়নি। সচেতন নাগরিক মাত্রই অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে, কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের ফলে দুর্নীতির দুর্গন্ধ চারিদিকে মোঁ মোঁ করছে। শুধু কমিশনের মাধ্যমে চাকুরী প্রার্থী হিসেবেই নয়; একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে অামার সবিনয় অনুরোধ সংখ্যালঘু তকমার দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘু গরিব মুসলিমদের পথে বসিয়ে দেবেন না!ইতিমধ্যে সুশীল সমাজ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকেও জানতে পেরেছেন যে, “পঃবঃ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন”ও সংখ্যালঘু স্ট্যাটাস প্রাপ্ত। তাহলে সংখ্যালঘুদের অধিকার কোথায় ক্ষুন্ন হচ্ছে ?

নাগরিক সমাজ অবগত আছেন যে , হাই কোর্টের রায় সত্ত্বেও মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের নিরাবতায় মাদ্রাসা গুলিতে পঠন পাঠন ভীষণ বিপর্যস্ত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুমোদিত রাজ্যের ৬১৪ টি মাদ্রাসাতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ আছে। ফলে পঠন পাঠন ভীষণ বিপর্যস্ত। প্রায় ৬০% শিক্ষকপদ শূন্য। ২০০ টি মাদ্রাসা প্রধান শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে ৩৭০৬ জন সফল প্রার্থীর ইন্টারভিউ ও নিয়োগের দাবীসহ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন পুনঃর্বহালের দাবী জানিয়ে অাসছে অরাজনৈতিক শিক্ষক সংগঠন ‘বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরাম ‘।

মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ও কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অাশ্চর্যজনক ভাবে নিয়োগের ব্যাপারে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন নীরব। ফলে সফল শিক্ষিত বেকার অগনিত যুবক- যুবতীর দিন যাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় দুঃস্থ সংখ্যালঘুদের একমাত্র ভরসা মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি আজ ধ্বংসের মুখে। এই সমস্যার সমাধান একমাত্র সরকারই করতে পারে।

তাছাড়া মাদ্রাসায় শুধুমাত্র মুসলিম পরিবারের ছেলে মেয়েরাই পড়াশুনা করেনা, অনেক অমুসলিম ছাত্র-ছাত্রীও পড়াশুনা করে। এমনকী অনেক এলাকায় হাইস্কুল না থাকার ফলে, অাধুনিক শিক্ষা লাভ করার তাদের একমাত্র ভরসা মাদ্রাসা। ফলে প্রকৃত শিক্ষার অভাব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বহু দুঃস্থ ছাত্র-ছাত্রী।৩৭০৬ জন প্রার্থী কৃতকার্য হয়ে অাশায় বুক বেঁধে ছিল। কিন্তু এখনও তারা অন্ধকারে। এই সুযোগে বেশ কিছু মাদ্রাসার পরিচালন কমিটি ১০০% অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ করছে।

সুপ্রিম কোর্ট নিয়োগে বাঁধা নেই বললেও– শিক্ষক নিয়োগ, কর্মরত শিক্ষকদের বদলিসহ অন্যান্য কাজে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন নীরব। একমাত্র সরকারই পারেন পরিচালন সমিতির দুর্নীতি রুখে দিয়ে ৩৭০৬ জন শিক্ষিত বেকারদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল করতে।

আশা রাখি আমাদের জীবন নিয়ে অবহেলা ও ছিনিমিনি খেলা দ্রুত বন্ধ হবে৷ বর্তমান সরকার আমাদের প্রতি সহৃদয় হবেন। গণ মাধ্যমের দ্বারা আমার এই আত্মযন্ত্রনার কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই।

ইতি
আব্দুল্লাহ বিন ইলতুৎমিস, মুর্শিদাবাদ,
মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের ৬ষ্ঠ এসএলএসটি সফল প্রার্থী

head_ads