জমিয়তে আহলে হাদিসের রাজ্য সম্পাদক আলমগীর সরদারের কথা

0

আলহামদুলিল্লাহ………..
যাবতীয়  স্তব-স্তুতি গুণগান গুণকীর্তন সেই মহান রাব্বুল আলামীনের, যিনি আজ  2 ও 3 রা মার্চ শুক্র ও শনিবার 2018 রাজ্য সম্মেলনে আসার জন্য সুস্থ দেহ, মন ও সময় দানে ধন্য করেছেন, সেই  মহান সত্ত্বার নিমিত্তে তার প্রশংসা জ্ঞাপন করছি। আলহামদুলিল্লাহ।

দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যিনি গোটা বিশ্বের রহমত স্বরূপ প্রেরিত।
আজ এই সম্মেলন থেকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বালাকোটের আমার শহীদানদের, তাছাড়া ঐ সমস্ত বরেণ্য উলামাদের যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ আমরা নিজেদেরকে আহলে হাদীস বলে গর্ববোধ করছি,পশ্চিমবাংলার স্মরণীয় বরণীয় উলামাদের মধ্যে মুর্শিদাবাদের আবুল কাসেম গঙ্গাপ্রসাদী, মাওলানা ইয়াসিন সাহেব, মাওলানা সুলতান আহমেদ, মাওলানা কুসুমুদ্দিন সাহেব, মাওলানা ইব্রাহীম সাহেব, শাইখ ইসমাইল সামসির প্রভৃতি উলামাগণকে, বর্ধমান জেলার কুলসোনার নিয়ামাতুল্লাহ ও তাঁর জামাই সাদমানি সাহেব, আবু তাহের বর্ধমানি সাহেবকে, উত্তর 24পরগনার মাওলানা আকরাম খাঁ, মাওলানা আব্বাস আলী সাহেবকে, নদিয়ার আলিমুদ্দিন নদিয়াবী সাহেবকে, বীরভূমের আব্দুল্লাহ নদবী, আতাউল্লাহ রাহমানী সাহেবকে, মালদহের আব্দুস সাত্তার রাহমানী, মাওলানা আব্দুর রহিম, মাওলানা আব্দুল হাকিম, মাওলানা আব্দুল ওহাব রাহমানী, মাওলানা দোস্ত মোহাম্মদ নদবী, মাওলানা ইব্রাহীম প্রমুখ।
আজ আমরা আহলে হাদীসদের ইতিহাসে এক স্মরণীয় মুহুর্তের স্বাক্ষী হতে চলেছি….. আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করে নিন।

Advertisement
head_ads

ভূমিকা:- মানুষ মাত্রই আদম সন্তান। সৃষ্টিগত ভাবে আমরা সবাই একই উপাদানে সৃষ্টি। সকলের সৃষ্টিকর্তাও একজন। কিন্তু আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস ও জীবণ শৈলী ভিন্ন। কেউ ডাকে এক স্রষ্টাকে , তো কেউ ডাকে তিনজনকে। আবার কেউ একজন স্রষ্টাতে বিশ্বাস রাখলেও ডাকে অসংখ্য সত্তাকে। এভাবে আকীদা বা বিশ্বাসগত ভাবে মানুষ অসংখ্য ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। স্রষ্টার প্রেরিত বিধানের পাশাপাশি মানব রচিত অসংখ্য মত ও পথ বিদ্যমান। বিশ্ব মানব আজ বহুধাভাবে বিভক্ত। স্রষ্টাকে মানার উদ্দেশ্য  পরকালীন সুখ-শান্তি। অজস্র মানুষ খুঁজছে সেই কাঙ্ক্ষিত সুখ ও শান্তির কুঞ্জবন। চাইছে সরল পথের দিশা। কিন্তু! আজ অধিকাংশ মানুষ দিগভ্রান্ত। দিগভ্রান্ত মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিতে যুগে যুগে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবী বা রসূল। নূহ আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকে। বিগত প্রত্যেক নবী ভবিষ্যত নবীর আগমন বার্তা শুনিয়েছেন। কিন্তু আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ এবং চূড়ান্ত বলে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন।  এবং মানবতার জন্য আর কোনও নবী বা রসূলের আগমণ ঘটবেনা। এ উম্মতের জন্য তাকে করে পাঠালেন বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিক দিশারী। তিনি চলে গেছেন, তবে রেখে গেছেন তার জীবনের সার্বিক আদর্শ। তিনি উম্মতের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমি তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি দুটি জিনিস, যতদিন তোমরা এ দুটি জিনিস কে আঁকড়ে ধরে রাখবে ততদিন তোমরা পথহারা ও দিশেহারা হবেনা, একটি আল্লাহর কিতাব অন্যটি আমার জীবনাদর্শ। আজ অধিকাংশ মানুষ তার জীবনাদর্শ থেকে শতযোজন দূরে। যার জন্য মানবতা আজ ভূলুণ্ঠিত। তাই, সার্বিকভাবে তার জীবনাদর্শ মানুষের কাছে তুলে ধরতে বা তার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতেই আমাদের এই ক্ষুদ্র আয়োজন অর্থাৎ জমিয়তে আহলে হাদীসের “রাজ্য সম্মেলন” 2018

আমাদের পরিচিতি :- আমরা আমাদেরকে আহলে হাদীস বলে গর্ববোধ করি। কারণ, আহলে হাদীস বা আহলুল হাদীস শব্দের অর্থ হাদীসের অনুসারী। শরীয়তের পরিভাষায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা কাজ ও সমর্থনকে হাদীস বলে। আর মহান আল্লাহ তার কালাম কে অর্থাৎ কুরআন কে হাদীস বলে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং যারা ইজমা, কেয়াসকে বাদ দিয়ে আলক্বুরআন ও  হাদীসকে মানে তাদেরকেই আহলে হাদীস বলে। সহজ সরল কথা হলো, পাপ পূণ্যের ক্ষেত্রে যারা মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহকে মেনে চলে, তারাই আহলে হাদীস।আমরা জানি বিগত দিনের নবী ও রসূল মৃত্যু বরণ করলেও মৃত্যু হয়নি তাদের কিছু অনুসারীদের। নবী বা রসূল পাঠানোর পরম্পরায় শেষে পাঠালেন নবী মুহাম্মদ সা: কে। তিনি চলে গেছেন, তবে, রেখে গেছেন আল্লাহর মনোনীত দ্বীন। তিনি বলেছিলেন, আমি তোমাদের এমন একটি উজ্জ্বল দ্বীনের উপর রেখে যাচ্ছি যার রাত টাও দিনের মতো। কিন্তু! তার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই ইসলামের স্বচ্ছ সলিলে অনুপ্রবেশ ঘটলো ইসলামের নামে খারিজি, মুরজিয়া সহ অসংখ্য ইসলাম ধ্বংসকারী দল। হিজরী 37 সনে শুরু হলো মুসলিম সমাজের বিভক্তি। তৈরি হলো খারেজী, তৎপরবর্তীতে জন্ম নিল আহলুর রায়, বা আহলুল বিদআ।  প্রত্যেকেই নিজস্ব মত ও পথকে প্রাধান্য দিলো, কেউবা বিভিন্ন ইমাম বা বিভিন্ন ব্যাক্তিদের। এমনি ভাবে মুসলিম সমাজ বহুধা দলে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো। আল্লাহ বললেন, তোমরা একতাবদ্ধ ভাবে আমার রজ্জুকে ধারণ করো। সেখানে কেউবা বললেন, মতানৈক্য আল্লাহর রহমত। মতাদর্শ গত পার্থক্যে তৈরি হলো হাজারো দল উপদল। ইসলামকে ধ্বংস করতে মুসলিম সমাজেই জন্ম নিলো জিন্দিক দল বা গোপন শত্রু, যারা মুসলিম সমাজের মধ্যে থেকে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারে সচেষ্ট হলো, মুসলিম সমাজ তাদের গোপন অভিসন্ধি বুঝতে ভুল করলো। যার ফলশ্রুতিতে মুসলিম সমাজ বহুধা বিভক্তির করালগ্রাসে আপতিত হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথামতো এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই,  এক মুসলিম অন্য মুসলিমের আয়না, আরো বললেন, এক মুসলিম অপর মুসলিমের দেহ। কিন্তু, কি দেখলাম আমরা! মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে এক মুসলিম অন্য মুসলিমের শুধু শত্রু নয়, চরম শত্রু হিসাবে পরিনত হলো। বহু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সাক্ষী থাকলো পৃথিবী।  যারা রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ও তৎসহ সাহাবীদের সার্বিক জীবনাদর্শ সর্বান্তকরণে ও স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মেনে নিয়ে নিজেদের উৎসর্গ করে চলেছেন সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও তার পদাঙ্ক অনুসরনের মাধ্যমে বিশ্বমানবতাকে সরল পথের প্রতি আহব্বান করে চলেছে যে সংগঠন, সেই সংগঠনের নাম ‘আহলুল হাদীস ‘ বা আহলে হাদীস। আহলে হাদীস কোনো দল বা মাজহাবের নাম নয়। আহলে হাদীস একটি পথের নাম, এটি একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম। নবী মুহাম্মদ সল্লুলাহু আলাইহি  অসাল্লামের যুগ থেকে চলে আসা নিছক আলকুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত একটি কাফেলার নাম।  আলকুরআন ও সহীহ সুন্নাহর পথে ধাবমান একটি শান্তিপ্রিয়, মানব হিতৈষী এবং অরাজনৈতিক গনসংগঠনের নাম “আহলে হাদীস”। আর, জমঈয়তে আহলে হাদীস পশ্চিমবাংলা হল এ সংগঠনের ক্ষুদ্রতম শাখা।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :- জমঈয়তে আহলে হাদীস পশ্চিমবাংলার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দিগভ্রান্ত মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়া। পবিত্র কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মুতাবিক মুসলিমদের আকীদা ও আমল সংশোধন করা। শরীআত সম্পর্কে সচেতন করা, যুবক-যুবতীদের চরিত্র গঠন করা, সামাজিক সংহতি ও সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করা, দেশ ও দশের কল্যাণের প্রতি আহব্বান করা, সর্বোপরি প্রকৃত মুসলিম ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলা। আবার সামাজিক অপরাধ যেমন সূদ, ঘুষ, জুয়া, মদ, ব্যাভিচার, পণ, রাহাজানি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করা। এবং জনগণকে সচেতন করে এসবের বিরুদ্ধে সাধ্যমত প্রতিবাদ গড়ে তোলা।

কর্মক্ষেত্র :  মূলতঃ পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আহলে হাদীস আকীদায় বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী, তৎসহ অজস্র মানুষ যারা ইসলামের সঠিক দিশা পেয়ে  আক্বিদা ও আমল পরিবর্তন করছে বা করবে তাদের এক ছায়াতলে একত্রিত করা। জনকল্যাণ মূলক কাজের ক্ষেত্রে জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে অসহায়, দারিদ্র ও বিপর্যয়পীড়িত জনগোষ্ঠীকে সাহায্যের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করা। তাছাড়া রাষ্ট্রের বিভিন্ন ইস্যুতে রাজ্যপালের সাথে সাক্ষাৎ । এছাড়া বিভিন্ন সময় মন্ত্রী বা আমলাদের সাথে বসা। বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন করা, যেমন রোহিঙ্গা নির্যাতন ইত্যাদি ইত্যাদি।

সম্পদ : জমঈয়তে আহলে হাদীস পশ্চিমবাংলার নিজস্ব কোনো স্থাবর সম্পত্তি নেই। আছে মাত্র একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কিন্তু সেখানে জমানো কোনো টাকা নেই। আজ রাজ্য সম্মেলনের জন্য গোটা পশ্চিমবাংলার প্রায় প্রত্যেকটি জেলায় কুপনের মাধ্যমে অর্থসংগ্রহ করা হচ্ছে। আমাদের সাধ অনেক সাধ্য কম। অর্থের অভাবে আমরা সামাজিক বহু ক্ষেত্রে কাজ করতে পারছিনা।

আয়ের উৎস :- জমঈয়তে আহলে হাদীস পশ্চিমবাংলার আয়ের মূল উৎস সহৃদয় সম্পন্ন জনগণের দান ও যাকাত।

কার্যকলাপ :-
* আকীদা সংশোধন :-  আহলে হাদীস সংগঠনের চিরন্তন নীতি আক্বীদার সংশোধন। আমরা অর্থাৎ আহলে হাদীসরা আক্বীদার ক্ষেত্রে শিরকের বিরুদ্ধে আপসহীন তাওহীদ বাদী।  ইসলামী দৃষ্টিকোণে আক্বিদার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। শুধু তাই নয়, আক্বিদা ইসলামের মৌলিক বিষয়ও বটে। আকীদা কথার অর্থ বন্ধন, আক্বিদা এমন এক বন্ধন যা মৃত্যুতেও ছিন্ন হবার নয়। আক্বীদার মূলে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আল্লাহ ভীতি। আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, আহারদাতা, জীবনদাতা, মৃতুদাতা, আরোগ্যদাতা, বিদ্যাদাতা, ইত্যাদি গুনে গুণান্বিত জানা এবং তাকেই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য হিসাবে গ্রহণ করা। সুতরাং একজন মুসলিমের আকীদার সংশোধন খুবই জরূরী। আকীদা সঠিক না হলে, কোনও আমলই আল্লাহর নিকটে গৃহীত হবে না। যে মানুষ আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করে সাথে সাথে কবর, মাযার, পাথর, মূর্তির নিকটে  মনস্কামনা ব্যক্ত করে, এমন মানুষের আকীদা ইসলামী আকীদা নয়।
আমাদের সংগঠন আপামর মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভ্রান্ত আকীদার সংশোধন করার কাজে নিয়ন্ত্রর ভাবে কাজ করে চলেছে।

* আমল সংশোধন :- আহলে হাদীস জাম আত আক্বীদার ক্ষেত্রে শিরকের বিরুদ্ধে যেমন আপোষহীন, ঠিক তদ্রুপ আমলের ক্ষেত্রে বিদআতের বিরুদ্ধেও আপোষহীন। আহলে হাদীস সংগঠন সর্বদা সুন্নাহ পন্থী। ইসলামের মৌল নীতিগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল এই যে, যে সমস্ত আমলের পক্ষে কুরআন অথবা সহীহ হাদীসের কোনো দলীল নেই তা পরিহার করা, তা আপাত দৃষ্টিতে যত ভালো মনে হোক না কেন তা বিদআত।
সমাজে প্রচলিত বিদআতী আমলের বিনাশ সাধন তদস্থলে সহীহ সুন্নাহর বাস্তবায়ন। আর এ লক্ষ্যে আমাদের সংগঠনের কর্মীরা সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সেতুবন্ধন :- পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে  ক্বুরআন সহীহ সুন্নাহ পন্থী জনগণের মধ্যে সার্বিক সংযোগ সাধনে তথা সেতুবন্ধনের কাজ আমরা নিরলসভাবে করে চলেছি। মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কলকাতা, হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, বীরভূম, উত্তর 24 পরগনা, দক্ষিণ 24 পরগনা, নদীয়া সহ  রাজ্যের যে সমস্ত জায়গায় কুরআন ও সহীহ সুন্নাহপন্থী তুলনামূলক কম সে সমস্ত জেলাতেও আমাদের সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে, তন্মধ্যে  বাঁকুড়া, পুরুলিয়া পূর্ব ও পশ্চিম মেদনীপুর,  উত্তরবঙ্গের আলিপুর দুয়ার, কোচবিহার, দার্জিলিং বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। 

সমাজ অবক্ষয়ের  কারণ ও তার প্রতিকার:-
মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবক্ষয়ের করালগ্রাস থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সংগঠন সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষভাবে বর্তমান প্রজন্মকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে সচেষ্ট।  দেশ ও জাতি গড়ার কারিগর যুবকরা নিজেদের অজান্তে ইসলাম ও সর্বোপরি দেশের স্বপ্নকে চুরমার করে দিচ্ছে,  আমাদের সংগঠন তাদেরকে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলোকে  কল্যাণ- অকল্যাণ,  ন্যায়- অন্যায়, সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি ও ভালো মন্দের পার্থ্যক নিরূপণে বিভিন্ন স্থানে সেমিনার, ইনডোর-আউটডোর প্রোগ্রাম তৎসহ মসজিদে খুতবার মাধ্যমে আদর্শ সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছে । আর, এ প্রচেষ্টার যথেষ্ট সফলতা আমাদের কে আশাবাদী করে তুলেছে।

* বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে নানান দুরভিসন্ধি মূলক মিথ্যা তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা বহু মানুষকে আক্রান্ত করে তুলেছে, তথাপিও আধুনিক প্রজন্মের শিক্ষিত জনমাসের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার আগ্রহ বিশেষ ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ঐ সমস্ত মানুষের কাছে ইসলামের স্বচ্ছ বার্তা প্রদানের জন্য আমরা বিশেষ ভাবে আগ্রহী বা সচেষ্ট।

* দুস্থ ও অসহায়দের সাহায্য প্রদান :- ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের অন্যতম হলো যাকাত। যাকাত প্রদান করেন ধনীরা আর তা বিতরণ করা হয় অসহায় দরিদ্র জনগণের মধ্যে। কারণ, ইসলাম মানবিক ধর্ম, অসহায়দের সাহায্য মুমিন মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে আমরা অত্যান্ত আগ্রহী। তবে, আমাদের সাধ অনেক, সাধ্য কম। রাজ্য সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা যথার্থ ভাবে অসহায়দের সাহায্য করতে পারিনা। তবে, তন্মধ্যে আশার আলো দেখিয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা সংগঠন। ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদ জেলার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে যাকাত ফান্ড। এ ফান্ড মুর্শিদাবাদ জেলা দ্বারা গঠিত হলেও পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাকাতদাতারা তাদের যাকাতের একটা অংশ পেরণ করেন। তা থেকে বিভিন্ন মাদ্রাসা, মক্তব, লাইব্রেরী, তৎসহ অসহায়, অক্ষম ও দরিদ্রদের অল্পবিস্তর সাধ্যমত সাহায্য করা হয়। আমরা আশা রাখছি আগামী দিনে গোটা বাংলা থেকে যাকাত সংগ্রহ এবং তা সুষম বন্টনের মাধ্যমে অসহায়দের জন্য সদর্থক ভূমিকা পালন করতে পারবো।

* আপাতকালীন ত্রাণের ব্যবস্থা :-  খরা, বন্যা, ঝড়, তুফান, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মত বিপর্যয়ের মুখোমুখি আমাদের হতে হয়। আমরা সংগঠনের মাধ্যমে আপামর জনসাধারণের নিকট থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে বিপর্যয় পীড়িতদের নিকটে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে আসামের ভয়াবহ দাঙ্গা কবলিত মানুষের সাহায্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলাম, তাছাড়া বিভিন্ন সময় মেদিনীপুর, উত্তর 24 পরগনা এবং ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা কবলিত মালদা, উঃ দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, বিহারের কিশনগঞ্জ ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ত্রাণ সামগ্রী  বন্যাপীড়িতদের হাতে তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। তাছাড়া ট্রাই সাইকেল ও বিভিন্ন অনুদান দিয়ে সাহায্য করেছি।

* ইসলামের নামে অ-ইসলামী  কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ  :- ইসলামের সরল পথকে কালিমালিপ্ত করার অভিপ্রায়ে ইসলামের শত্রুরা নানান ভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। স্থান-কাল ভেদে তাদের কুটকৌশলও ভিন্ন। জেহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপও সেই চক্রান্তের একটি ফসল। বিভিন্ন সময়ে মুসলিম কমিউনিটি জুলুম নির্যাতনের স্বীকার হয়, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে জেহাদের নামে চলছে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, তাদের নেপথ্যে রয়েছে ইসলামী শত্রুদের উস্কানি, অথবা স্বার্থনেষী কিছু মুসলিম। ইসলাম কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কার্য্যকলাপ সমর্থন করে না, বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ও সন্ত্রাস একই পংক্তিতে বসানোর জন্য এক শ্রেণীর মিডিয়া নিরন্তর ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে, তাদের জেনে রাখা ভালো যে, যথার্থ কারন ছাড়া কোনো একজন মানুষকে হত্যা করা ইসলাম তথা আল ক্বুরআন সমগ্র মানবতাকে হত্যা করার সমান ঘোষণা করেছে (৫/৩২) শুধু তাই নয় ক্বুরআনে  বিশৃঙ্খলা হত্যার চেয়েও অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে (২/১৯১)  যে ইসলামের এই নীতিমালা, সেই ইসলাম কি কখনো সন্ত্রাসী হামলার  অনুমোদন দিতে পারে? তবুও আমরা সর্ব প্রকার সন্ত্রাসী কার্য্যকলাপের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের জন্য বই পুস্তক, পত্রপত্রিকা, সেমিনার, প্রকাশ্য জনসভা তৎসহ মসজিদে মসজিদে খুৎবার মাধ্যমে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছি। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের যুক্ত কখনো কোনো আহলে হাদীস হতে পারে না।

প্রতিবন্ধকতা :-
* আর্থিক অস্বচ্ছলতা :- আমাদের সংগঠনের সব চেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থের সমস্যা। জমঈয়তের উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক ফান্ড নেই। সাময়িকভাবে যখন যেমন প্রয়োজন হয়, তখন কুপন বা বিল ছাপিয়ে জনগণের নিকট থেকে সাহায্য আদায় করা হয়। সংগঠনের স্থায়ী কোনো আয় না থাকায় চরম ভাবে আর্থিক সংকটে আমাদের ভুগছে হচ্ছে। বর্তমানে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করার লোক পাওয়া বড়ই দুঃসাধ্য। অর্থ ছাড়া সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান চালানো অসম্ভব, এগুলির  উন্নতির মূল সোপান অর্থ, কিন্তু জমঈয়তের হাতে সেটা নেই। তাই, জনগনের দান ও যাকাতের উপর নির্ভরশীলতার কারণে জমঈয়তের কাজ যথেষ্ট বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এ জন্য জমঈয়ত বেতন ভুক্ত যথার্থ কর্মী নিয়োগ করতে পারছে না। আপনাদের নিকটে সানুনয় আবেদন আগামী দিনে জমঈয়তের ভবিষ্যত পথকে সুগম করতে আপনার দেওয়া দান ও যাকাতের মাধ্যমে আপনাদের সংগঠন জমিয়তকে যথেষ্ট মজবুত করবেন বলে আমরা আশাবাদী।
* স্বেচ্ছাসেবী লোকের অপ্রতুলতা :-  যে কোনো কল্যাণকর কাজের নেপথ্যে থাকে নিবেদিত প্রাণ  কিছু স্বেচ্ছাসেবী মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম। দুঃখের সাথেই বলতে হচ্ছে জমঈয়ত সে রকম স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিত্বের যথেষ্ট অভাব মনে করছে।

*  অভাব বোধ :- আর্থিক অভাবের সাথে সাথে  ইসলামী আদর্শের যথার্থ বাস্তবায়ন এবং সেই সাথে ইসলাম শত্রুদের  উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অপব্যাখ্যার সঠিক জবাব দেবার জন্য প্রয়োজন যোগ্যতম ব্যক্তিত্বের। সর্বোপরি সংগঠনের কাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্যও দরকার বিদগ্ধ পন্ডিতের। একমাত্র যোগ্য ব্যক্তিত্বরাই পারে জমঈয়তের লক্ষ-উদ্দেশ্যে ও শরীআতের সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ নির্বিশেষে সকলের নিকট তুলে ধরতে। কিন্তু, জমঈয়ত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অভাববোধ করছে। আল্লাহর নিকট করুণ প্রার্থনা হে আল্লাহ! তুমি আমাদের মাঝে যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটাও, সাথে সাথে দেশ জাতির সার্বিক কল্যাণে কাজ করার তাওফীক দান করো-  আমিন।
আশার আলো :- আমরা জমঈয়তে আহলে পশ্চিমবাংলার পক্ষ থেকে অতীতে শাইখ আইনুল বারী সাহেব ও শাইখ ইসহাক মাদানী সাহেবের সাথে আপোষ- মীমাংসা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু উভয়ে  আমাদের প্রচেষ্টাকে ব্যার্থ করে দিয়েছেন।  হে আল্লাহ! তুমি আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল কর, আমীন।
আমাদের অতীত :- যুগে যুগে আহলে হাদীস নীতির অনুসারীরগণ সদা সর্বদা সর্বপ্রকার অপসংস্কৃতি ও অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। মাতৃভূমি ভারতবর্ষকে হানাদার ব্রিটিশশাসন মুক্ত করতে বা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হতে দেশের জন্য অকাতরে রক্ত দান করেছেন। স্বাধীনতা ইতিহাসে মীর তিতুমীর, হাজী শারিআতুল্লাহ, আকরাম খাঁন, এনায়েত আলী ও বেলায়েত আলীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, যিনি ইংরেজ বিতাড়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনিও আহলে হাদীস ছিলেন। এ সংগঠন  দেশ ও জাতির স্বার্থে সামর্থ অনুযায়ী সাধ্যমত কাজ করে চলেছে এবং ভবিষ্যতে সার্বিকভাবে যাবতীয় অপসংস্কৃতির মোকাবিলা করবে, ইনশাআল্লাহ।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা:-
1, ওয়েবসাইটে ও সমস্ত ধরনের মিডিয়া ব্যবহার।
2, শাখা সংগঠন তৈরি করা।
3, মিডিয়া সেল তৈরি করা।
4, আহলে হাদীসের থিন্কট্যাঙ্ক তৈরি করা।
5, শিক্ষা সেল তৈরি করা।
6, স্কুল, কলেজ, ও আদর্শ মাদ্রাসা নির্মাণ।

কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন :- আমি আন্তরিকভাবে সর্বপ্রথমে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি সেই সমস্ত জমঈয়ত কর্মীদের, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আজকের এই সম্মেলন। অতঃপর সেই সব দরদী ভাইদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ যাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ আনন্দ চিত্তে দান করে এ সম্মেলনকে সাফলমন্ডিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। স্বেচ্ছাসেবক, আলোচক অতিথি, পর্যবেক্ষক এবং উপস্থিত শ্রোতাবৃন্দের প্রতিও আমি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি যাঁরা উপস্থিত হয়ে আমাদেরকে ধন্য করেছেন। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের যাঁদের আগমন সম্মেলনকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তাছাড়া বিশিষ্ট সমাজসেবী, ব্যবসায়ীগণের উপস্থিতিতেও আমরা ভীষণভাবে উপকৃত হয়েছি, তাঁদের প্রতিও রইলো হার্দিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। সর্বোপরি আমি প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তৎসহ তাঁদের  সহকর্মী পুলিশ মহোদয়দের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে সম্মেলনকে নিরাপত্তা দান করেছেন এবং হার্দিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সেই সাথে আন্তরিক সাংবাদিক বন্ধুদের ও মা-বোনদেরকেও হে আল্লাহ! তুমি এ সম্মেলনকে আমাদের সকলের জন্য আখেরাতের পাথেয় করো, আমীন।

(টিডিএন বাংলায় প্রকাশিত লেখাটি জমিয়তে আহলে হাদিসের রাজ্য সম্পাদক আলমগীর সরদারের পাঠানো কপি)

head_ads