মায়ানমারে ফিরতে না বলে এখানেই খুন করুন – বলছেন বাংলায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা

0

জ্যোৎস্না বেগম, টিডিএন বাংলা, দক্ষিণচব্বিশ পরগনা: তিনবার আমরা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি। বাড়ি জমি সব ছেড়ে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। সেখানে আমাদের জায়গা হয়নি। চলে আসি ভারতে।দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, কাশ্মীর, রাজস্থান-ঘুরে ঘুরে চলছি।এখন এসেছি এখানে। বাবু আমাদের মায়ানমারে পাঠাবেন না। আর আমাদের প্রতি মায়া না থাকলে এখানে শেষ করে দিন। আমরা আরাকানে ফিরতে চাইনা। দীর্ঘ যন্ত্রনা আর হতাশা থেকে কথা গুলি বলছিলেন একজন উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা।

বহুদিন থেকে ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী পরিচয় পত্র নিয়ে বাস করছে প্রায় বেশ কিছু রোহিঙ্গা। কিন্তু তাঁদের অনেকেই এখনও আশ্রয় পায়নি।এই রাজ্য থেকে সেই রাজ্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বেশ কয়েক মাস আগে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ঘুটিয়ারী শরীফের কাছে বারুইপুর থানার হাড়দহ গ্রামে আটঘর রোহিঙ্গাকে  বাড়ি করে দেওয়া হয়।পুরুষ ৬ জন ও মহিলা ৬ জন,শিশু ১০ জন আছে। এতদিন তাঁরা অন্য রাজ্যে ছিলেন।

এলাকার সমাজসেবী ও একটি সামাজিক মানবাধিকার সংগঠনের নেতা হোসেন গাজী এইসব ব্যাক্তিদের নিজস্ব জায়গায় আশ্রয় দিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে,এই দুনিয়ায় একটু বাঁচার জন্য তাঁরা এখান থেকে সেখানে ছুটছেন।

একজন রোহিঙ্গা টিডিএন বাংলাকে বলছিলেন, ওখানে পাঁচবার দাঙ্গা হয়েছে। নেতা হলেই খুন করা হয়েছে। মুসলিম ও হিন্দু রোহিঙ্গাদের পড়াশোনা করতে দেওয়া হচ্ছে না। লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হয়। আর একটু শিক্ষিত হলেই খুন করা হয়।”

আপনাদের যদি নিজ দেশে পাঠানো হয় যাবেন?টিডিএন বাংলার এমন প্রশ্নের উত্তরে রোহিঙ্গারা বলছেন,’আমরা আর ওখানে ফিরতে চায়না।আমাদের ওখানে ফিরতে বললে, আত্মহত্যা করবো, বাসে ট্রেনে ধাক্কা মেরে মরবো।’

মোমিনা আখতার, মায়ানমারের নমিতয়াতে বাড়ি ছিল। ২৫ বিঘা জমি ছিল তাঁর। ৫ ভাই ছিল। ভারতে তিন ভাই আছে, ২ জন বাংলাদেশের টেকনাফে আছে। কে কোথায় কিভাবে আছেন জানেন না। অনেক রোহিঙ্গা বলছেন, আত্মীয় স্বজনদের সাথে তাঁদের সম্পর্ক নেই। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে জানা নেই।

কিন্তু কিভাবে ভারতে এলেন?
মায়ানমারের আইকাফ থানার মামড়া গ্রামের ২৮ বছরের আব্দুস সুবহান টিডিএন বাংলাকে বলছিলেন,’প্রাণ বাঁচাতে প্রথমে টেকনাফে আসি। তারপর কলকাতা হয়ে দিল্লি। তারপর আবার এখানে এলাম। মায়ানমারে আমাদের ঘর বাড়ি, কাগজপত্র সব জ্বালিয়ে দিয়েছিল।”
ঘুটিয়ারীতে আসা রোহিঙ্গাদের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কী নিদারুন কষ্টের মধ্যে আছেন তারা। শিশুরা স্কুলে পড়তে পারছেন না। সাড়ে তিন বছরের মোহাম্মদ ইরফান, ৬ বছরের মোহাম্মদ আব্দুর রহমান সহ অনেক শিশু স্কুল যায়না। স্থানীয়রা বলছেন, আমরা এইসব অসহায় মানুষদের চাল ডাল তুলে খেতে দিচ্ছি। কিন্তু শিশুদের পড়াশোনা করার ব্যবস্থা করুন।
রোহিঙ্গাদের জায়গা দেওয়া দরিদ্র হোসেন গাজী বহু সামাজিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত। রাজ্যের বিভিন্ন মানবাধিকার আন্দোলনে তাঁকে দেখা গেছে। নিজের কুড়ে ঘরের পাশে এইসব রোহিঙ্গাদের বাড়ি করার ব্যবস্থা করেছেন। মুসলিম সংগঠনগুলি পাশে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান এখানে এসে বাড়ি করতে টাকা দিয়েছেন। তাঁর সাথে ছিলেন আব্দুল মোমিন, আলি আকবার সহ যুব ফেডারেশনের অনেক নেতা। কামরুজ্জামান জানান, ভবিষ্যতে তিনি এইসব উদ্বাস্তু, অত্যাচারিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াবেন।

ঘুটিয়ারীতে রোহিঙ্গারা আসার পর স্থানীয় মানুষ দুহাত তুলে সাহায্য করছে।

স্থানীয় প্রশাসন এখানে এসে ছবি করেছে, ভিডিও করে নিয়েছে বলে মানুষের দাবি।

মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, অসহায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার জন্য উগ্রহিন্দুত্ববাদী শক্তি বিরোধীতা করেছে। তারা মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে।

মায়ানমারের ভাষা বলা মানুষগুলি এখন ঠিক হিন্দি বলছেন।অনেকেই বাংলা বলছেন কিন্তু লিখতে পারেন না। কিন্তু বাংলা শেখার চেষ্টা করছেন।এক ভাষা ভুলে আরেক ভাষা শিখছে।এক ঘর ভেঙে আরেক ঘর গড়ছে।
কিন্তু কেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর এই অত্যাচার করা হয়েছে? ২৫ বছরের মুহাম্মদ আমানুল্লাহর ছোট্ট মন্তব্য,”
আমরা দিন মজুর। কেন এইসব হচ্ছে বুঝিনা।”
কনকনে শীত পড়েছে।শিশু ও নারীদের জন্য পোশাক দরকার। সেই সাথে খাদ্য। এলাকার মানুষ রোহিঙ্গা পুরুষদের নিজেদের বাড়ির কাজে ডাকছেন আর তার বিনিময়ে পারিশ্রমিক দিচ্ছেন।
কিন্তু দেশে দেশে ঘুরতে থাকা লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া সংসারের এইসব মানুষগুলি কি আর কোনও দিন স্বভাবিক জীবন কাটাতে পারবে? এতো বড়ো দুনিয়ায় এই পৃথিবীর সন্তান হিসাবে বিশ্ব কি  তাঁদের একটু বাঁচতে দেবে? অন্য দেশ থেকে আসা কোটি কোটি শরণার্থীর মতো ভারতবর্ষ কি এইসব বাঙালি রোহিঙ্গা রিফিউজিদের বুকে টেনে নিতে পারবে আন্তরিক ভাবে? উঠছে প্রশ্ন। তবে বিতর্ক যায় থাক, অত্যাচার, ধর্ষণ আর খুনের ভয় থেকে সব ছেড়ে যারা দিকভ্রান্ত হয়ে এদেশ সেদেশ ঘুরছেন, নিরপরাধ শিশুদের কথা ভেবে হলেও বিশ্ববিবেক একটিবার  তাদের বিষয়ে ভাবুক। অন্তত মানুষের কাছে এইটুকু দাবি করতে পারে রোহিঙ্গারা।