নদীয়া-মুর্শিদাবাদের মিলন অধরাই, ২২ বছরেও শেষ হয়নি করিমপুর-বক্সিপুর ব্রিজের কাজ

0

রেবাউল মন্ডল, টিডিএন বাংলা, করিমপুর: নদীয়া জেলার উত্তরে সীমান্তবর্তী এলাকা করিমপুর। করিমপুর বাজার সংলগ্ন খড়ি নদী। ঘাট পেরুলেই মুর্শিদাবাদ।

পরস্পরের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুই জেলার মানুষকে আজও পেরুতে হয় নড়বড়ে বাঁশের সেতু। ঝুঁকির সম্ভবনা প্রতি মুহূর্তেই। শিশু থেকে আশি বর্ষায় বিপদ সবার। জুতো হাতে এক হাঁটু কাদা জল পেরুতে হয়। কখনো সবজি কিংবা ধান গম বোঝাই নৌকা, কিংবা পাট বোঝাই ঘোড়ার গাড়ি প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে।

Advertisement
head_ads

অফিস টাইমে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া থেকে শিক্ষকদের খেয়া পেরুতেই অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টা খানেক।

কামুড়দিয়াড় নুজবল হক হাই মাদ্রাসার শিক্ষক লুত্ফর বিশ্বাস ও মধুরকুল হাই স্কুলের শিক্ষক স্বরূপ সরকার এদিন পারাপারের সময় বলছিলেন, ‘ঘাটটিতে সরু বাঁশের সাঁকো হওয়ায় অফিস টাইমে প্রচন্ড যানজটের সৃষ্টি হয়। বাইকে একজন আসলে অন্যজন দাঁড়িয়ে থাকে। পিচ্ছিল সাঁকোর উপর প্রায়ই বাইক নিয়ে আছাড় খেতে হয়। করিমপুর থেকে প্রায় একশ জন শিক্ষক ওপারে বিভিন্ন স্কুলে চাকরি করেন। সবাই ভুক্তভোগী। আমরা চাই দ্রুত ব্রিজটি হোক।’

করিমপুরের নার্সারি থেকে হাই স্কুল, গার্লস স্কুল ও কলেজে ওপার থেকে আসে হাজার খানেক পড়ুয়া। করিমপুর গার্লস স্কুলের ছাত্রী মেরিনা খাতুন, করিমপুর পান্নাদেবী কলেজের ছাত্র মহঃ দাউদ হোসেন দুঃখের সুরে জানালেন, ‘বর্ষায়  সাঁকো ডুবে যাওয়ায় নৌকা চলাচল করে। অনেক দেরি হয় পার হতে। অনেক সময় স্কুল টিউশনে সময়মত মত পৌঁছুতে পারিনা আমরা।’

১৯৯৫ সালের ৬ জুলাই সংসদ মাসুদাল হোসেন, বিধায়ক আনিসুর রহমান ও চিত্ত বিশ্বাসের সময় করিমপুর-বক্সীপুর এই সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। তারপর কেটে গেছে এক এক করে ২২টি বছর। ২০০৬ এ ফের হয় শিলান্ন্যাস। যেটুকু তৈরি হয়েছিল তার কংক্রিট গুলোও ঝরে ঝরে পড়ছে এখন। ব্রিজ কবে হবে সাধারণ মানুষ আজও জানেনা। কিন্তু কোটি কোটি টাকার এই সম্পত্তি যে নষ্ট হতে বসেছে তা এখন সবাই টের পাচ্ছে।

কামুড়দিয়াড়ের সবজি ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। সবজি বিক্রি করতে করিমপুরের বাজারই তার একমাত্র ভরসা। তিনি আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘বাজারে সবজি নিয়ে যেতে অনেক ভোরে উঠতে হয়। পারাপারে অনেক সময় মাল পড়ে যায় জল কাদায়। অত ভোরে খেয়া পারাপার না হওয়ায় বাজারে পৌঁছুতে দেরি হয়। ফলে সবজির ন্যায্য দাম পাইনা আমরা। ব্রিজটি হলে খুব ভালোই হত।’

সেতুটি হলে নদিয়ার করিমপুরের সঙ্গে মুর্শিদাবাদের ডোমকল, বক্সিপুর, কামুড়দিয়াড়, মোমিনপুরের যোগাযোগের দিগন্ত খুলে যাবে। আর এই ভাবনাতেই সেতুটির কাজ শুরু হয়েছিল বলে জানালেন ডোমকলের বিধায়ক আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, “করিমপুরের বিধায়ক মহুয়া মৈত্রকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে বলেছি, সরকারে এখন তোমরা আছো। দেখ সমস্যা কাটিয়ে কাজটি শেষ করা যায় কিনা; ব্রিজটি হলে তোমাদেরই সুনাম হবে। এবিষয়ে সবরকম সাহায্য করতে আমি রাজি আছি।”

কিন্তু আজও শেষ হয়নি। কেন হয়নি তা নিয়ে নানান জনের নানা মত। কেউ বলছেন, সেতু হলে এপারে এসে হামলা করবে ওপারের দুস্কৃতীরা। আবার কারো মতে, এপারের কিছু মারোয়াড়িদের ঘর ভাঙা পড়বে বলেই তারা কেস করে আটকে রেখেছে ব্রিজের কাজ। কিন্তু প্রকৃত কারণ যে কি তা কেউই জানছে না।

সাংসদ বদরুদ্দোজা বলছিলেন, “আমরা অনেক চেষ্টা করেছি ব্রিজটি সম্পূর্ণ করতে। বক্সিপুর প্রান্তের জমি জট কেটে গেছে। এপারে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু করিমপুরের কিছু মানুষ ব্যক্তি স্বার্থে মামলা করে ব্রিজের কাজটি আটকে রেখেছে। যা চরম দুর্ভাগ্যের।”

করিমপুরের প্রাক্তন বিধায়ক সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ বলছিলেন, “করিমপুরে ব্রিজ সংলগ্ন যাদের জমি পড়ছে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তাদের অন্যত্র বিকল্প জমি দেবার আশ্বাস দেওয়া হলেও তারা রাজি হয়নি। এমনকি তাদের কয়েকগুণ বেশি ক্ষতিপূরণ দেবার কথাও বলা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিমকোর্টে মামলা করেছে। কিন্তু দুই পারের সিংহভাগ মানুষই চায় সেতুটি হোক।”

ব্রিজটির নির্মাণ কবে শেষ হবে এবিষয়ে নদীয়া জেলা সভাধিপতি বাণী কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের দিকের জমি ক্রয়ের কাজটি কমপ্লিট করে যথারীতি পিডব্লিউডির হাতে হ্যান্ডওভার করেছি। বাকিটা কাজ ওদের। আশা করছি খুব দ্রুতই কাজটি শেষ হবে।’

স্থানীয়রা বলছিলেন, দুই জেলার জেলাশাসক, বিধায়ক ও রাজ্য সরকার যদি চায় খুব দ্রুতই কাজটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব, কারণ কাজটি প্রায় হয়েই গেছে। একটু খানি বাকি। আদোও হবে কি? সরকার কি ভাবছে? প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

সব রাজনৈতিক দলের লোকেরাই চাইছে ব্রিজটি হোক। সেতুটি হলে বহরমপুর যেমন হাতের মুঠোয় হয়ে যাবে করিমপুর বাসীদের। আবার কলকাতা যাওয়াও সহজ হয়ে যাবে বক্সিপুর, কামুড়দিয়াড়, মোমিনপুরের মানুষদের।

ওপারের স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের দৈনন্দিন অসুবিধার কথা কার্যত স্বীকার করে করিমপুরের শিক্ষক তথা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সঞ্জীব ঘোষ টিডিএন বাংলাকে বলেন, “ওপারের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ আর্থ-সামাজিক ভাবে করিমপুর বাজারের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তাছাড়া, যে ব্রীজের ৮০% কাজ হয়েই গেছে, তার কংক্রীটগুলি এখন ঝরে ঝরে পড়ছে। তাহলে নিশ্চয় সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। আসলে ভোট সর্বস্ব রাজনীতিই এখানকার বড়ো সমস্যা।”


সকলের দুঃখ ব্রিজটি ২৩টি বছর ধরে পড়ে আছে। দেখে যেন মনে হয় কোন অভিভাবক নেই, কোন জনপ্রতিনিধি নেই। কোন সরকার নেই। একলা হয়ে ব্রিজটি ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ নিজেরাও জানেনা এই সেতুটি কবে তাদের ব্যাবহার যোগ্য হবে।

এবিষয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে ওয়েলফেয়ার পার্টির নদীয়া জেলা সভাপতি সাহাবুদ্দিন মন্ডল বলেন, আসলে জনগণের সমস্যাকে রাজনৈতিক নেতারা গুরুত্ত্ব দেয় না। তারা দেখে শুধু নিজেদের স্বার্থ। তবে সব কিছু শুধু আইন দিয়ে হয় না। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে রাজনৈতিক ফায়দা বাদ দিয়ে উভয় জেলার ঊর্দ্ধতন আধিকারিক ও রাজনীতিকদের নিয়ে আলোচনায় বসা উচিত। তবে কিছু ধূর্ত স্বার্থবাজদের বিরোধিতা থাকবেই।” তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুই জেলার মানুষকে যৌথ আন্দোলনে নামার দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

আসলে আন্দোলন করলেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে? ব্রিজের কাজ যদি সম্পন্ন করতে নাই-ই দেয়া হবে তাহলে শুরুতেই কেন বাধা দেওয়া হয় নি? জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেন তাকে ভগ্নদশায় এভাবে ফেলে রাখা হল? প্রশ্নগুলি কিন্তু করিমপুর-ডোমকল বাসীদের মনে থেকেই যাচ্ছে।

head_ads