নাসিমা বিবির ‘নিকাহ হালালা’, টিডিএন বাংলার অন্তরতদন্তমূলক প্রতিবেদন 

0

সামীম আক্তার ও আমিনুল ইসলাম, টিডিএন বাংলা, মুর্শিদাবাদ : 

(নাসিমার নিকাহ হালালার ফতোয়ার বিষয়টি প্রচার হতেই বুধবার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতারা আসল ঘটনা জানতে আগ্রহী হোন এবং জঙ্গিপুরে যান। টিডিএন বাংলার প্রতিনিধিরাও পুরো বিষয়টি নিয়ে দিনভর খোঁজ নেন। কথা বলেন নাসিমা, রবিউল, নাসিমার মা, ইমাম, সাধারণ মানুষ ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের সাথে।)

Advertisement
head_ads

মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরের রঞ্জিতপুরের দুই বাসিন্দা রবিউল ইসলাম ও নাসিমা বিবি। একই গ্রামে কয়েকটি বাড়ি পরেই তাদের সাথে বছর আঠারো আগে বিবাহ হয়। পেশায় রবিউল একটি বেসরকারি নার্সারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে নাদিম ইকবাল (১৪) স্থানীয় স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়াশুনা করে ও মেয়ে নাসিফা ইকবাল সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে।  গ্রামে স্কুল হওয়ার সুবাদে  গ্রামের শিক্ষিত বেকার ছেলেরা এই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। নাসিমার আবদারে বছর তিনেক আগে ওই স্কুলে নাসিমার ছোট বোনকেও শিক্ষকতা পদে কাজে লাগান রবিউল ইসলাম বলে জানা গেছে। তার পরেই রবিউলের সাথে নাসিমার ছোট বোনের ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক বেড়ে উঠে। যখন সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে সেকথা জানতেই নাসিমার সাথে শুরু হয় বাক বিতন্ডা, ঝামেলা। সেই সময় এক পর্যায়ে রাগের মাথায় রবিউল তার স্ত্রী নাসিমা কে ‘তালাক তালাক তালাক’ বলে ঘোষনা দেন। কিন্তু তালাক দিলে কী হবে? নাসিমা বিবি তার স্বামীর তালাক শুনতে পাইনি ও তাকে তালাক দেয়নি, এই দাবি নিয়ে স্বামীর বাড়িতেই থেকে যান। সেসময় রবিউল লুকিয়ে নাসিমার ছোট বোন কে বিয়ে করেন বলে খবর। তার পরেই ঘটে যত বিপত্তি!  সমাজের লোক তার ভালোর উদ্দেশ্যে প্রথমে তাকে বুঝিয়ে বলে দুই বোন কে নিয়ে একসাথে সংসার করা ইসলাম সমর্থন করে না, সেই সাথে এটা আইন বিরোধী কাজ, তাই যে কোনো একটা ব্যবস্থা করো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা ছাড়ায় প্রায় দশমাস দুই বোন কে নিয়ে এভাবেই চলে রবিউলের সংসার। দশ মাস এইভাবে অতিবাহিত হওয়ার পরে রবিউল সিদ্ধান্ত নেয়,দুই বোনের মধ্যে একজন কে ছেড়ে দেবে। তার পরেই ছোট বোন কে তালাক দেয়। কিন্তু তালাক দিলেও নাসিমার ছোট বোন তখনও রবিউলের স্কুলে শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। বড় স্ত্রী নাসিমা স্কুল থেকেও তাকে সরানোর দাবি তোলেন। রবিউলের বক্তব্য ছিলো সেশন শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি, এই সময়টা শেষ হয়ে গেলেই তাকে স্কুল থেকেও সরিয়ে দেওয়া হবে,কিন্তু তাতেই ঘোরতর আপত্তি জানায় নাসিমা। স্বামী কথা না শুনায় নাসিমা মিলাদ অনুষ্ঠানের সময় বাপের বাড়ি গিয়ে তার ভাইদের বিষয়টি বলেন ও  রবিউলের স্কুলে  পাঠায়। স্কুলে নাসিমার ভাইরা এসে রবিউলকে শাসিয়ে যায় ও  তাদের ছোট বোন কে স্কুল থেকে বাড়ি নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। তখন থেকেই স্বামী রবিউলের সাথে স্ত্রী নাসিমার গন্ডোগোল জোরালো হয়ে উঠে। সে সময়েও নাসিমা স্বামীর বাড়ি ছাড়েননি।  এমনকি এক পর্যায়ে অর্থাৎ গত ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রবিউল জোর করে তাকে বাপের বাড়িও পাঠিয়ে দেয় বলে অভিযোগ।
সেপ্টেম্বর মাসে যখন জোর করে নাসিমা কে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো  তখন ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নাসিমা গ্রামের লোকজন কে তাদের বিচারের দাবি জানান। গ্রাম্য সালিশি সভা বসলে রবিউল ও নাসিমা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তারা একে অপরের সাথে পুনরায় সংসার করতে ইচ্ছা পোষন করেন। তাতে আপত্তি করেননি কেউ। গ্রামের মোড়লরা নাসিমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে রবিউলের কাছে অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দেওয়ার দাবি জানান, স্ত্রীকে পেতে তাতেও রাজি হয়ে যান রবিউল। কিন্তু বিচার হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষন পর সমাজের কয়েকজন লোক এসে তাকে হালালা পদ্ধতির কথা শোনান । তাতে নাসিমা আপত্তি জানান এবং হালালা পদ্ধতি পালন না করেও স্বামীর কাছে যেতে চাইলে তা মাজহাব বিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন স্থানীয় মৌলানা। নাসিমা বিবি মুর্শিদাবাদ জেলা কেন্দ্রীক সংস্থা রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি খাদিজা বানুকে বিষয়টি জানান। যদিও এখনও নাসিমা ও তাঁর স্বামী  চায়ছেন, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই সংসার জীবন করতে।
এবিষয়ে নাসিমা বিবি টিডিএন বাংলাকে জানান,  আমাকে তো তালাকই দেওয়া হয়নি তাহলে আমাকে কেন নিকাহ হালালা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে? তিনি জানান, গ্রামের মোড়লদের কাছে আমার পারিবারিক সমস্যার কথা তুলে ধরি এবং সমাধানের দাবি জানায়, তাঁরা আমার সংসারের শান্তি এবং আমার ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে ফের স্বামীর কাছে ফিরে গিয়ে নতুন ভাবে সংসার করার মতো সুস্থ একটা সমাধানের ব্যবস্থা করেন। আমাকে প্রায় অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দেওয়ার কথা বলা হয়। আমার স্বামী রবিউলও তাতে আপত্তি করেননি। শালিসি সভায় কিন্তু আমাকে কেউ জোর করে নিকাহ হালালার কথা বলেননি। বিচারের দু’দিন পর এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি ও সাথে একজন আলেম এসে আমাকে এই হালালার কথা বলেন। তখন আমি তাদের কে বলি আমাকে এই হালালার কথা বিচারের দিন বলা হলো না কেন? তারা উত্তর দেয় এটা আমরা আলেমদের কাছে ফতোয়া নিয়ে এসেছি। তখনই আমি তাদের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সব মাওলানাদের কাছে যাচাই এর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই খাদিজা বানুর কাছেও বিষয়টি আমি জানতে চাই, তিনি আমাকে এই পদ্ধতি ইসলামে নেই বলেই সাথে সাথে মিডিয়ার সাথে কথা বলে নেই। আমি এখনও বলছি সমাজের লোকের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, আমার অভিযোগ যে কয়েকজন আমাকে এই পদ্ধতির কথা বলেছে তাদের বিরুদ্ধে। আমি এই বিষয়ে আলেমদের কাছে আরো বিস্তারিত জানতে চাই। আমার শেষ কথা, আমাকে আমার স্বামী তালাক দেয়নি, তাই কোনো পদ্ধতি আমি অবলম্বন করবো না।”
স্থানীয় আলেমের কাছে বিষয়টি জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, রবিউল বিচারের দিন পর্যন্ত স্বীকার করেছে আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিয়েছি – তাই তাদের সেই কথা অনুযায়ী আমরা বিচার করেছি। তার স্বামীর কাছে যাওয়ার পাশাপাশি তাঁকে অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দেওয়ার বিচার করা হলে সেটাও তারা মেনে নেয়। কিন্তু ইসলামের নিয়ন অনুযায়ী যেহেতু স্ত্রীকে তালাক দিলে তাকে আর স্ত্রী রুপে গ্রহন করা যায় না। তবে আমাদের হানাফি মাজহাব মতে তাকে নিকাহ হালালার মাধ্যমে তিনমাস ইদ্দত পালন করলেই আবার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে। তাই তাকে এই প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু না মানলে তাকে সমাজ থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হবে এটা কখনোই বলিনি। আমরা ইসলামের নিয়ম কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে পারি না।

অবশ্য এত কিছুর পরেও নাসিমার স্বামী রবিউল ইসলাম টিডিএন বাংলাকে বলছেন,এটা পারিবারিক সমস্যা। আমরা নিজেরাই সমাধান করে নেবো। কিন্তু কয়েকটা মিডিয়ার লোক আমাদের এই ঘটনাকে বাড়িয়ে প্রচার করেছে।

এবিষয়ে রবিউলের শ্বাশুড়ি মেহেরুন বেওয়া জানান, আমি অসহায় মানুষ। স্বামী নেই। মেয়েদের আবার এধরণের সমস্যায় আমরা চিন্তিত। আমি চাই আমার মেয়ে সুখে শান্তিতে থাকুক। কোনোরকম ঝামেলায় জড়াতে চাই না।

এই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য সভাপতি মুহাম্মদ নুরুদ্দিন বলেন,”একসাথে দুই বোনকে বিয়ে করা হারাম। এবং প্রচলিত হালালা পদ্ধতি কোনও ভাবেই ইসলাম সম্মত নয়। এখানে যা হয়েছে তা পারিবারিক সমস্যা। একজন ব্যাক্তি দুই বোনকে কী করে বিয়ে করতে পারেন বা অবৈধ সম্পর্ক রাখতে পারেন? রবিউল যে কাজ করেছে তা সম্পূর্ণ অনৈতিক,ইসলাম বিরুদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এইসব ইসলামে নেই। ছেলেটিতো দুইবোনকে নিয়েই ছিনিমিনি খেলেছে। তবে যা হবার হয়েছে, এখন উচিৎ হবে তওবা করে সকলের ইসলামের পথে ফিরে আসা। জামায়াতে ইসলামী হিন্দের স্থানীয় শাখা ওই পরিবারের মধ্যে যাতে শান্তি ফিরে আসে তার জন্য কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে উদ্যোগ নিয়েছে। মানুষ যখনই ভোগবাদী,স্বেচ্ছাচারী হয়েছে তখনই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।”

head_ads