টিডিএন বাংলা ডেস্ক: কোথাও আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা কেন্দ্র চালানো হচ্ছে। কোথাও ছোট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কোথাও স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়া হয়েছে। কোথাও আবার শিশু সংস্কার কেন্দ্রের নামে চলছে স্থানীয় শিক্ষা কেন্দ্র। কোনও কোনও জায়গায় ‘গো ভিত্তিক গ্রাম প্রকল্প’-র নামে চলছে নানা কাজ। এমন সবই পরিচালিত হচ্ছে ‘হিন্দুত্বের’ ভাবধারাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। রাজ্যে এমন প্রায় নশোটি সামাজিক প্রকল্প গড়ে তুলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আর এস এস)। তাদের অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভার পরে সঙ্ঘের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — পঞ্চায়েত দখলের লক্ষ্যে এই সামাজিক সংগঠনগুলিকে প্রচারক, ভোটের সংগঠক হিসাবে ব্যবহার করা হবে।
সঙ্ঘের রাজ্য কমিটির এক নেতার কথায়,‘‘প্রশাসনের অনেক কর্তাও সহযোগিতা করছেন। সম্প্রতি হুগলীর একটি কলেজে আমাদের সংগঠন সংস্কৃতভারতীর অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে ভাষণ দিয়েছেন এক মহকুমা শাসক। কেন ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষাতেই পড়া উচিত, কোনও অনুবাদে নয় — তা ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। রাজ্যের অনেক ব্লক, মহকুমাতে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। আমাদের সামাজিক প্রকল্পগুলির প্রভাব এ থেকে বোঝা যায়।’’ একশো দিনের কাজের মজুরি, বিভিন্ন সামাজিক ভাতা বণ্টনে দুর্নীতি, বৈষম্য রোধে রাজ্য সরকারের আমলারা তৃণমূল কংগ্রেসের মদতে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। তাঁরাই তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের নাকের ডগায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কাজে হাজির হয়ে উৎসাহ জোগাচ্ছেন — পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। সঙ্ঘের আর একটি সূত্র জানাচ্ছে, বিভিন্ন স্কুলকেও নিজেদের কাজের প্রসারে ব্যবহার করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ২০শে ডিসেম্বর সঙ্ঘ দুর্গাপুরের ইছাপুরে দুঃস্থদের কম্বল দেওয়ার আয়োজন করে। দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের শিক্ষিকাদের প্রভাবে সঙ্ঘের সেই অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে আদিবাসীদের হাতে কম্বল তুলে দেয়। সঙ্ঘের নেতারা সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। সঙ্ঘের সূত্রে জানা গেছে, দুর্গাপুরের দুটি তথাকথিত নামী স্কুল নানাভাবে সঙ্ঘের কাজে সহযোগিতা করছে। অথচ ওই দুর্গাপুরেই পঞ্চায়েত অথবা পৌর এলাকায় বামপন্থীদের কর্মীদের যে কোনও উদ্যোগ পণ্ড করতে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা মারমুখী ভূমিকা পালন করে। সঙ্ঘের যাবতীয় তৎপরতা তাদের সামনেই চলছে। জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সঙ্ঘ ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা করছে গ্রামের মধ্যে। বেশিরভাগ জায়গাতে তাদের পরিচালিত স্কুল বা শিশু সংস্কার কেন্দ্রগুলির নামে আয়োজিত হচ্ছে নানা অনুষ্ঠান। অন্যদিকে হুগলী, বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের মতো অনেক জেলার সম্পন্ন কৃষকদের গ্রামে ‘সনাতন হিন্দু পরিবারের ধারণা’, ‘সনাতন ধারণা অনুসারে সমাজে মেয়েদের ভূমিকা’ — এমন সব বিষয়ে আলোচনাসভার আয়োজন করা হচ্ছে। সঙ্ঘের এক নেতার কথায়,‘‘স্থানীয় পঞ্চায়েত বা গ্রামের প্রভাবশালী হিন্দুর উঠোনে এমন কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। স্বভাবতই শাসকদলের কর্মী পরিবারের সদস্যদের অনেকে আসছেন। উদ্যোগও নিচ্ছেন।’’

এসবের অন্যতম ফল — গত চার-পাঁচ বছরে নানা সামাজিক পরিষেবার অছিলায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের রাস্তায় এগিয়েছে আর এস এস। সঙ্ঘের রাজ্য কমিটির এক নেতার কথায়,‘‘আদিবাসী এলাকা, সীমান্তের ধারেপাশের তফসিলি প্রধান অঞ্চল, দেশভাগের পর এদেশে চলে আসা পরিবারগুলির বসবাসের গ্রামগুলিতে আমাদের কাজকর্ম বেড়েছে। এই সব এলাকায় শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বনির্ভরতার নানা প্রকল্পকে ভিত্তি করে আমাদের সংগঠন কাজ করে। রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার কারণে যারা বঞ্চিত, তারা অনেকে এই সংগঠনগুলির মাধ্যমে পরিষেবা, সহায়তা পান। ফলে গ্রামগুলিতে আমাদের প্রভাব তৈরি হয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে সেই সংগঠনগুলি গ্রামবাসীদের মতামত তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।’’ সঙ্ঘের সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে সঙ্ঘের ৪৬২টি সেবা প্রকল্প চলছে। উত্তরবঙ্গে এই সংখ্যা ১৫৯টি। দক্ষিণবঙ্গের পঞ্চায়েত এলাকায় যে ‘সেবা প্রকল্প’গুলি সঙ্ঘ চালাচ্ছে, তার মধ্যে শিক্ষা সংক্রান্ত ১৮৮টি, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ১৬৯টি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা সংস্থা গড়ে তোলায় উৎসাহিত করার ৬৯টি এবং ৩৬টি অন্যান্য সামাজিক কাজের প্রকল্প আছে। সঙ্ঘের দক্ষিণবঙ্গের কার্যবাহ জিষ্ণু বসু বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ‘‘দক্ষিণবঙ্গের শহর-মফঃস্বলের ১৫৬টি বস্তি এলাকায় আমাদের নানা ধরনের সামাজিক কাজ চলছে। উত্তরবঙ্গের শহরাঞ্চলেও আমাদের কিছু কাজ আছে।’(সৌজন্যে-গণশক্তি)