টিডিএন বাংলার খবরের জের : নুর জাহানারা হাইমাদ্রাসার প্রধান শিক্ষককে সংবর্ধনা ফারাক্কায়

0

রেবাউল মন্ডল ও শামীম আক্তার, টিডিএন বাংলা, ফারাক্কা : অর্থ-শিক্ষা-সংস্কৃতির দিকে পিছিয়ে পড়া ফারাক্কার পদ্মা ভাঙ্গন কবলিত মুসলিম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরা ছোট থেকেই বাবা মায়ের সঙ্গে কেউ বিড়ি বা হকারীর কাজ করে। ফলে কিছু শিশু স্কুলে  ভর্তি হলেও মাঝপথে ছেড়ে দেয় বিদ্যালয়। এখানকার বড় অংশের শিশু এখনোও প্রথম প্রজন্ম শিক্ষার্থী। এই রকম পরিবেশে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে ইতিমধ্যেই নজির সৃষ্টি করেছে মহেশপুরের নুর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জানে আলম। বুধবার তাঁর এই কৃতিত্বকে সম্মান জানালো মহেশনগর গ্রাম পঞ্চায়েত।

ঐ প্রতিষ্ঠানটি স্কুলছুট শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করে নজর কেড়েছে প্রশাসনের। আর এর পুরো কৃতিত্বটাই প্রধান শিক্ষক জানে আলম সাহেবের এমনটাই বলছেন এলাকাবাসীরা। প্রধান শিক্ষকের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়ে মাদ্রাসার অভিভাবক আব্দুল হক, বিষ্ণু মন্ডলরা জানালেন, শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই এলাকায় পদযাত্রা, হ্যান্ডবিল, মাইকিং করে জনসচেতনতা গড়ে তুলে এখন অনেকটাই সফল তিনি। ‘মিনা মঞ্চে’র প্রেরণায় জীবনে স্কুলের মুখ না দেখা অনেক পড়ুয়াই এখন বিদ্যালয় মুখী। ক্রমশই কমছে খোলা মাঠে শৌচকর্ম। জানে আলম সাহেবের প্রচেষ্টায় এলাকায় সফল হয়েছে ‘নির্মল মিশন বাংলা’ অভিযানও।
ফারাক্কা চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক
চন্দ্রিমা দে বলেন, “জানে আলম সাহেব নির্মল বাংলা মিশনের প্রচার চালিয়ে এলাকায় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন। মীনা মঞ্চের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্কুলছুটদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করার কাজ করে চলেছে যা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য।”
মিনা মঞ্চের অন্যতম সদস্য মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া মাহিনূর বেগমের কথায়, স্যারের সঙ্গে আমরা প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে এখনো যারা স্কুলে আসেনি তাদের নাম লিখে তাদের বাবা মাকে বোঝায়। আমাদের দেখে বিড়ি বাঁধা, হকারী কাজ ছেড়ে  প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ছেলে মেয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হচ্ছে।
ফারাক্কার বিডিও কেসাঙ্গ ডেন্ডুপ ভুটিয়া বলছিলেন, এতদঞ্চলে দীর্ঘদিন কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিলনা। ২০১৪ থেকে  ধারাবাহিক “চলো স্কুল যাই” প্রচারাভিযান চালিয়ে জানে আলম সাহেবের মাদ্রাসায় এখন ১৩ থেকে ৬০০ জন পড়ুয়া পাঠরত। তাঁর এই প্রয়াসকে সম্মান জানাই।
কিন্তু কে এই জানে আলম? মুর্শিদাবাদের বড়ঞা থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত প্রান্তিক চাষী পরিবারে বেড়ে উঠা ব্যক্তিত্ব জানে আলম। মাত্র ৪২ দিন বয়সে বাবাকে হারান। নিরক্ষর বিধবা মায়ের গৃহে বহু কষ্টে নিজের প্রচেষ্টায় শিক্ষার আঙ্গিনায় এখন উজ্জ্বল নক্ষত্র জানে আলম সাহেব।
২০০৫ এসএসসি তে কোচবিহার হলদিবাড়ির হেমেন্দ্রকুমী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহশিক্ষক পদে যোগদান করেন তিনি। একাডেমীর সম্পাদক ও বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদক তথা ও টিআইসির দায়িত্বও সামলান তিনি। তিনি মনে করেন মাদ্রাসার পড়ুয়ারা স্কুলের থেকে পিছিয়ে। তাদের উন্নয়নের জন্যে এমএসসি দিয়ে ২০১০ সালে জঙ্গিপুর মুনিরিয়া হাই মাদ্রাসায় যোগদান করেন। তিনি ভেবেছিলেন সহ শিক্ষক থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় না  তাই তিনি প্রধান শিক্ষকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ফারাক্কা ব্লকে মহেশপুর বটতলা নিউ সেট আপ জুনিয়ার হাই মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। প্রথম দিকে নানা বাধার সম্মুখীন হলেও আজ তিনি সুনামের সাথেই মাদ্রাসা চালনা করছেন বলে জানালেন, পঞ্চায়েত প্রধান জাসমিনারা খাতুন।

 আরও পড়ুন ঃ –নুর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের স্মরণ

অল ইন্ডিয়া আইডিয়াল টিচার এসোসিয়েশনের মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি মফিজুর রহমান জানান, শিক্ষা ও সমাজসেবী শিক্ষক জানে আলমের এই কৃতিত্বকে সম্মান জানাতে ২০১৭তে আমরা তাঁকে বিশেষ কৃতি শংসাপত্র প্রদান করেছি।
এক কথায় জানে আলমের মাদ্রাসা এলাকায় শিক্ষার হাল পাল্টে দিয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাঁর কাজে সন্তুষ্ট। এই সমাজসেবি শিক্ষা অনুরাগী দার্শনিক মানুষটির কৃতিত্বকে সন্মান জানাতে মহেশপুর গ্রাম পঞ্চায়েত বুধবার একটি ফেসিলিয়েশন সেরিমনির আয়োজন করে। সেখানে তাঁকে সম্মানিত করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফারাক্কা ব্লকের বিডিও কেসাঙ্গ ডেন্ডুপ ভুটিয়া, ফারাক্কা থানার আইসি উদয় শঙ্কর ঘোষ, পঞ্চায়েত প্রধান জাসমিনারা খাতুন প্রমুখ।
head_ads