কেন্দ্রের টালবাহানায় উপাচার্য নিয়ে জটিলতা বিশ্বভারতীতে

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: উপাচার্য কে? এই প্রশ্নে ফের বিতর্ক শান্তিনিকেতনের ক্যাম্পাস জুড়ে !

কেটে গিয়েছে দশ দশটি দিন। কে চালাবেন বিশ্বভারতী, সেই লিখিত নির্দেশটুকুও পাঠিয়ে উঠতে পারেনি কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক, যা নিয়ে এক অভূতপূর্ব জটিলতা দেখা দিয়েছে বিশ্বভারতীর দৈনন্দিন কাজকর্মে। আর এই জটিলতাকে পাথেয় করে বিতর্ক বাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বভারতীর অন্যতম বরিষ্ঠ অধিকর্তা বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষা আশা মুখার্জির একটি চিঠি। এই চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘কে বর্তমানে বিশ্বভারতীর উপাচার্য? কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের কোনও লিখিত নির্দেশ আছে কি?’’

প্রাক্তন উপাচার্য স্বপনকুমার দত্তের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি উপাচার্যের দায়িত্ব না ছাড়ায় বিতর্ক চরমে উঠেছিল বিশ্বভারতীর অভ্যন্তরে। অবশেষে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক বিশ্বভারতীর সংবিধান মেনে বরিষ্ঠ অধিকর্তা তথা শ্রীনিকেতনের ডিরেক্টর সবুজকলি সেনকে নির্দেশ দেয় উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণের। সেই মতো গত ৩রা ফেব্রুয়ারি উপাচার্যের দায়িত্ব নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বরিষ্ঠ অধিকর্তা। কিন্তু অধিকর্তা হিসাবে তাঁরও কার্যকালের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি। এর মাঝে সবুজকিল সেনকে দিল্লিতে ডেকে পাঠিয়ে মন্ত্রক তাঁকেই মৌখিকভাবে উপাচার্যের দায়িত্বভার চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে বিশ্বভারতী সূত্রে। সেই সঙ্গে স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগ সংক্রান্ত পুরানো প্যানেল বাতিল করে নতুন সার্চ কমিটি গঠনেরও লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে। সার্চ কমিটি গঠনের লিখিত নির্দেশ মিললেও উপাচার্য হিসাবে সবুজকলি সেন-ই যে দায়িত্ব সামলাবেন, তার কোনও লিখিত নির্দেশ এখনও এসে পৌঁছেছে কি না, তা বলতে পারছেন না কেউই। পরিণতিতে রবীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা দিয়েছে এক অভূতপূর্ব সংকট। কেন মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক দশ দিনেও একটি লিখিত নির্দেশ দিতে পারল না, সেই প্রশ্ন যেমন উঠে এসেছে, তেমনই তা নিয়ে অসন্তোষেরও বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে শান্তিকেতন ক্যাম্পাসে। এই অসন্তোষের পারদে আবার ঘি পড়েছে বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষা আশা মুখার্জির একটি চিঠিতে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রেই পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিশ্বভারতীর দৈনন্দিন কাজকর্মে ‘রাজ ভাষা’ অর্থাৎ হিন্দির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য যে কমিটি রয়েছে, তার আহ্বায়ক বিশ্বভারতীর সব ভবনের অধিকর্তাদের নিয়ে গত শনিবার একটি বৈঠক ডাকেন। বৈঠকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, সভায় ‘পৌরহিত্য’ করবেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য সবুজকলি সেন। সেই চিঠি পেয়েই বিশ্বভারতীর রেজিস্ট্রারকে পালটা চিঠি দেন বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষা আশা মুখার্জি।

সেই চিঠিতে এই অধ্যক্ষা প্রশ্ন তোলেন, ‘‘বর্তমানে উপাচার্য কে? এই মর্মে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক কী জানিয়েছে ?’’ তিনি বলেছেন, ‘‘আমি একটি চিঠি পাই, তাতে উপাচার্যের পৌরোহিত্যে বৈঠক হওয়ার বিষয়ে জানানো হয়। আমি এই নোটিসের প্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রারের কাছে জানতে চাই, বর্তমানে উপাচার্য কে? এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ মন্ত্রকের কোনও নির্দেশ এসেছে কি না। কিন্ত রেজিস্ট্রার এখনও কোনও উত্তর দেননি। তবে আমি চাই আইন মেনে সমস্ত কাজ হোক।’’ এদিকে বিদ্যাভবনের অধ্যক্ষা রেজিস্ট্রারকে এই চিঠি পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাতিল করে দেওয়া হয় হিন্দি ভাষার ব্যবহার সংক্রান্ত বৈঠকটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানাচ্ছে, আশা মুখার্জির তুলে দেওয়া প্রশ্নে তৈরি হওয়া বিতর্ক এড়াতেই বাতিল হয়েছে বৈঠকটি। তবে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থাকায় বাতিল করা হয়েছে হিন্দি ভাষা নিয়ে বৈঠকটি।

এই ঘটনা প্রসঙ্গে বিশ্বভারতীর সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ মহলের বক্তব্য, ‘‘আশা মুখার্জির তোলা এই প্রশ্ন তো সামান্য নমুনা মাত্র। কেন্দ্রীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের উদাসীনতায় এই ধরনের নানা প্রশাসনিক জটিলতায় জেরবার বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতীর পক্ষে যা কাম্য নয়। কোন অজ্ঞাত কারণে মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের এই ঢিলেমি, তাও তো স্পষ্ট নয়।’’

বিশ্বভারতীর রেজিস্ট্রার সৌগত চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘আমরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের উপর আস্থা রেখেছি। তারা নিশ্চয়ই নির্দেশ পাঠাবে। তবে বর্তমান উপাচার্যকে কাজ চালিয়ে যেতে বলায় তিনি কাজ চালাচ্ছেন। যিনি চিঠি দিয়েছেন, তাঁকে উত্তর দেওয়া হবে।’’ এ ব্যাপারে বিশ্বভারতী ইউনিভার্সিটি ফ্যাকাল্টি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুদীপ্ত ভট্টাচার্য ক্ষোভের সঙ্গেই জানিয়েছেন, ‘‘বিশ্বভারতীর উপাচার্য পদে যিনিই বসুন না কেন, তার প্রেক্ষিতে তো মন্ত্রকের একটি লিখিত নির্দেশ প্রয়োজন। না হলে যিনি ওই পদে বসবেন, তাঁর পক্ষে কাজ করাও তো সমস্যার বিষয়। আশা করি, মন্ত্রক আরও উদ্যোগী হবে। না হলে নানা জটিলতায় পড়তে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কাজকর্ম চালাতে গিয়ে।(সৌজন্যে-গণশক্তি)