রাজ্যের সমস্যা আড়াল করে মমতার গলায় ভারত জয়ের গল্প

0

টিডিএন বাংলা ডেস্ক: দিল্লি দখলের স্বপ্নজাল বুনে এরাজ্যের জরুরি সমস্যা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। শনিবার তৃণমূলের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে একঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভাষণ দিয়ে ‘ভারতজয়’-এর ডাক দিলেও মুখ্যমন্ত্রী একবারের জন্যও পশ্চিমবঙ্গবাসীর জ্বলন্ত সমস্যাগুলির উল্লেখ করেননি, সমাধানের কোনও বার্তাও দেননি। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের অনশনই হোক কিংবা কলেজে কলেজে তোলাবাজির ধাক্কায় ভর্তির সমস্যা, কৃষকের ফসলের দামের সমস্যাই হোক কিংবা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির সমস্যা, একটি বিষয়েও মুখ্যমন্ত্রী কোনও আশ্বাসবাণী দেননি।

ঠিক একমাস আগে গত ২১শে জুন মুখ্যমন্ত্রী নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে নিজেই স্বীকার করেছিলেন দলের নেতা কর্মীরা তোলাবাজি করছেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি মানে টাকা তোলা নয়। বিহ্যাভ প্রপারলি। টাকা তুলব ভাবলে হবে না।’ কলেজের ভর্তিতে টাকা তোলার অভিযোগে জেরবার হয়ে তিনি নিজেও কলেজ পরিদর্শনে নেমেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মেদিনীপুরে এসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটরাজ চালানোর কথাও বলে গিয়েছেন। কিন্তু এদিন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এগুলি বন্ধ করার কোনও বার্তা দেননি। রাজ্যে উন্নয়ন হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেছেন, গরিবদের চাল দিচ্ছি, বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিচ্ছি। কে বলেছে উন্নয়ন হয়নি? আমরা একদিকে লড়াই করব, অন্যদিকে উন্নয়ন চালিয়ে যাব। খেয়াল রাখবেন গরিবের যেন কোনও অসুবিধা না হয়, গরিবের কথা শুনবেন।

গরিবের কথা শোনা পরের কথা, মুখ্যমন্ত্রীর সভাস্থলের দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে টানা বারোদিন অনশন করে অসুস্থ হয়ে পড়া ছাত্রদের কথা শোনারও কেউ নেই। মুখ্যমন্ত্রী বি জে পি-র বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, ‘অমর্ত্য সেনকে তাড়িয়ে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করেছে আর এস এস।’ কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বাধিকার ভঙ্গ করে সেখানে দখলদারিত্ব কায়েম করা হবে না, এমন প্রতিশ্রুতি দেননি।

পশ্চিমবঙ্গের কৃষক খেতমজুররা আগামী ৯ই আগস্ট রাজ্যের প্রতিটি জেলায় জেল ভরো আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। মোদী সরকারের পাশপাশি এরাজ্যের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধেও ফসলের দাম না পাওয়া এবং ঋণমুক্তির দাবিতে আন্দোলন হবে বলে তাঁরা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের সমস্যাকে কোনও আমল না দিয়ে এদিন বলেছেন, ‘আমরা বাংলায় কৃষকদের আয় তো তিনগুণ বাড়িয়ে দিয়েছি।’ রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান না হওয়ায় কাজের খোঁজে দলে দলে মানুষ অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে। অথচ মমতা ব্যানার্জি এদিন বলেছেন, ‘আমরা বাংলায় বেকারী ৪০শতাংশ কমিয়ে দিয়েছি।’

এদিন মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করেছেন, ‘সি পি আই (এম) এবং কংগ্রেস এরাজ্যে বি জে পি-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে জগাই মাধাই গদাই একসঙ্গে লড়েছে।’ কিন্তু মাত্র একমাস আগে নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সভায় তিনিই নিজের দলের নেতাদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘দলের কেউ কেউ বি জে পি-র থেকে টাকা নিয়ে ওদের হয়ে প্রচার করেছে। তাদের চিহ্নিত করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘ভারতজয়’-এর ডাক দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বি জে পি এবং আর এস এস-কে গণতন্ত্রের ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের আমলেই তাদের সাংগঠনিক বৃদ্ধির তথ্য আর এস এস-এর পক্ষ থেকেই প্রকাশ করা হয়েছে। কংগ্রেস এবং সি পি আই (এম) দিল্লিতে বি জে পি বিরোধিতা করলেও এরাজ্যে বি জে পি-কে মদত দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এদিন তৃণমূলের মঞ্চে সসম্মানে বসানো হয়েছিল কংগ্রেস ভাঙিয়ে আনা ৫বিধায়ককে, সি পি আই (এম) থেকে বহিষ্কৃত দুই নেতাকে এবং বি জে পি-র এক থেকে আসা এক প্রাক্তন সাংসদকে। তারপরেও মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘আদর্শের কখনও মৃত্যু হয় না। দিল্লিতে একরকম হলে এরাজ্যে সেটা আলাদা হয় কী করে!’ খোদ তৃণমূল কংগ্রেস দলটাই যে জন্মের পরে পরেই বি জে পি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল সে বিষয়টাও তিনি এড়িয়ে গেছেন। বি জে পি-র বিরুদ্ধে তৃণমূলই লড়তে পারে বলে দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘ত্রিপুরায় সি পি এম পচে গেছিল বলে ওখানে বি জে পি জিততে পেরেছে।’ কিন্তু ত্রিপুরায় গোটা তৃণমূল দলটাকেই যে বি জে পি-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল তার উল্লেখ করেননি।

পঞ্চায়েত নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃণমূলের জয়ের অপরাধ ঢাকতে মুখ্যমন্ত্রী এদিন সিকিম এবং উত্তরাখণ্ডের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ‘ওখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জয়ী হয় না?’ বামফ্রন্ট পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী এদিন সাংবাদিকদের কাছে এর জবাব দিয়ে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতকে এখন সিকিম আর উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে তুলনা করতে হচ্ছে। এর চেয়ে অবনমন আর কী হতে পারে!’ লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৪২টা আসনের ৪২টাই জয়ের যে লক্ষ্য মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন সেই সম্পর্কে সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘যেভাবে পঞ্চায়েত নির্বাচন করেছেন সেভাবে নির্বাচন হলে ৪২টা কেন আরও বেশি আসনেও জিততে পারেন। কিন্তু মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে কী হবে সেই আতঙ্কেই মুখ্যমন্ত্রী ভুগছেন।(সৌজন্যে-গণশক্তি)