ভ্যালেন্টাইন ডে’র ‘লু’-এ যেন হারিয়ে না যায় তরুণ প্রজন্ম

0

“My love is like a red, red rose

That’s newly sprung in June

My love is like the melody

That’s sweetly played in tune.”

                                 —-Robert Burns

‘ভালোবাসা’ মানব মনের একটি পবিত্র অনুভূতি। ভালবাসা অবশ্যই একটি খুব কঠিন অনুভূতি/অভিব্যক্তি যা নিছক একটি শব্দে ব্যাখ্যা করা যায়না। ভালবাসা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ ও আকাঙ্খিত একটি আবেদন। ভালবাসা যা হৃদয়ের উষ্ণতা, বিশুদ্ধ নিঃস্বার্থতার মুহূর্ত, জাদুর মত। ভালোবাসার অর্থ গভীর দ্যোতনাময়। ভালোবাসার আভিধানিক অর্থ প্রেম, প্রণয়, অনুরাগ, আকর্ষণ ইত্যাদি। ঠিক কবে ভালবাসার উৎপত্তি , তা জানা সম্ভব না হলেও এতটুকু ভেবে নেওয়া যায় যে এর ইতিহাস বিবর্তনের চেয়েও আদিম ও পুরোনো। প্রাণী জগতের অন্যান্য সব প্রাণের মাঝে ভালবাসা পরিলক্ষিত হলেও মানুষ যেভাবে একে জীবন ও প্রেরণার অনুষঙ্গ করেছে তা অন্য কোন প্রাণী পারেনি। ভালবাসা নামের এই অজানা অদেখা আর চাপা কষ্টের সেই অব্যক্ত অনুভুতিকে মহিমান্বিত করতেই নাকি প্রতি বছরের একটি বিশেষ দিনকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’,  বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ভালবাসা দিবস।

পাশ্চাত্যের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ১৪ই ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে বিশ্ববাসী বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে ভালোবাসার দিন মানেই তো ভ্যালেন্টাইন ডে  অর্থাৎ ১৪ই ফেব্রুয়ারি । যার অন্য নাম ‘ফিস্ট অব সেন্ট ভ্যালেনটাইন’। আর এই “ভ্যালেন্টাইন ডে” প্রেমিক যুগলদের কাছে পরম কাঙ্ক্ষিত দিন। একটু খোঁজ নিলেই দেখা যাবে, এরও এক পুরোনো ইতিহাস আছে। এই ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ কি আর কেন? আর কবে থেকেই এই দিবসের শুরু ? কেই বা ছিলেন ভ্যালেন্টাইন? কবে থেকে শুরু হল দিনটির উদযাপন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে হলে ইতিহাসের পথে পেছনে হাঁটতে হবে কয়েক শতাব্দী। ভালবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে অনেক গল্পই প্রচলিত আছে।

প্রথম গল্পটি হল: ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন’স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগ এনে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টিহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিনটি ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন’স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন’ দিবস ঘোষণা করেন ।


আরেকটি গল্প হলো: সেন্ট বা সন্তো ভ্যালেন্টাইন নামের এক রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক ছিলেন৷ তিনি ধর্মযাজক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসকও৷ সে সময় রোমানদের সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় ক্লডিয়াস৷ বিশ্বজয়ী রোমানরা একের পর এক রাষ্ট্র জয় করে চলেছে৷ আর যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সেনাবাহিনী৷ কিন্তু, সমস্যা দাঁড়ায় তরুণীদের নিয়ে৷ তারা যে কিছুতেই তাদের পছন্দের পুরুষটিকে যুদ্ধে পাঠাতে চায় না৷ তখন সম্রাট ক্লডিয়াস মনে করলেন, পুরুষরা বিয়ে না করলেই বোধ হয় যুদ্ধে যেতে রাজি হবে৷ ভাবনাটার বাস্তবায়ন করলেন তিনি। বিয়ে নিষিদ্ধ করলেন সম্রাট৷ কিন্তু সেন্ট বা সন্তো ভ্যালেন্টাইন নিজে সকল প্রেমে আবদ্ধ তরুণ-তরুনীদের এক করার ব্যবস্থা করলেন, বিয়ে দিলেন সবাইকে। কিন্তু সেই প্রথা বেশি দিন তার ধারা বজায় রাখতে পারলো না৷ ধরা পড়লেন ভ্যালেন্টাইন৷ তাঁকে বন্দী করা হলো৷ কিন্তু, তখন নতুন করে আরেকটা সমস্যা দেখা দিল৷ অনেক ভক্তরাই ভ্যালেন্টাইন’কে দেখতে কারাগারে যেতেন৷ দিয়ে আসতেন তাদের অনুরাগের চিহ্ন হিসেবে অনেক ধরনের ফুলের শুভেচ্ছা৷ তাদের মধ্যে একটি অন্ধ মেয়েও ছিল৷ শোনা যায়, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন তার অন্ধত্ব দূর করেন৷ শুধু যে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তাই নয়, সঙ্গে মেয়েটির প্রেমে আবদ্ধ হয়ে ধর্মযাজকের আইন ভেঙে তাকে বিয়েও করেন তিনি৷ এমন একটা খবর রাজার কানে পৌঁছোতেই তিনি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেন৷ ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে প্রিয়াকে পাঠানো ভ্যালেন্টাইনের শেষ চিঠিতে লেখা ছিল- ‘লাভ ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন’৷ আর সেই দিনটিও ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি৷ ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ গেলাসিয়াস প্রথম এই দিনটিকে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেন৷


বর্তমানে পাশ্চাত্যের এই সংস্কৃতিটি বিশ্বের সবদেশেই সাদরে গ্রহণ করা হয়েছে। ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ প্রেমিক যুগলদের কাছে পরম কাঙ্ক্ষিত দিন। প্রথমদিকে ভালবাসা উদযাপনের দিনটি সীমাবদ্ধ ছিল ইংল্যান্ডের রাজকীয় পরিবার এবং অভিজাত সমাজে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই দিনটি সার্বজনীন উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শুরু হয় প্রিয়জনকে ফুল, গ্রিটিংস কার্ড, চকলেট, অলংকারসহ নানা উপহার দেওয়া ও একান্তে সময় কাটানোর রীতি। বিংশ শতাব্দীতে ভালবাসা দিবস পৌঁছে যায় মানুষের হৃদয়ে গভীরে, ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে এটি উদযাপিত হয়। চীনে ভালবাসা দিবসকে বলা হয় ‘কিক্সি ফেস্টিভাল’ যা উদযাপিত হয় চন্দ্রপঞ্জিকার সপ্তম মাসের সপ্তম দিনে, ফিনল্যান্ডে এর নাম ‘ইস্তাভানপাইভা’ যার অর্থ ‘বন্ধুত্বের দিন’, ল্যাটিন আমেরিকাতেও এই দিবস উদযাপিত হয় বন্ধুত্ব ও ভালবাসার দিন হিসেবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রীস, জাপান সহ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন নামে এই বিশেষ  দিনটিকে উদযাপন করা হয় মহা সমারোহে।

পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই গির্জা অভ্যন্তরেও মদ্যপানে তারা কসুর করে না। খৃস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইন দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক ভ্যালেইটাইন উৎসব নিষিদ্ধ করা হয়। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরনে ভারতসহ অন্যান্য সব দেশে বাড়ছে দিনটির কদর। ফি বছর ভ্যালেন্টাইন ডে’র লু প্রবাহিত হয় এখানেও। আর তার তাপদহের প্রভাব পড়ে ইয়াং জেনারেশনে। লক্ষ লক্ষ যুবক যুবতী বিভিন্ন পার্কে হোটেলে রেস্টুরেন্টে নানান অপকর্ম করার মাধ্যমে দিনটি পালন করে আসছে। ১৪ই ফেব্রুয়ারি মানেই তাদের কাছে ভ্যালেন্টাইন ডে। কিন্তু আমরা জানি না যে, পরাধীন ভারতে

১৯৩১ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি কি ঘটেছিল। স্বাধীনতা যোদ্ধা ভগত সিং, সুখদেব থাপার এবং রাজগুরু ছিলেন ভারতের তিনজন মহান পুত্র। ১৯৩১ সালের এই দিনটিতেই  লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁদের ফাঁসির সাজা শোনানো হয়েছিল। দেশের জন্য ‘শহীদ’ হয়েছিলেন তাঁরা। এই তিনজন প্রভাবশালী বিপ্লবী  মাতৃভূমির জন্য সোনালী জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ব্রিটিশ শাসনের শিকল থেকে আমরা মুক্ত তাঁদের ঐ অবদানের জন্যই। আর আমরা ওই দিন ভ্যালেন্টাইন্স ডে উদযাপন করি! দেশবাসীর কাছে এ চরম লজ্জার। এই ঘটনাটি আমরা কতজন ভারতীয় জানি? তাই, এই বিশেষ দিনে তাঁদের উৎসর্গের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে, আমাদের ভারতীয় হতে হবে। দিনটি পালনের উন্মাদনা দেখে মনে হয়, সারা বছরের ভালোবাসা জমিয়ে রাখা হয়েছিল এই বিশেষ দিনটির অপেক্ষায়। আর যেই দিনটি এল অমনি তাল তাল ভালোবাসা বিশেষ মানুষটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেলে দেওয়া হল। যেন ভালোবাসার সমুদ্রে তাকে ডুবিয়ে চুবিয়ে দেওয়া হয়। সত্যিই তো তাই! ভালোবাসার নামে নোংরামি, ধৃষ্টতা, ছলনা, চরম অবলীলায় চলতে থাকে, পরবর্তীতে যার ফল হয় ধ্বংসাত্মক।

সবশেষে এটা বলে শেষ করবো যে, ভালোবাসা কখনো কোনো দিনে আবদ্ধ নয়। বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত ভালোবাসা যেমন যায়, তেমনি সেটার প্রকাশও করা যায়। বছরের যে কোনো দিনই বলা যায়- ‘তোমায় ভালবাসি, আর তোমার সাথে থাকতে চাই।’ আর যে কোনো দিনই ভালোবাসার মানুষটিকে  উপহার দিয়ে হৃদয়ের গোপন অনুভূতির প্রকাশ ঘটানো যায়। আমরা মানুষকে ভালোবাসব প্রতিদিন, প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি কাজে। আর সর্বোপরি মানুষের ভালবাসার ব্যাপ্তি তার আশেপাশের অনেক প্রিয়জনকে ঘিরেই বিস্তৃত। তাই  ভালবাসা সার্বজনীন।

সুরাইয়া খাতুন

 

tdn_bangla_ads