কুড়ি বছরে প্রায় ৮০০ মুসলিম যুবককে সন্ত্রাসের সঙ্গে অভিযুক্ত করা হয়েছে! দাবি মানবাধিকার সংগঠনের

0

নিজস্ব সংবাদদাতা, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: গত কুড়ি বছরে দেশে প্রায় ৮০০ মুসলিম যুবককে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি মানবাধিকার সংগঠনগুলির।
সোমবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করে পার্সিকেউটেড প্রিজনার্স সলিডারিটি কমিটি পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে এই বলা হয়, দেশে আদিবাসী, দলিত, মুসলিমদের রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিন পিপিএস কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়,”মহম্মদ মাজিদ  সফি কোলকাতার রাজাবাজেরর বাসিন্দা । একজন ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী। মহারাষ্ট্রের এ্যান্টি টেরর স্কোয়াড ( এটিএস )  ২০০৬ সালের জুলাই মাসে মহারাষ্ট্র বিস্ফোরণের সঙ্গে জড়িত এই অভিযেগে তাকে গ্রেপ্তার করে । মুম্বই রেল ও তার সংলগ্ন এলাকা জুড়ে ঘটা এই ভয়ংকর বিস্ফোরণে ২০৯ জন নিহত হন এবং তাদের  পরিবারগুলি  ক্ষতির স্বীকার হন । এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গার থেকে ১৪ জন নিরপরাধ লোক যারা এ ঘটনার  শিকার তাদেরকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং তাদেরকে মিথ্যাভাবে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় । তাদের মধ্যে বাংলার মাজিদ নামের একজন তরুণ ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীকেউ গ্রেপ্তার করা হয় । তিনি একজন সাংসারিক ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ; তিনি  সৎ ভাবে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টায় ছোটোখাটো জুতোর ব্যাবসা করতেন । তিনি জীবনের কোনো সময় মুম্বই শহরে জাননি, না তাঁর কোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো , না তাঁর নামে পুলিশের খাতায় কোনো অপরাধমুলক অভিযোগ ছিলো। যাইহোক, যেমন হাজার হাজার নিরপরাধ অন্যান্য মুসলিমদেরকে মিথ্যা সন্ত্রাসের মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয় , ঠিক অনুরুপ ভাবে তাঁকেও মহারাষ্ট্র এটিএস এর হাতে গ্রেপ্তার হতে হয় । রাজাবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাকে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোনো একটি আদালতে হাজির করা হয় নি । তার সহব্যাবসায়ী এবং প্রতিবেশীকে ভয় দেখিয়ে বাধ্যকরা হয় তার বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার জন্য । ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই মামলার রায় ঘোষণা হয় ; পাঁচ জনের মৃত্যুদন্ড ও সাত জনকে যাবতজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয় । যাদেরকে যাবৎ জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয় মাজিদ তাদের মধ্যে একজন । এখন তিনি মহারাষ্ট্রের জেলে, যদি তাঁর প্রতি সুবিচার না করা হয় তাহলে বাকি জীবন তাকে জেলের মধ্যেই কাটাতে হবে । মাজিদের সঙ্গে তার পরিবারও এই  অবিচারের স্বীকার। তার আশি বছরের বৃদ্ধ মা মৃত্যুর কোলে দাঁড়িয়ে । তার স্ত্রীও গত তিন বছর ধরে রোগে ভুগছেন এবং যার ফলে তার দুটো কিডনিই নষ্ট হওয়ার উপক্রম । অর্থনৈতিক অনটনের করাণে তাঁর যথাযোগ্য চিকিৎসা করাও সম্ভবপর হচ্ছেনা। মাজিদকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় সে সময় তার কন্যা সন্তানের বয়স মাত্র ৩৮ দিন । পিতার অনুপস্হিতির মধ্য দিয়ে তার মেয়ের জাবনের ১১টি বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং তাকে শুনতে হচ্ছে যে তার বাবা একজন সন্ত্রাসী।”
ওই সংস্থার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়,”মাজিদের সঙ্গে যা ঘটেছে তা কোনো ব্যাতিক্রমি ঘটনা নয় বরং তা গত দুই দশক ধরে ভারতবর্ষের শত শত মুসলিম যুবকের সঙ্গে ঘটে চলা এক বাস্তব সত্য। গত কুড়ি বছরে প্রায় ৮০০ মুসলিম যুবককে মিথ্যাভাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় । তাদের মধ্যে অনেকেই ১০-১৫ বছর জেল খাটার পর নির্দোষ প্রমাণিত হন ও মুক্তি পান । এমনকি নানা সময় বিচারকরা পুলিশদেরকে সরাসরি অভিযুক্ত করেন তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজানোর জন্য। গুজরাট এবং মহারাষ্ট্র পুলিশ এবং রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও দায়ের হয়েছে মুসলিমদেরকে সন্ত্রাসী দেখিয়ে তাদেরকে মিথ্যাভাবে এনকাউন্টার ( বিনা বিচারে জেলের বাইরে সরাসরি গুলি করে হত্যা) করার জন্য। এইসব ব্যাক্তিদের মধ্যে বিজেপির  সভাপতি অমিত শাহ ও আছেন যার নামে অভিযোগ দায়ের হয় কিন্তু  সিবিআই এর তত্ত্বাবধানশীল বিচারক লোয়ার নাগপুরে রহস্যজনক মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে চলা অভিযোগ নাকচ হয়ে যায়।
যে আইন ধারায় মুসলিমদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় তা হলো ইউআইপিএ ধারা বা মহারাষ্ট্র ক্রাইম কন্ট্রোল এ্যাক্ট ( এমসিওসিএ)। এই ইউআইপিএ ধারায় যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় তাদেরকে কোনোরুপ বেল ছাড়াই বছরের পর বছর কয়েদ করে রাখা হয় যদিও বেল পাওয়াটা যেকোনো অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার। এমসিওসিএ এর অধীনে পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি কে আদালতে প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হয় যা ভারতবর্ষের বিচারবিভাগীয় কাঠামো তথা বিশ্বের যে কোনো সভ্য দেশের জন্য বেমানান। এটা দেখা গেছে যে এই আইনের বলে যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয় তাদের বেশিরভাগই মুসলিম, আদিবাসি,দলিত প্রভৃতি সমাজের একদম নিচুতলার অন্তর্ভুক্ত। অথবা এই আইনের বলে তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হয় যারা রাজ্যের বিভিন্ন নীতি,ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বা প্রতিবাদে সোচ্চার হয় এবং তাদেরকে মাওবাদীর তকমা দেওয়া হয় যেমনটা ঘটেছে ছত্রধর মাহাতো, রাজা সার্খেল ও প্রফেসর সাইবাবার ক্ষেত্রে। সুতরাং যদি কোনো প্রমাণ পত্র নাও পাওয়া যায় , এমনকি যদি অভিযোগগুলি কেবলমাত্র পুলিশের মাধ্যমে নিংড়ে নেওয়া স্বীকারোক্তির উপর ভিত্তি করেও করা হয়, তারপরও রাজ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থার নামে,’সমাজের সমষ্টিগত বিবেকের রায়ে’ এই নামে , সংবাদ মাধ্যমের বিচারধারার উপর ভিত্তি করে এই সমস্ত নিরাপরাধ মানুষদেরকে যাবতজীবন কারা দন্ডও দেওয়া যেতে পারে এমনকি মৃত্যুদন্ডও।
ওই মানবাধিকার সংস্থার কনভেনর পার্থ সারথি রায় বলেন,”আমরা নির্জাতিত বন্দি একতা কমিটির ( পার্সিকিউটেড প্রিজনার্স সলিডারিটি কমিটি) এর পক্ষ থেকে মহম্মদ মাজিদের প্রতি সুবিচারের দাবি জানাই। আমরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অনুরোধ করছি, বিশেষত মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাতে মোহাম্মদ মাজিদ ও তার পরিবার এই অবিচারের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন । আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি তিনি মোহম্মদ মাজিদকে মহারাষ্ট্র জেল থেকে পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করুন যাতে করে অন্তত পক্ষে তার  শোচনীয়ভাবে অসুস্থ স্ত্রী এবং তার মেয়ে তার সঙ্গে জেলে দেখা করার সুযোগ পায় । আমরা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আরো আবেদন করছি মোহম্মদ মাজিদের শর্তাধীন মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য যাতে করে সে তার অসুস্থ স্ত্রী ও মা এর সঙ্গে দেখা করতে পারে এবং তাদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে পারে । পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তার নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে বিশেষত সমাজের প্রান্তিক শ্রেণি যেমন আদিবাসি, দলিত ও মুসলিমদের প্রতি তারা যেন কেনো ভাবে রাষ্ট্রীয় দমনপিড়নের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করা। আমরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আরো আবেদন করছি পশ্চিমবঙ্গে ইউপিএ এর মতো এইধরনের ড্রাকোনিয়ান আইনে কাউকে যাতে গ্রেপ্তার না করা হয় তা নিশ্চিত করতে এবং যাদেরকে ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।”
এদিন পার্থ বাবু টিডিএন বাংলাকে জানান,”নাগরিক সমাজ,বিভিন্ন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সংগঠনের সদস্য ও  সংগঠনের নেতৃত্বদের নিয়ে একটি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে মূখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হবে । আমরা ঐকান্তিক ভাবে আসা রাখবো যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কলকাতার মহম্মাদ মাজিদ, তার পরিবার এবং সেই সমস্ত ব্যাক্তিদেরকে যাদেরকে মিথ্যাভাবে অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য  জরুরি পদক্ষেপ নেবে।”
এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মাজিদের স্ত্রী ফারজানা। তিনি বলেন,”আমাদের বিয়ে হয় ২০০৫ সালে। এক বছর সুখেই ছিলাম। তারপর এক মেয়ে হয়। একদিন পুলিশ এসে আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। কেন নিয়ে যায় বলেনি। বছরের পর বছর সেই দূর মহারাষ্ট্রে যেতে হয়। আমার স্বামী নির্দোষ। কোনও দিন মুম্বাই যাননি। মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেলে রাখা হয়েছে। আমি অনুরোধ করবো,স্বামীকে কলকাতার জেলে আনার জন্য। যাতে একটু দেখতে পায়। আমার দুটি কিডনি নষ্ট,চোখের সমস্যা। সেই সময় কেউ আমাকে সাহায্য করেনি। সকলে সন্ত্রাসী বলে সন্দেহ করেছে। সন্ত্রাসীর স্ত্রী বলা হয়েছে।” সাংবাদিক সম্মেলন শেষে  টিডিএন বাংলাকে জীবনের দুঃখের কথা বলছিলেন তিনি। সেই সময় কাঁদতে লাগেন।
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের রাজ্য সহ সভাপতি রঞ্জিত সুর বলেন,”পশ্চিমবঙ্গের জেলেও বহু মুসলিম আছে। ৬০ থেকে ৭০ জন মুসলিমকে সন্ত্রাসী বলে আটকে রাখা হয়েছে।আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করবো,শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে।পশ্চিমবঙ্গে মুড়ি মুড়কির মতো রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা দিচ্ছে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন। আজ গোটা বিচার ব্যবস্থা হুমকির মধ্যে।”
এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে মুম্বাই থেকে এসেছিলেন আব্দুল ওয়াহিদ। তিনি মুম্বাই কান্ডে নয় বছর জেল খাটার পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন। জেল থেকে বেরিয়ে একটি বই লিখেছেন। সেই বইটি কলকাতার মুসলিম ইনিস্টিটিউট হলে এদিন সন্ধ্যায় প্রকাশিত হয়। ওই গ্রন্থে মুম্বাই কাণ্ডের পর কিভাবে মুসলিমদের হয়রানি করা হয়েছে ও মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে তা দেখানো হয়েছে বলে লেখকের দাবি। আব্দুল ওয়াহিদ বলছেন,”আমাদের দাবি এই কেসের প্রকৃত দোষীরা শাস্তি পাক,মাজিদদের সাথে ন্যায় বিচার করা হোক।”

head_ads