গোষ্ঠী সংঘর্ষে ভেঙে পড়েছে অর্থব্যবস্থা, একটু একটু করে স্বাভাবিকের পথে ধুলাগড়

টিডিএন বাংলা, নিউজ ডেস্ক : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী হাওড়ায় ৩৫০টি সংঘবদ্ধ কাজের ইউনিট রয়েছে , যার ১০০ টিই ধুলাগড়ে রয়েছে বলে এলাকাবাসীর অনুমান।
সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের পর এই এলাকায় খুদ্র-মাঝারি শিল্পে উৎপাদন বন্ধ। হাওড়ার প্রাণকেন্দ্র ধুলাগড়ের পোলেপাড়া ও মুন্সি পাড়া এর পার্শ্ববর্তী কর্মক্ষেত্র গুলি হিন্দু-মুসলিম প্রভাবিত পরিচালিতও ।
১৩ ও ১৪ ডিএই ডসেম্বর সংঘর্ষের পর অনেক পরিবার পালিয়ে যায়। এই সপ্তাহে কিছু হিন্দু পরিবার নিজের ঘরে ফিরে এসেছে, অধিকাংশ মুসলিম এলাকাগুলি এখনও নির্জন। জেলা কর্মকর্তারা জানান এই দুই দিনে ১০০ টিরও বেশি ঘর ও দোকানপাট আক্রান্ত হয়েছে।

রাজ্য সরকার পরিসংখ্যানে হাওড়ায় ৩৫০টি ইউনিটের মধ্যে কেবল ধুলাগড়েই রয়েছে ১০০টি, যার কর্মী সংখ্যা ৯ হাজারেরও বেশি। প্রতিটি ইউনিটে কেবল যন্ত্রাংশে গড় বিনিয়োগ প্রায় ৫ লক্ষ টাকা।

সেখানকার এক প্রশাসনিক কর্তা বলেন, “অনেক হিন্দু বাড়িঘর ও দোকান আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু মুসলিম মালিকানাধীন কারখানায় সংঘটিত আর্থিক ক্ষতি অনেকগুন বেশী।”
হাওড়া পুলিশের পল্লী সুপারিনটেনডেন্ট, সুমিত কুমার বলেন, “১৪ ডিসেম্বর সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই ৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ও শান্তি বজায় আছে। অপরাধীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত জারি আছে।”
কলকাতা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ধুলাগড়ের এমব্রডারী ও পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র(MSME)।
ইতিপূর্বে এই এলাকায় ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের আঘাতে ধুঁকতে থাকা অসংখ্য ইউনিট এই সহিংসতায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় ইউনিট মালিক ও কর্মকর্তাদের মতে,কারখানার সরঞ্জাম ধ্বংসের ফলে ইউনিট প্রতি ৫ লক্ষ টাকা ধ্বংস হয়ে গেছে ও সমস্ত কাঁচা মাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কর্মরত শ্রমিকরা সব কর্মহীন।ধুলাগড়ের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম বিপর্যস্ত।
রাজ্য সরকার পরিসংখ্যানে হাওড়ায় ৩৫০টি ইউনিটের মধ্যে কেবল ধুলাগড়েই রয়েছে ১০০টি, যার কর্মী সংখ্যা ৯ হাজারেরও বেশি। প্রতিটি ইউনিটে কেবল যন্ত্রাংশে গড় বিনিয়োগ প্রায় ৫ লক্ষ টাকা।
জাকির সরদার বলেন, “আমি গত কয়েকদিনে অন্তত ১০ টি কারখানা পুড়তে দেখেছি, যার বেশিরভাগ ইউনিট মুসলমানদের মালিকানাধীন। এই সংঘর্ষের পরিকল্পনা যেখানে করা হয়েছে সেখানে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সম সংখ্যায় বসবাস।”
এই জাকিরের কারখানায় কাজ করত ৪০ জন কর্মী, কারখানার সঙ্গে তার বাড়ির কিছু অংশও ধ্বংস করা হয়। শেখ আলাউদ্দিনের অভিযোগ “১৪ ডিসেম্বর হিন্দু পরিবারের ঘরবাড়ি বেষ্টিত আমাদের কারখানাকেও টার্গেট করা হয়। এবছর ইউনিট প্রতি ১৮ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ থেকে নতুন যন্ত্রপাতি পেয়েছি, পরের বছর থেকে রপ্তানি শুরু প্রত্যাশা ছিল। এখন আমাদের যা ক্ষতি তা প্রায় কোটিতে পৌঁছেছে। আমাদের ব্যবসা গুটিয়ে গেছে।”
আরেকটি কারখানা মালিক আলিমা বেগম বলেন, “হঠাৎ নোট বাতিলের ফলে এমনিতেই আমরা নগদ মজুরি দিতে পারছি না জেনে অনেক শ্রমিক নিজেই চলে গেছে। আর পোশাক খাতের কাজ সর্বাধিক নগদেই সম্পন্ন হয়,বিশেষ করে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। নোটের আকালে তারাও আমাদের থেকে কেনা বন্ধ করে দিয়েছে, তার ওপর এই সহিংসতা।”
১৩ ডিসেম্বর, মিলাদ-উন-নবী উপলক্ষে একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা আক্রান্ত হয়েছিল। এবিষয়ে ধুলাগড়ের উভয় সম্প্রদায়ের অনেক মানুষেরা একমত। মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিযোগ যে তাদের মিছিল থামিয়ে মুসলিম যুবকদের হিন্দু দেবতাদের নাম ভজন করতে বাধ্য করা হয় ও তারপর আক্রমণ করা হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাল্টা দাবি বাইরের লোকেরা আগে আক্রমণ করে ও মুসলিম যুবকেরাও নাকি অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিল।
সহিংসতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গের শুরু দেওয়ান ঘাটের অন্নপূর্ণা ক্লাবের কাছে। মিছিলে যোগদানকারী এক প্রবীণ শেখ নুরুল আলম বলেন, “আমাদের মিছিলে লাউডস্পিকার ছিল, এ নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ আপত্তি জানান। আমরা লাউডস্পিকার বন্ধ করে দিই। কিন্তু কিছু তরুণক দাবি করেন যে আমাদের হিন্দু দেবতাদের নাম ভজন করতে হবে। আমরা প্রত্যাখ্যান করতেই তারা পাথর নিক্ষেপ শুরু করে।”
এবিষয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভিন্ন অভিমত।ধুলাগড়ের বাঁশতলা স্পট থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে বাড়ি রবিন দাসের দাবি, “মিছিলে অনেক যুবক তরবারি ও বোমা বহন করছিল এবং একটি ককটেল আমার বাড়িতেও নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমরা ঘর থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম।”
রবিন আরো বলেন, – এবং বিভিন্ন স্থানীয়রাও একমত – যে “তার বাড়ি প্রথম পোড়ানো হয়। এছাড়া ভাই কামাল ও জামাল উদ্দিন শেখের মালিকানাধীন এমব্রয়ডারী কারখানা এই হামলায় পুড়ানো হয়।কে জানে হামলাকারীরা হিন্দু না মুসলিম।… তারা শুধু রক্ত বের করার জন্য।”
একজন স্থানীয় কর্মী উজ্জ্বল দাস বলেন, “সহিংসতার শুরু এলাহাবাদ ব্যাংক শাখার বাইরে থেকে,যেখানে মানুষ নগদ টাকা তুলতে দীর্ঘ লাইনে প্রতীক্ষমান। খোভের আগুন জ্বলে ওঠে।”
১৪ ডিসেম্বর সহিংসতা মুসলিম অধ্যুষিত হায়শার পাড়া ও মুন্সিপাড়া এবং হিন্দু অধ্যুষিত ব্যানার্জিপাড়া ও পল্লীপাড়া এলাকায়ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিজেপির অভিযোগ যে পুরো ঘটনায় তৃণমূল দায়ী। গত সপ্তাহে বিজেপি সাংসদ রুপা গাঙ্গুলি অভিযোগ করেন, তৃণমূল অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পিছনে ছিল এবং তৃণমূলের ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ রাজনীতি এই সহিংসতার জন্য দায়ী। তৃণমূল অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

(Source: Indian Express)

মন্তব্য করুন -