পঞ্চম শ্রেণী পাশ করা দরিদ্র করিমুল হক পেয়েছেন  দেশের সেরা পুরস্কার পদ্মশ্রী-টিডিএন বাংলাকে বললেন অনেক কথা

মোটর বাইক এম্বুলেন্স করে হাজার হাজার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ইতিমধ্যেই দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি। জলপাইগুড়ির চা বাগানের ফোর পাশ শ্রমিক কারীমূল হকের পদ্মশ্রী জয় বাঙালির মধ্যে নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে। কিন্তু কিভাবে ভারত সেরা হলেন তিনি? টিডিএন বাংলাকে সব জানালেন কারীমূল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন – সাংবাদিক মোকতার হোসেন মন্ডল

টিডিএন বাংলা: ভারত সরকার আপনাকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেবার পর কেমন লাগছে?

করিমুল: পুরস্কার বড়ো বিষয় নয়,মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। আমি কোনও দিন ভাবিনি পদ্মশ্রী পাবো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আমাকে পুরস্কার দিচ্ছে। প্রতিদিন সম্বর্ধনা,উপহার পাচ্ছি। এইসব উপহার মানুষের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছি।

টিডিএন বাংলা: পদ্মশ্রী পাবার পর কোনও নতুন অনুভূতি তৈরি হয়নি?

করিমুল: সেতো হবেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিরাট কোহলি কত সব ব্যাক্তি সেদিন উপস্থিত ছিলেন। আমি আর প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলাম বাঙালি।

এখন দায়িত্ত্বটা আরও বেড়ে গেলো।

টিডিএন বাংলা: আপনার পড়াশোনা?

করিমুল: জলপাইগুড়ি জেলার রাজাডাঙা অঞ্চলের ধুলাবাড়ি গ্রামে আমার বাড়ি। পাশের স্কুলে পড়েছি। বেশিদূর পড়িনি। ফাইভ সিক্স। আর মানুষের কাজ করতে পড়াশোনা দরকার হয়নি। আঠারো বছর ধরে মোটর বাইক এম্বুলেন্স করে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। চা বাগানের যেকোন মানুষ বিপদে পড়লেই পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করি।

টিডিএন বাংলা: আপনি ফোর পাশ করে কিভাবে মোটর বাইক এম্বুলেন্স তৈরি করলেন? আজকের একুশ শতকে এই এম্বুলেন্স কতটা উপকারে লাগছে মানুষের?

করিমুল: চা বাগানে কাজ শুরু করি, মাত্র ৫০০ টাকা বেতনে। চরম দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে চলছিল দিন। হঠাৎই একদিন আমার ‘মা’  চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। বিশেষ করে গাড়ির অভাবে হসপিটালে নিয়ে যেতে পারিনি। সেদিন খুব দুঃখ পেয়েছি। সিদ্ধান্ত নিলাম মোটর বাইক এম্বুলেন্স করার। দরিদ্র্য মানুষ চিকিৎসার অভাবে, গাড়ির অভাবে যেন আর কেউ মারা না যায়, এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে মোটর বাইকের সামনে পিছনে সাইনবোর্ড লাগিয়ে বেরিয়ে পড়ি সাহায্যের উদ্দেশে।লোন করে সেদিন বাইক কিনেছিলাম।

টিডিএন বাংলা: মানুষের সেদিন কী প্রতিক্রিয়া ছিল?

করিমুল: অনেকে সেদিন হেসেছে। অনেকে পাগোল বলেছে। কেউ বলেছে মোটর বাইকের এড করছে, এভাবে কি সাহায্য করা যায় ইত্যাদি। আমি কিছু মনে করিনি। একদিন একজনকে সাপে কেটেছে। আমি দ্রুত তাকে মোটর বাইকের পিছনে বেঁধে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। তির্সা নদী পেরিয়ে যেতে হয়। ব্যাপক জ্যাম থাকে রাস্তা। প্রায় পঞ্চাশ মিনিট হাসপাতালে যেতে। রাস্তায় যেতে গিয়ে দেখি একটি এম্বুলেন্স আটকে আছে ভিড়ে। আমি ধীরে ধীরে ভিড় কাটিয়ে চলে গেলাম হাসপাতালে। পরে শুনেছি সাপে কাটা ওই এম্বুলেন্সের রোগীটি মারা গেছে।

সেদিন সকলে বুঝেছে, না মোটর বাইক এম্বুলেন্সের মাধ্যমে সুবিধা বেশি। প্রত্যন্ত এলাকার মধ্যেও মানুষের সাহায্য করা যায়।

টিডিএন বাংলা: এখন মানুষ কী বলছেন?

করিমুল: এখনতো সকলেই আমার পাশে।এম্বুলেন্স দাদা,মোটর ম্যান বলে ডাকে। কত সম্মান, কত উপহার পাচ্ছি। রোজ সকলে ডাকছে।

টিডিএন বাংলা: পড়াশোনা করেননি বলে কোনও সমস্যা হয়না কাজে?

করিমুল: কম পড়াশুনা বলে আমি কোনো দিন কর্মপথে বাধা পাইনি। প্রথমের দিকে মানুষে অনেক রকম মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এখন সবাই কাজটি সম্পর্কে জেনেছে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ব বিদ্যালয়ের পড়া শুনা বড় কথা নয়, মানুষের পাশে থাকা, মানুষের হয়ে কাজ করাটাই বড় কথা। যে শিক্ষা মানুষের জন্য কিছু করতে শেখায় না সে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের লাভ কী? দেশ চায় দেশের জন্য করুক মানুষ।

টিডিএন বাংলা: এম্বুলেন্স বাইকে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী করেন?

করিমুল: মূলত মোটর এম্বুলেন্সে করে অসহায় মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছিয়ে দিই। এছাড়াও শহর থেকে পুরোনো বস্ত্র নিয়ে এসে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মধ্যে দান করি, বিভিন্ন মানুষের সাহায্যে প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা এবং চা বাগানের কর্মীদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করে থাকি। এভাবে দীর্ঘ ১৮ বছর মানুষের সেবায় নিয়োজিত আছি।

টিডিএন বাংলা: এই সফলতার পিছনে কার অবদান সব চেয়ে বেশি?

করিমুল: আমার এই সফলতার পিছনে কোনো মানুষের হাত নেই, মহান আল্লাপাক রহম বর্ষণ করেছিলেন বলেই আমি এই কাজ করছি । এবং মুসলিম সমাজের উদেশ্যে বলি- মানুষের মতো মানুষ হয়ে কাজ করতে হবে, কোনো জাতি বিভেদ না রেখে সহানুভূতির মাধ্যমে চলতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে, পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে, আমাদের নবী (স) যেগুলো করে গেছেন সেগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে, নির্দেশাবলী মেনে চলতে হবে।

টিডিএন বাংলা: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

করিমুল: আমরা বাড়ির চার জন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত, দুইছেলেও মোটর এম্বুলেন্স চালায়। আমি আশা করি, আমি মারা যাবার পর ছেলেমেয়ে এই কাজটি করে যাবে ভবিষ্যতে।

তাছাড়া সমাজসেবার কাজ করতে গিয়ে এখন অনেক সাহায্য পাই, পুরুস্কার হিসেবে টাকা পাই, সেই টাকায় আমি বাড়িতেই  হসপিটাল তৈরির কাজ করছি। বাকি জীবন মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।