শিক্ষকের অভাবে মাদ্রাসায় পঠনপাঠন শিকেয়

রুসমিনা খাতুন, টিডিএন বাংলা, হাওড়া : রাজ্যের সরকারি মাদ্রাসা গুলিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। আর তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে পড়ুয়াদের। হাওড়া জেলার দক্ষিণ কোলড়া ও কুশাডাঙ্গায় দুই সরকারি মাদ্রাসা সরেজমিনে পড়ুয়াদের সমস্যার ছবিই ধরা পড়েছে। এখানকার স্বনামধন্য দুটি মাদ্রাসা হলো, দক্ষিণ কোলড়ার মাজাহিরুল উলুম ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা এবং কুশাডাঙ্গার আনওয়ারুল উলুম সিদ্দিকীয়া সিনিয়র মাদ্রাসা। এই দুই মাদ্রাসায় শিক্ষকের অভাবে সঙ্কটে পড়ুয়ারা। দিনের পর দিন পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে বলে ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ।

 

সমস্যার কথা স্বীকার করে রফিকুল ইসলাম নামে জনৈক মাদ্রাসা শিক্ষক জানান, দীর্ঘদিন ধরে কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয়নি ফলে পড়াশোনার বিঘ্ন ঘটছে একথা ঠিক। তবে পাস ফেল ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার কারণে ছাত্রছাত্রীরা  লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে উঠছে এবং এর পাশাপাশি বহু অভিভাবকের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলে তিনি জানান।
সইদুল ইসলাম নামে আর একজন আরবি শিক্ষক বলেন, সুন্দর পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে ছাত্র অনুপাতে শিক্ষকের একটা বেপার থাকে সেই হিসাবে এক একটা ক্লাসে প্রায় ৮০/৯০ ছেলেমেয়ে রয়েছে সেখানে একটি শিক্ষকের দ্বারা ক্লাস সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ছে। ফলে যারা পড়াশোনায় ততটা ভালো নয় তারা আরো খারাপ হচ্ছে। পরবর্তীতে দেখা যাচ্ছে উপযুক্ত পাঠদানের অভাবে সেই সমস্ত ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পৌঁছে কোনো কিছুই শিখতে পারছেনা। এভাবেই পড়াশোনার পরিবেশটা আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 

কুশাডাঙ্গা নিবাসী শেখ মেহবুব হোসেন নামে এক অভিভাবকের অভিযোগ, সিনিয়র মাদ্রাসায় বাংলা, ইংরাজি ছাড়াও আরবির যেকটি বিষয় রয়েছে সেগুলি খুবই কঠিন ফলে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাবে ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে নেওয়া অনেকটা চাপের। দিনের পর দিন এই অবস্থা ধারাবাহিক ভাবে চলার ফলে দেখাযাচ্ছে দুর্বল ছেলেমেয়ে গুলি ওপরের ক্লাসে উঠেও কিছুই জানছেনা। শুধুই ডিগ্রি অর্জন হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সরকার হোস্টেল করার জন্য কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে অথচ শিক্ষকের অভাবের বিষয়টি নিয়ে কারো নজর নেই। কাজেই হোস্টেল না করে আগে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারের কড়া নজর দেওয়া উচিত।
ধূলাগড়ের মহসিন আলী লস্কর নামে আর একজন অভিভাবক জানান, বর্তমানে মাদ্রাসা গুলিতে যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সব ছাত্রছাত্রী খারাপ নয়। যোগ্য হয়ে ওঠার মতো সেরকম প্রশিক্ষণ তারা পাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, এমন শিক্ষক একজনও দেখলামনা যিনি সম্পূর্ণ ১০০ নং পাওয়ার জন্যই অংক করান। এর পাশাপাশি পিতামাতার সচেতনতা অভাবও রয়েছে।

 

দশম শ্রেণীর এক ছাত্রী জাসমিনা খাতুনের মতে, ‘আমাদের ক্লাসে ইংরাজীর একজনই শিক্ষিকা আছেন তিনি টেক্সট, কবিতা দুটো পড়ানোর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে ইংরেজি গ্রামারও করান। ফলে আমরা ইংরেজি গ্রামার টা ভালোকরে শিখতেই পারিনি। অংকের শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে অনেকদিন থেকেই। পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি একটা শিক্ষকের ওপরই নির্ভর করতে হয় আমাদের। এই জন্যেই আমরা ভালো ভাবে শিখতে পারছিনা।
মাজাহিরুলের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী পারভীনা খাতুনের অভিযোগ, ‘একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে বাংলা ইংরেজি ছাড়া আমাদের সবকটি সাবজেক্টই আরবি। আর সেই সব সাবজেক্টের বেশিরভাগই শিক্ষক নেই। তাই আমাদের পড়তে এবং পড়া বুঝতে খুবই অসুবিধা হয়।’
এই সমস্ত অভিযোগকে সামনে রেখে মাদ্রাসা শিক্ষার পরিবেশের ওপর দক্ষিণ কোলড়া মাজাহিরুল উলুম সিনিয়র মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মৌলানা তাজমহাম্মাদ সাহেব জানান, প্রথমত দীর্ঘদিন প্রায় সাত বছর কোনো শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছেনা, একটা ইস্কুলে যদি ১০ টা উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব থাকে সেখানে পড়াশোনার ওপর পূর্ণ শিক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে এর উন্নতি হওয়া মুশকিল। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের বেশির ভাগই সচেতনতার  অভাব রয়েছে। বিনামূল্যে পড়ার জন্য সরকার অনেক অনুদান দিলেও বেশির ভাগই অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে পড়ুয়াকে পড়ার বয়সেই  অভিভাবকেরা কাজে লাগিয়ে দিচ্ছেন, ফলে সেখানে একটা শিক্ষার ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী থেকে অভিভাবক পর্যন্ত সকলেই চাইছেন অবিলম্বে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ করা হোক এবং পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করা হোক।