মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা:

বছরের পরে আসিলরে ফিরে
খোদার মহান দান,
নাপাক বিশ্ব পাক করে দিতে,
এল মাহে রমজান।

বছর ঘুরে পবিত্র রমজান মাস আবার আমাদের কাছে উপস্থিত। এই মাসের গুরুত্ব ও মাহাত্ম সম্পর্কে এতো বেশি বর্ণনা এসেছে যে কোনো একটি আলোচনায় তার সবটাই উপস্থাপন করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। এই মাস আত্ম সংশোধনের মাস ,এ মাস পরিশুদ্ধির মাস, এ মাস কৃচ্ছ সাধনার মাস, এ মাস ত্যাগ ও কুরবানীর মাস, এ মাস পরম প্রভু কে সন্তুষ্ট করার মাস, এ মাস ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার মাস, এ মাস সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মাস, এ মাস মানবতার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার মাস, এ মাস তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তোলার মাস, এ মাস দুনিয়ার জীবন আর পরকালীন জীবনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণের মাস, এ মাস রহমত ,বরকত আর মাগফিরাতের মাস।

প্রায় সব ধর্মেই উপবাস ব্রত পালনের বিধান আছে। পবিত্র কুরআনে উপবাস এর বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “হে বিশ্বাসী গণ তোমাদের জন্যে উপবাসের বিধান অবতীর্ন করা হলো যেমন ভাবে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপর এই বিধান অবতীর্ণ করা হয়েছিল।আশা করা যায় যে তোমরা আল্লাহর ভয় ধারণ করার গুণাবলী অর্জন করতে পারবে।”

পবিত্র কুরআন এ রোজার উদ্যেশ্য সম্পর্কে যে মূল শব্দটি বলা হয়েছে সেটি হল ‘তাকওয়া’। ‘তাকওয়া’ কথাটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক একটি শব্দ। এর শব্দ গত অর্থ হলো ভয় করা। এখানে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর ভয় বুঝাতে তাকওয়া কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত মানব জীবনের সার্বিক কল্যাণ ও পরিশুদ্ধির ভীত হোল তাকওয়া। অন্য ভাবে বলা যায় এটা একটা self introspection বা আত্ম চেতন। মানুষ বিবেক সম্পন্ন জীব। যে মানুষ যত বেশি তার বিবেক বোধ দ্বারা পরিচালিত হয় সেই মানুষ তত বেশী চরিত্রবান বলে বিবেচিত হয়। মানুষ যখন বিবেক বোধকে বিসর্জন দিয়ে তার রিপুর তাড়নায় পরিচালিত হয় ততই তার মধ্যে জাগ্রত হয় পাশবিক প্রবৃত্তি। বিবেক দ্বারা পরিচালিত মানুষ মনুষ্যত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। আর প্রবৃত্বি দ্বারা পরিচালিত মানুষ পশুত্বের কাছাকাছি বিরাজ করে। রমজানের কৃচ্ছ সাধনা পাশবিক প্রবৃত্তির বিনাশ ও বিবেকবোধ সম্পন্ন চেতনায় উত্তরণের নাম।

মানুষের মধ্যে দুটি সত্ত্বা বিরাজ করে।একটি জৈবিক সত্ত্বা অপরটি আধ্যাত্মিক সত্ত্বা বা নৈতিক চেতনার সত্ত্বা। এই দুই সত্ত্বার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার মধ্যেই ঘটে মনুষ্যত্বের বিকাশ। পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করা ও নৈতিক চেতনার বিকাশ সাধন করাই রোজার লক্ষ্য।জৈবিক সত্ত্বার চাহিদা পূরণ করে খাদ্য ও পানীয়। শরীর অসুস্থ হয়ে গেলে ঔষধ সরবরাহ করে তাকে সুস্থ করতে হয়। নৈতিক সত্ত্বা বা আধ্যাত্মিক সত্ত্বার চাহিদা পূরণ করে ঐশ্বরিক জ্ঞান, সুচিন্তা, সৎ সঙ্গ, ও নিজেকে দিয়ে অন্যের বেদনা উপলব্ধি করার মত কিছু অভ্যাস। রোজা যুগপৎ ভাবে এ দুটি কাজই করে।

দীর্ঘ এক মাস সুনিয়ন্ত্রিত, সুপরিকল্পিত বাঁধা ধরা জীবন অতিবাহিত করার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে একটি সুন্দর ছন্দে মুড়ে ফেলাই রোজার লক্ষ্য। এই শৃঙ্খলা মানুষের জীবনে শুধু শারীরিক সুস্থতা নিয়ে আসেনা এর মাধ্যমে মানব সমাজে আসে এক সার্বিক পরিশুদ্ধির বার্তা। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সর্বত্র আসে এক পরিশুদ্ধির সুযোগ।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকট দুর্নীতি, স্বজন পোষণ, স্বার্থপরতা, হিংসা ঘৃণা। একথা দিনের আলোর মত স্পষ্ট যে মানুষ যদি নিজে থেকে সৎ না হয় তাহলে পৃথিবীর কোন পুলিশ, গোয়েন্দা, সিবিআই দিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।রোজা মানুষের অন্তরে একটা করে পুলিশ বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। সেই পুলিশ তাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করাতে থাকে তার সততা নৈতিকতা ও আদর্শের কথা। তাকে পরিচালিত করে সততার পথে। একজন রোজাদার লোক চক্ষুর অন্তরালেও এক দানা খাদ্য বা পানিয় গ্রহণ করেনা। কেননা সে জানে পৃথিবীতে কেউ তাকে না দেখলেও মহান সৃষ্টি কর্তার নজর কে তিনি এক মুহুর্তও ফাঁকি দিতে পারবেনা। সি সি টিভির ক্যামেরার দৃষ্টি কেও আড়াল করা যায় কিন্তু আল্লার চোখ কে ফাঁকি দেওয়া যাবেনা। রোজার এই শিক্ষা যদি বাস্তবায়িত হত তাহলে দুর্নীতি এমনিতেই বিদায় নিত। হাজার হাজার দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিশন গঠন করে যা হয়না রোজার দ্বারাই সে কাজ হতে পারত।

বর্তমান বিশ্বে একদিকে যেমন খাদ্য অপচয় হয় তেমনি অপর দিকে কোটি কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে অভুক্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করে। অভুক্ত থাকার যে কী যন্ত্রনা তা রোজাদার উপলব্ধি করতে পারে। তাই রোজার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। এটা একটা বড় সামাজিক পরিশুদ্ধি। অন্যের বেদনা উপলব্ধি করতে পারে বলে রোজাদার দরিদ্র মানুষের প্রতি হয় সহানুভূতিশীল।

রোজা ভোগ বিলাস থেকে মুখ ফিরিয়ে ত্যাগ ও সংযমের শিক্ষা দেয়।ভোগ বিলাস মানুষের চাহিদাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। আরও চাই , আরও চাই বলে সে চিৎকার করে।পৃথিবীর সব সম্পদ তার পায়ের কাছে নিয়ে হাজির করলেও তার চাহিদা শেষ হয়না। অপর দিকে সংযমী মানুষ অল্পে সন্তুষ্ট থাকে। পৃথিবীতে সে নিজেকে একজন মুসাফির মনে করে।কম সামান মুসাফিরের কাম্য। এই ভাবেই রোজা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ বন্ধ করে দেয়।

তাই বলতেই হয় রোজা নিছক একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানিকতা নয়, এটা একটি সামাজিক পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়াও বটে।কিন্তু আজকের মুসলিম সমাজ রোজাকে নিছক একটি ধর্মীয় বিধি বা উপাসনা বলেই মনে করে। তাই তাদের জীবনে এর কোন বাস্তব প্রতিফলন লক্ষ করা যায়না।