সম্পাদকীয়, টিডিএন বাংলা : রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। বাংলা সাহিত্যে অনেকেই রাজনীতি করেন। কিন্তু সৃষ্টি নিয়ে যদি আলোচনা হয় তবে আল মাহমুদ এযুগের সেরা কবি ছিলেন।
আর সমালোচকরা যদি মনে করেন, আল মাহমুদ শেষ জীবনে অন্য রাজনীতি করেছেন তাই তাঁকে মূল্য দেওয়া হবেনা,  তবে আমি জোর গলায় বলছি-
তুমি আওয়ামীলীগের কবি,
তুমি বিএনপির কবি,
তুমি তৃণমূলের কবি,
তুমি সিপিআইএমের কবি,
তুমি বামেদের কবি,
তুমি হিন্দুত্ববাদী কবি,
তুমি ইসলামী কবি,
তুমি বিজেপির কবি,
তুমি যৌনতার কবি,
তুমি ভোগবাদী কবি,
তুমি অশ্লীলতার কবি,
তুমি চাটুকার কবি,
তুমি সুস্থ সংস্কৃতির কবি,
তুমি অসুস্থ সংস্কৃতির কবি।
এই যখন কবিতার, উপন্যাসের, গল্পের অবস্থা তখন বাংলা সাহিত্য বলে কিছু থাকে তো ? ব্যাক্তি জীবন, রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যদি সাহিত্যের জনপ্রিয়তাকে অবজ্ঞা করা হয় তবে একজন এমন কবি ও সাহিত্যিকের নাম করুন যিনি ব্যাক্তি জীবন ও রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কের উর্দ্ধে ছিলেন। মাইকেল মধুসূদন খ্রিস্টান হয়েছেন বলে কম কথা শুনতে হয়নি। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাম আন্দোলনের স্লোগান ঠিক করে দিয়েছেন। একাধিক বিয়ে করেছেন অনেক নাম করা সাহিত্যিক। নগ্নতা ছড়ানোর অভিযোগ অনেকের বিরুদ্ধে।

আমি জোর দিয়ে আরেকটা কথা বলবো, আমি কিন্তু আল মাহমুদের প্রথম জীবনের সব কবিতার সাথে এক মত নই। অবৈধ প্রেম, অশ্লীলতা সাহিত্য হতে পারেনা। আল মাহমুদকে ভালবাসি মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, দেশের কবিতা, সংগ্রামী জীবনের জন্য।
মানুষকে একটা পথ তিনি দেখাতে পেরেছেন। আপনার কাছে প্রথম জীবনের সাহিত্য ভালো, আমার কাছে ভালো নাও হতে পারে। তবে হ্যাঁ, আজকের আল মাহমুদ কিন্তু সেই মুক্তি যুদ্ধের আল মাহমুদের জন্য বিখ্যাত হয়েছেন। একই ধারায় থেকে নতুন কিছু দিতে পেরেছেন বলে বিখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাঁকে শুধু অপমান আর বিতর্ক নিয়ে মরতে হয়েছে। এটা এই কারণে যে, ‘সুস্থ সাহিত্য’ বোধ নিয়ে তেমন আলোচনা হলেও বাস্তবিক প্রয়োগ আজও খুব কঠিন। সুস্থ সাহিত্যের কবিতা পড়ার লোক একটু কম। এমনকি যারা সুস্থ সাহিত্য, সুস্থ জীবনের কথা বলেন তাদের ঘরেও সুস্থ সাহিত্য, কবিতার বই খুব কম। ফলে আল মাহমুদ শেষ জীবনে এসে বড় ব্যথা নিয়ে বিদায় নিলেন। আগের জীবনের কবি হলে দুনিয়ার কত মানুষ ফুল দিত, আলোচনা হত, জাতীয় শোক হত। আজ সুস্থ সমাজের স্বপ্ন দেখা মানুষগুলি না তাঁকে সম্মানের আসন দিতে পেরেছে আর না প্রচলিত ধারার সাহিত্যিকরা অশ্লীলতা বিরোধী সাহিত্যকে গিলতে পেরেছে। তবে আমি গর্বিত যে, তাঁর শেষ জীবনের কবিতায় কোনও মানুষ অশ্লীলতার শিক্ষা পায়নি। যেহেতু সমগ্র সাহিত্য জীবন নিয়ে আল মাহমুদ, তাই প্রথম জীবনের কবিতা, লেখার মাধ্যমে কোনও অশ্লীলতা ছড়ালে সেটার হিসাব কবি দেবেন, আমরা নই।
তবে এটা বুঝতে পারলাম, কবিতা যদি নির্দিষ্ট বাঁধন ভেঙে বিকল্প কিছু দেয় তবে কাজটা খুব কঠিন। আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, মূল্যবোধ, সুস্থ সাহিত্য আজকালকার যুগে খুব বেশি চলেনা। এই কাব্য না কেনে ‘ভালো লোক’ বলে পরিচিত মানুষ আর না কেনে কলেজ ইউনিভার্সিটির প্রেম করা ছেলেমেয়েরা। তবে কেউ কাব্য কিনুক আর না কিনুক, ওই যে বিবেক বলে একটা জিনিস আছে না, সেই জন্য আমরা সোনালী সমাজের কবিতা লিখি। বিতর্ক সেখানে জীবনের অঙ্গ।

    লেখক : কবি মোকতার হোসেন মন্ডল