মলয় তেওয়ারী, টিডিএন বাংলা: এনআরসি কবে হবে, আগে ক্যাব হবে নাকি আগে এনআরসি, আদৌ হবে কিনা –এসবের মাঝে আরও একটি বিষয় আছে। তা হল ফরেনার্স ট্রাইবুনাল। এনআরসি ক্যাব হোক বা না হোক ফরেনার্স ট্রাইবুনাল গঠনের নির্দেশিকা কিন্তু কেন্দ্র সরকার জারি করে দিয়েছে। এবং নির্দেশিকাটি ভয়ঙ্কর। গত মাসে দিল্লিতে একটি গণ-আদালতে জনশুনানীর পর জুরিগণ (জুরি হিসেবে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের তিনজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক – জাস্টিস মদন লোকুর, জাস্টিস কুরিয়েন যোসেফ ও জাস্টিস এপি শাহ, প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি এবং শ্রীমতী গীতা হরিহরন, ডক্টর সৈয়দা হামিদ, প্রফেসর মণিরুল হুসেইন ও ডক্টর ফৈজান মুস্তাফা) যে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন সেখানে তাঁরা বলছেন-
“২০১৯ এর ৩০ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল গঠনের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। এই আদেশনামার আগে কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় সরকার এই ট্রাইবুনালগুলি প্রতিষ্ঠা করার অধিকারী ছিল যে ট্রাইবুনালগুলির হাতে আইনী ক্ষমতা থাকবে “ফরেনার্স(ট্রাইবুনাল) অর্ডার, ১৯৬৪”-র আওতায় কোনও ব্যক্তির নাগরিকতা নির্ধারণ করার। ৩০ মের পর এমনকি রাজ্য সরকার, ইউনিয়ন টেরিটরির প্রশাসন বা ডিস্ট্রিক্ত কালেক্টর বা ম্যাজিস্ট্রেটও চাইলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এইভাবে এই আদেশনামা বিভিন্ন স্তরের সরকারকে দেশের কোনে কোনে এইরকম ট্রাইবুনাল স্থাপনের অনুমোদন দিচ্ছে। এই আদেশনামা দেশের অভ্যন্তরে বহুবিধ সামাজিক শত্রুতা উস্কে দিতে পারে এবং ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে। তদুপরি, পার্লামেন্টে কোনওরূপ গণবিতর্ক বা আলোচনা ছাড়াই এই আদেশনামা পাস করা হয়েছে।”

বিশিষ্ট জুরিদের প্রকাশ করা উদ্বেগটি লক্ষ্য করুন। তাঁরা বলছেন যে একদম স্থানীয় স্তরের প্রশাসনের হাতে বিদেশী খোঁজার ক্ষমতা অর্পণ দেশে “বহুবিধ সামাজিক শত্রুতা উস্কে দিতে পারে”। আসামের অভিজ্ঞতা থেকে তো একথা আমরা জানি যে সাধারণ মানুষদেরই কেউ কেউ তাদের কোনও পড়শির বিরুদ্ধে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে অভিযোগ জানিয়ে আসছে, তারপর ট্রাইবুনালের সমন আসছে ও অভিযুক্তকে গিয়ে প্রমাণ করে আসতে হচ্ছে যে সে বাস্তবিকই বিদেশী নয়। হ্যাঁ, অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে। বিচারের মূল পদ্ধতিগত ধারণাটাই এক্ষেত্রে উলটে দেওয়া হয়েছে। এখানে অভিযোগকারীকে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়না, অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হয় সে নির্দোষ! এই বিষয়টি নিয়েও উক্ত গণআদালতের জুরিগণ তাঁদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনটিতে লিখেছেন। তাঁরা লিখছেন-
“নাগরিক কি না তা প্রমাণ করার দায় চালান করে দেওয়া হয়েছে অধিবাসীদের ওপর … সর্বানন্দ সনোয়াল বনাম ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একটি অপরিক্ষিত এবং বর্তমানে মিথ্যা বলে প্রমাণিত তথ্যের ওপর বিশ্বাস জ্ঞাপন করে অবস্থান নিয়ে নিয়েছিল যে পরিযান(মাইগ্রেশন) আসলে ভারতের ওপর “বহিরাগত আগ্রাসন”-এর সমতুল্য। এই বিশ্বাসে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ৩৫৫ নং অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে সেই বিধানটি খারিজ করে দিয়েছিল যে বিধান অনুসারে কোনও অধিবাসীকে বিদেশী হিসেবে প্রমাণ করার দায় রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। বিদেশী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিটির ওপরই সার্বিক দায় চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে এইভাবে এক সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল আদালত … বহিরাগত আগ্রাসন ও আভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এইভাবে এক সর্বগ্রাহ্য বয়ানে পরিণত হতে থাকে এবং পরবর্তীতে ফরেনার্স অ্যাক্টের সমস্ত কার্যধারায় তা প্রভাব বিস্তার করে।”

“বহুবিধ সামাজিক শত্রুতা উস্কে দিতে পারে”—আশঙ্কাটিকে এই প্রেক্ষিতে বিচার করে দেখুন। বাংলার বাইরে বাঙালী পরিযায়ী শ্রমিকদের এবার শুধু বাংলাদেশি সন্দেহ করেই হয়তো থেমে থাকবেনা, কেউ কেউ ফরেনার্স ট্রাইবুনাল অবধি পৌঁছে যাবে অভিযোগ নিয়ে। আর শুধু বাংলার বাইরে কেন? বাংলাতে এমনকি কেবল দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যেই বা কেন? পশ্চিমের জেলাগুলিতে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করা বাঙ্গালদের বিরুদ্ধে সেখানকার আদিবাসীদের, উত্তরবঙ্গে বাগিচাগুলির আদিবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের, বাঙালদের বিরুদ্ধে রাজবংশীদের বা ঠাকুর-নগর-বনগাঁ-গেদে এলাকায় পরে আসা নমোদের বিরুদ্ধে আগে আসা নমোদের যে ক্রমাগত উস্কানি বিজেপি দিয়ে চলেছে তা কে না জানে? ফলত দেশের কোণে কোণে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল গঠনের ক্ষমতা ও নির্দেশ সম্পর্কে জুরিগণের ব্যক্ত করা আশঙ্কা বুঝতে আমাদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এর সাথে একথাও মাথায় রাখতে হবে যে প্রতিটি রাজ্যে অন্তত একটি করে ডিটেনশন ক্যাম্প স্থাপন করার নির্দেশও দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।

জুরিগণের ব্যক্ত করা আশঙ্কার দ্বিতীয় অংশ আরও গভীর, তাঁরা বলছেন যে এই প্রকৃয়া “ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনা পাল্টে দিতে পারে”। ফরনার্স ট্রাইবুনালে বিচার কীভাবে বিচার পদ্ধতির মৌলিক জায়গাটাই বদলে দিয়েছে তা আগেই বলা হয়েছে। তাছাড়াও আরও কীভাবে পাল্টে যেতে পারে ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থাপনা সে বিষয়ে নিশ্চয় আপনারা চিন্তাচর্চা করবেন।