মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: ১৯৯৩ সালের দিকে স্কুল সার্ভিসের জন্য আবেদন করায় আমাকে এক ইন্টারভিউ এ প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনার দৃষ্টিতে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো দিন কোনটি। কী জানি কী ভেবে তখন উত্তর দিয়েছিলাম ৬ ই ডিসেম্বর ১৯৯২। এক্সপার্ট আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে ছিলেন গান্ধী হত্যার থেকেও কী এটা বেশি অপরাধ? একটু চুপ থেকে বলেছিলাম দুটোই জঘন্য অপরাধ, কিন্তু একটি সংঘটিত শক্তির পরিকল্পিত আক্রোশ অনেক বেশী ভয়ংকর।

সেই থেকেই কালোর বলয়ে ঘুরতে ঘুরতে এতো দিন পার হয়ে এলাম কিন্তু কোনোদিন মনকে আশাহত হতে দিইনি।প্রতিটি দিন প্রতিটি ক্ষণ আস্থা রেখেছিলাম আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রতি। আমাদের সংবিধান, আমাদের সর্বোচ্চ আদালত, আমাদের গণতন্ত্র সবকিছু নিয়ে আমাদের গর্বের অন্ত নেই। সেই সাথে সাথে আমার দেশের ঐতিহ্য, আমার দেশের সংস্কৃতি, আমার দেশের মানুষের সহনশীলতা নিয়ে দেশ জুড়ে দুনিয়া জুড়ে গর্ব করে বেড়িয়েছি। কত মিডিয়া ,কত সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখী হয়েছি কিন্তু হাজার বাঁকা প্রশ্নেও কোনো দিন বিচার ব্যবস্থার প্রতি সামান্য অনাস্থার কোন স্বর তারা আমাদের কন্ঠ থেকে বের করতে পারেনি। শুধু সিস্টেমের কথাই বা বলি কেন? যে সকল অমুসলিম ভাইদের সঙ্গে দিনরাত ওঠা বসা করি, যাদেরকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসি, রাজনীতি আর অর্থনীতি নিয়ে যাদের সঙ্গে চলে দিনরাত তর্কের লড়াই তাদের নিয়েও কি আমাদের গর্বের অন্ত আছে? “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে”এর এই দেশ যে কি স্বপ্নের স্বর্গপুরী তাতো ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।

কিন্তু ৯ নভেম্বর ২০১৯ সবকিছুকে যেনো ফিকে করে দিলো। হঠাৎ যেনো সবকিছু অগোছালো মনে হচ্ছে। আমার দেশ, আমার বিশ্বাস, আমার সংস্কৃতি, আমার ঐতিহ্যের ভিত্তিভূমি সবকিছু কেমন যেন আলগা হয়ে আসছে। কেনো যেনো মনে হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আমাদের আস্থার দিন মনে হয় শেষ হয়ে এলো। এখন আর দলীল, দস্তাবেজ, প্রমান এর কোন মূল্য আছে বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছেনা বিচার ব্যবস্থা কোন রাজনৈতিক প্রভাবের চোখ রাঙানিকে তোয়াক্কা করবে না। আমি অবশ্যই চাইনা কারো ধর্মীয় বিশ্বাস বা ভাবাবেগকে কোন ভাবে খাটো করে দেখতে। বিশ্বাস ও ভাবাবেগকে যথার্থ মূল্য দিয়েও ন্যায় বিচার দেওয়াটাই আদালতের কাজ।

আদালতের সিম্বলে আমরা যে দেখি বিচারকের দু’চোখ বাঁধা তার কী অর্থ?বিচার ব্যবস্থা তো চোখ বুজিয়ে নিরপেক্ষ হবে। তার একমাত্র বিচার্য বিষয় হবে তথ্য প্রমাণ দলীল। কথায় বলেনা কাগজ কথা বলবে। কাগজের কথা উপেক্ষা করে যদি চোখ রাঙানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তাহলে দুর্বল মানুষ যাবে কোথায় ? তার তো একমাত্র ভরসার জায়গা ওই অন্ধ বিচারক। যে ধর্ম দেখেনা, জাতি দেখেনা, বর্ন দেখেনা, অর্থ দেখেনা। তার ন্যায় দন্ডকে কখনো হুঙ্কার দিয়ে ধমকি দিয়ে বস করা যায়না। আমাদের মহামান্য আদালত এ উজ্বল রাজপথ ছেড়ে কেনো যে অন্ধকারময় সংকীর্ণ কানাগলিতে আবদ্ধ হতে গেলো তা বোধ গম্যের অতীত।

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে গেল ইতিহাসের এক উজ্বল শাসকের কথা। মধ্যযুগের এক প্রভাব শালী শাসক ছিলেন হজরত আলী। প্রায় অর্ধেক পৃথিবী তখন তাঁর শাসনাধীন। একদিন তাঁর মূল্যবান বর্ম চুরি হয়ে গেল। চুরি করেছে এক ভিন ধর্মী ইহুদী। বামাল ধরে আনা হল চোরকে। কিন্তু শাসক যত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হোকনা কেন আদালতের রায় ছাড়া তিনি তো আর কাউকে চোর সাব্যস্ত করতে পারেননা। তাই সেই ইহুদীকে তুলে দেওয়া হল আদালতের হাতে। বিচার প্রার্থী মহামান্য খলীফা। অভিযুক্ত এক সাধারণ ইহুদী। বাদী বিবাদী উভয়েই আদালতে হাজির। বাদী খলিফার কাছে তাঁর অভিযোগের সপক্ষে প্রমান চাইলেন বিচারক। সাক্ষী হিসাবে খলিফা হাজির করলেন তাঁর পুত্রকে। কিন্তু আদালত রীতি অনুযায়ী পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্যকে গ্রহণ করলেন না । হেরে গেলেন খলিফা। ন্যায় দণ্ডের এ আপোষহীনতা দেখে মুগ্ধ হয়ে অপরাধ স্বীকার করলেন ইহুদী। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হল এক আলোকিত অধ্যায়ের কথা।

আমাদের সামনেও এমন এক আলোকিত দৃষ্টান্ত স্থাপন করার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু আমরা পারলামনা।পারলামনা বিশ্বকে দেখাতে যে “নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান”এর এ দেশে ভিন্নতা শুধু ফুল বাগিচার শোভা বৃদ্ধির জন্য। আমাদের ধর্ম বর্ন ভাষার ভিন্নতা আমাদের জাতীয় ঐক্যকে ক্ষুণ্ন করতে পারেনি। ন্যায় বিচারের প্রশ্নে আমরা আপোষহীন । আমরা পারস্পরিক সমস্যা সমাধানের জন্য আদালত কখনো কোন পক্ষ অবলম্বন করুক তা আমরা কেউই চাইনা । হয়তো অনেকেই বলবেন আরে সব পক্ষই তো রায় মেনে নিয়েছে তাহলে আর এতো কথা কেনো? বিশেষ করে বাবরি মসজিদের পক্ষে যাঁরা লড়াই করেছেন তাঁরা তো শান্তির স্বার্থে রায় কে সম্মান জানিয়েছেন। কিন্তু এইখানেই রয়েছে এক বিশাল বড় ফাঁকি। দুর্বলকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা যে ন্যায় দণ্ডের কাজ নয়, এতটুকু বোঝার মত হৃদয়বত্তা থাকতে হয়।

রায়ের পর প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছেন। এই রায়কে বার্লিনের প্রাচীর ভেঙে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বার বার গলায় গলা মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সত্যিই কি দেশ এভাবে এগুতে পারে? কবি গুরু তো বলেছিলেন – ” যারে তুমি নীচে ফেলো সে তোমার বাঁধিবে যে নীচে, পশ্চাতে ঠেলিছ যারে সে তোমার পশ্চাতে টানিছে।”

এর পরও আমি হাল ছাড়তে চাইনা। এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি। মন্দির মসজিদ নয়, আসুন ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়াই। রাম রহিম একাকার হয়ে বিজয় নিশান উড়ুক মানবতার। আঁধার দূর করতে হলে আলো জ্বালাতেই হবে, সে আলো জ্বালাতে আসুন নতুন করে শপথ গ্রহণ করি।