আফরিদা খাতুন

আফরিদা খাতুন, টিডিএন বাংলা: রাজনীতি- যেটা ছাড়া একটা সমাজ তথা দেশ সম্পূর্ণ রূপে অচল। শিক্ষা থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সমস্ত কিছু সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য সুস্থ রাজনীতির একান্তই প্রয়োজন। একটি সমগ্র দেশ তথা বিশ্বের বর্তমান ভবিষ্যত উভয়ই নিহিত আছে রাজনীতি নামক এই ছোট্ট কথার মধ্যেই। প্রত্যেকটা নির্বাচনে সাধারণ থেকে শুরু করে শিক্ষিত সকল স্তরের মানুষ একটা সুন্দর শান্তিময় দেশ গড়ার আশা নিয়ে মনঃপুত যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল মন্ত্রী আমলারা ক্ষমতায় এসে আপামার জনগণের আশা-ভরসায় রীতিমত জল ঢেলে গিরগিটির মত রঙ বদলাতে থাকে ধীরে ধীরে।

প্রচলিত প্রথায় প্রতিষ্ঠিত সমস্ত রাজনৈতিক দলই নির্বাচনের আগে নিজেকে নিষ্পাপ শিশুর মত জাহির করে থাকে। শাসক দলের খুন-কালোবাজারী-লুঠ সহ প্রত্যেকটা কুর্কীতিগুলি এক এক করে জনগণের সামনে তুলে ধরে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে থাকে বিরোধীরা। কিন্তু ঐ দলগুলিও নিজেদের যেকোন পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় এগিয়ে রাখতে বা টিকিয়ে রাখতে হত্যা সহ অন্যান্য সমস্ত রকমের অপরাধের আশ্রয় নিতেও দ্বিধাবোধ করে না।
সমস্ত দেশ আজ রাজনৈতিক দলের দাঙ্গা ফ্যাসাদে জর্জরিত। রাজনীতির বিষাক্ত নিঃশ্বাসে শিশু থেকে বৃদ্ধ আক্রান্ত সকলেই। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রক্ত-হোলি খেলা। বাঙালির অন্যান্য উৎসবের মত এও যেন এক রক্ত উৎসবে পরিণত হয়েছে। শাসকদলের হুমকি আর অত্যাচারে বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম সহ অন্যান্য দলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ভীতি।
যার চুটিয়ে নিন্দা করছে বিরোধী দলগুলো। কিন্তু মজার বিষয় হল ঐ বিরোধী দলের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতেই মানুষ একসময় তৃণমূলকে মসনদে  বসিয়েছিল।
আজ সিপিএমের যে সমস্ত নেতা মন্ত্রীরা তৃণমূল কর্মীদের দিনের আলোয় খুন-খারাবির তীব্র নিন্দা করছেন। তারাই তো  একদিন নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে লাশের  সারি আর রক্তের বন্যা বইয়েছিল নিষ্ঠুর ভাবে। যে কমরেডরা কামদুনি ধর্ষণ কাণ্ডের প্রতি মাননীয়া মূখ্যমন্ত্রীর বিরুপ আচরণ নিয়ে প্রশ্নের পাহাড় দাঁড় করিয়ে ছিলেন তাদের হাতেই তো লুঠ হয়েছিল তাপসী মালী সহ আরো অনেক নারীর ইজ্জত।
সিঙ্গুর আর নন্দীগ্রামের  ঘটনা যে সিপিএমের বড়ো ভুল ছিল তা প্রাক্তন মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন। ২০০৭ সালে রিজওয়ানুরের হত্যাকারীদের আড়াল করতে তৎকালীন সিপিএম সরকার নিজ হাতে রিজওয়ানুর বড়ো ভাই সহ বেশ কিছু মানুষকে তৃণমূলের হাতে সযত্নে তুলে দিয়েছিল। ত্রিশ বছর সিপিএমের অত্যাচার থেকে রেহাই পেতেই মানুষ তৃণমূলকে ক্ষমতায় বসাতে বাধ্য হয়েছিল।
তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার মুহূর্তে যে সমস্ত অঙ্গীকার করেছিল তা কতটা পালন করেছে তার বিচার জনগণই করবে। তবে সাধারণ মানুষকে যে খুব সুকৌশলে তারা বশ করেছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ‘এইসময়’ সংবাদপত্রের প্রাক্তন চিফ এডিটর শাহনাওয়াজ আলি রায়হানের কথায়, সিপিএম কমিউনিস্ট ভাবধারার হয়েও ত্রিশ বছর ধরে কমিউনিজমকে যতটা আয়ত্ত করেছিল তার থেকে ঢের বেশি মমতা ব্যানার্জি পায়ে চপ্পল ও সাদা শাড়ি পরে আদায় করে নিয়েছেন। যে মমতা ব্যানার্জি দীর্ঘদিন অনশন ও প্রতিবাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই নেত্রীর ভায়েরাই আজ আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চারিদিকে চালাচ্ছে সন্ত্রাস। শাসকদলের ভীতিতে গোটা বাংলা আজ থমথমে।
বিজেপি সমগ্র ভারতে আজ অত্যাচার, ধর্ষণ, খুন, লুঠ, সন্ত্রাসের স্টীম রোলার চালাচ্ছে। ভারতে বিজেপি বিরোধী দলিত, মুসলিমদের অস্তিত্বই আজ বিপন্ন হয়ে উঠেছে। আর বিজেপির এই ভয়ঙ্কর গ্রাস থেকে বাংলাকে রক্ষা করার জন্য সাধারণ মানুষ তৃণমূল কর্মীদের অত্যাচার সহ্য করেও বাধ্য হচ্ছে তৃণমূলের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে। সাধারণ মানুষ খুনীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাধ্য হচ্ছে ডাকাতদের কাছে আশ্রয় নিতে। বিজেপি নামক সন্ত্রাস ভীতির ফায়দা লুটছে বর্তমান শাসক গোষ্ঠী।
বছরের পর বছর রাজনীতির ভয়ঙ্কর খেলায় বিপন্ন সাধারণ জীবন। তফাত খালি একটাই- কেবল হাত বদল হচ্ছে জালেমদের। বিজেপি যেমন মোদী ঘনিষ্ঠদের অর্থ পাচার করে দেশের রাজকোষ শৃন্য করছে ঠিক তেমনভাবে কংগ্রেসের কমনওয়েলথ কালোবাজারী দেশের রাজকোষ শূন্য করতেও পিছপা হয়নি। তবে বিজেপি সরকারের আমলে অত্যাচারের রোলারটা চলছে মারাত্মক গতিতে। দেশকে রাম রাজ্যে পরিণত করার চক্রান্তে বিজেপি সরকার দিনরাত মানবতাকে খুন করে চলছে। কখনো গো রক্ষার নামে আবার কখনো ফেক একাউন্টারের নামে চলছে সব মানবতা বিরোধী অপরাধ। কখনো বা লাভ জিহাদের নামে তো কখনো জিএসটির নামে  সাধারণ মানুষকে নাজেহাল করার সাথে সাথে ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তুলছে কেন্দ্রের সরকার।
আমার দেশের নেতা মন্ত্রীদের যতদিন না মহান স্রষ্টার কাছে জবাব দিহির চেতনা না আসে ততদিন রাজনীতির এই পৈশাচিকতা থেকে মানুষের বাঁচার কোন পথ খোলা নেই। নেতা মন্ত্রীদের কাছে সাধারণ মানুষ আজ পাপেট আর ল্যাপ ডগ ছাড়া কিছুই না। রক্তাক্ত পচা গলা লাশের বিদঘুটে গন্ধ বার হওয়া, বারুদের ধোঁয়া উঠতে থাকা এই রাজনীতির ততদিন পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয় যতদিন না শাসক গোষ্ঠীর মাথা থেকে ‘ক্ষমতা যার খাঁড়া তার’ এই ব্যাপারটা না যায়; নইলে রাজনীতির নামে কোন দিনও শান্তি আসতে পারবেনা। কেবল ঝরবে রক্ত, বাড়বে বিধবা নারীর সংখ্যা, খালি হবে শত শত মায়ের কোল।
শাসক আর বিরোধী গোষ্ঠী উভয় যখন নিজেদেরকে সাধারণ জনগণের ‘রক্ষক’ হিসাবে ভাবার মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারবে কেবল সেদিনই রক্তের এই হোলি খেলা বন্ধ হওয়া সম্ভব হবে। যেদিন দেশের উন্নতি এবং শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলি একে অপরকে কাদা ছোঁড়ার পরিবর্তে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসবে, যে দিন সমস্ত নেতা মন্ত্রীরা নিজেদের আখের গুছোনোর পরিবর্তে জনগণের স্বার্থকে আগে প্রাধান্য দেবে সেদিনই এদেশের মাটিতে রাজনীতির হাত ধরে  রক্তের বদলে ফিরে আসতে পারে শান্তি।
আফরিদা খাতুন
পাঁচলা, হাওড়া
Advertisement
mamunschool