অধ্যাপক ইমানুল হক, টিডিএন বাংলা (ভাটপাড়া থেকে ফিরে) : বেশ কিছুদিন মন ভালো নেই। চারপাশের বদলে যাওয়া দেখে। আজ মন ভালো করে দিল ভাটপাড়া। এক, শান্তি মিছিলে সাধারণ মানুষের স্রোত। দুই, তাঁকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ। তিন, ঘটনাস্থল ঘুরে বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলে সত্য জানা।
বন্ধু বিমল শর্মা উত্তর প্রদেশের মানুষ। পড়াশোনা চণ্ডীগড়ে। বামপন্থী ঘরানার মানুষ। বললেন, চলুন যাই ভাটপাড়া। গাড়ি চালালেন তিনিই। কাঁকিনাড়া স্টেশন থেকে মিছিল। থিকথিকে ভিড়। বিমান বসু, সোমেন মিত্র, মনোজ ভট্টাচার্য, মহম্মদ সেলিম, নেপালদেব ভট্টাচার্যরা আছেন।  গার্গী চট্টোপাধ্যায় মাইকে বলছিলেন ঝাণ্ডাবিহীন শান্তি মিছিল। দেখা হল  ঝুলন দাশগুপ্ত, বাসব বসাক, প্রদীপ মজুমদার, আয়ুব আলিদের সঙ্গে।
আমি আর বিমল মূল রাস্তা ছেড়ে গেলাম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়। হিন্দু মুসলমান মেলানো এলাকা। রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। সেখানে দেখি দু একটা ঘর মুসলিম পরিবারের। বন্ধ।  নেই কেউ। এলাম ঘোষপাড়া। মিষ্টির দোকানের যে ছেলেটি গুলি খেয়েছে সেই দোকান। সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেন, গুলি পুলিশ নয়, চালিয়েছে পুলিশের পোশাক পরা লোক। পায়ে কারও কারও চটি ছিল। আর তাঁদের গুলির কভারেজের আড়ালে বেছে বেছে ভাঙা হয়েছে দোকান।
-কাদের?
–মুসলমানদের।
— কারা করল?
— থোড়ি এলাকার লোক করেছে। সবাই সবার মুখ চেনে। একসঙ্গে বহুদিন আছি। কাল সকালেই ওদের মুখ দেখতে হবে। বাইরের লোক করেছে।

মুসলিমদের বক্তব্যও এক। এলাকার কেউ করে নি।
কিন্তু কী করে তবে ভাঙা হল অন্য দোকান অক্ষত রেখে মুসলিম মালিকের দোকান।
চিনিয়ে দিয়েছে কেউ।
এলাকার লোকজনের কথা, পার্টির কোনো লোক।

পার্টি আগে ছিল তিনটে।
এখন একটাই।  বিজেপি।
এক ব্যবসায়ী বললেন, আজ এই পার্টি করে তো কাল সেই পার্টি। সেই জন্যই সমস্যা।
এক তরুণ গান শুনছিলেন। জন্মসূত্রে হিন্দু।
তাঁর কথা, পাওয়ারের লড়াইয়ে আমরা পিষাই হচ্ছি।
ভাটপাড়া পৌরসভার পাশে টিনা গুদাম। সেখানে সবচেয়ে বেশি বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে।
মোড়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন একদল মানুষ। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারা গেল হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন।
বন্ধু সবাই। সবার এক কথা– এলাকার লোকজন ভাঙচুর করেনি।

গলি ধরে তিনশো মিটার এগোই। পুলিশ আর রাফের পাহারা। তা পেরিয়ে এগোই। স্বেচ্ছাসঙ্গী দুই মানুষ। একজন প্রৌঢ়। একজন তরুণ। একজন জন্মসূত্রে হিন্দু। একজন মুসলিম। তাঁরা দেখান ভাঙচুর হওয়া লুঠ করা কুঁড়ে ঘরগুলো।
সবগুলো মুসলমানদের ঘর।
জন্মসূত্রে হিন্দু মানুষটি বলছিলেন, সবাই ধরে নিয়েছে হিন্দু মানে বিজেপি। মুসলিম মানে টিএমসি বা সিপিএম।
মুসলিম যুবক প্রতিবাদ করে বলেন, বিজেপি করা মুসলমানের ঘরও ভেঙেছে গুণ্ডারা।
পার্টিগত ঝামেলা রূপ দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার। এখানে এক মসজিদে বোমা মারা হয়েছে।
শুনে ফিরে আসি।
দেখি এক বড় চাতালে আড্ডা চলছে।
এক প্রতিবন্ধী ভদ্রলোক জানালেন, এখানে হিন্দু মুসলমান সবাই আছেন।
মহিলা পুরুষ একসঙ্গে গুলতানি।
যেন  কোথাও কিছু ঘটেনি।
ছবি তুলব?
অবশ্যই।
দুজন তরুণ মাথায় রঙ করা চুল মাপে আমাদের। আড়চোখে।  তারপর চলে যায়।
ছবি তুলি।
একসঙ্গে বসে থাকা আসল ভারতের।