মুহাম্মদ নুরুদ্দিন, টিডিএন বাংলা: দেশ জুড়ে চলছে গণতন্ত্রের উৎসব। গণতন্ত্রের অর্থটাই কেউ বুঝুক আর না বুঝুক ভোট নিয়ে মাতামাতি চলছেই।যুযুধান দুই পক্ষ। এক দিকে মোদী-অমিত শাহের হুঙ্কার অপর দিকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার ঝাঁজ। সমানে সমানে তাল ঠুকছে আঞ্চলিক দল গুলিও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থকদের উল্লসিত স্লোগান- ”….দিল্লী যাবে হাওয়াই চটি, মুলায়ম অনুসারীদের দাবী উত্তর প্রদেশের নেতৃত্বে গঠিত হবে দিল্লীর সরকার। দক্ষিণ ভারতেও অনেকে তাল ঠুকছে। অর্থাৎ তৃতীয় ফ্রন্টের সম্ভাবনা সব দিক থেকে ফুটে উঠছে।সব জোট-বিজোটের অঙ্কের সার কথা মোদী সরকারের পতন ঘটাতে হবে।দিল্লিতে আনতে হবে নতুন সরকার।

মোদী অমিত শাহরা যখন সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে এগুতে চাচ্ছেন, হিন্দুত্বের তাস খেলে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের জিগির তুলে ভোট বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন তখন মোদী বিরোধীতাই হয়ে উঠছে বিরোধী রাজনীতির একমাত্র স্লোগান। সব রাজনৈতিক দল মোদী জুজু দেখিয়ে নিজেদের পাপকে আড়াল করে ফায়দা উঠাতে তৎপর। এই প্রেক্ষাপটে বাংলার রাজনীতি বিচার করলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি সামনে আসে।
পশ্চিমবঙ্গ বরাবরই ধর্ম নিরপেক্ষ, সংস্কৃতিবান রাজ্য হিসাবে সমাদৃত হয়ে এসেছে। সারা ভারত যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামায় জর্জরিত হয় তখনও এ রাজ্যের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন থেকেছে।

দীর্ঘ বামফ্রন্টের আমলে এ রাজ্যে বিজেপি আরএসএস তেমন কলকে পায়নি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ রাজ্যে বিজেপির উত্থান শুরু হয়। আজ কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু বাংলার গ্রামে গ্রামে বিজেপি যে সংগঠন গড়ে তুলেছে তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কী তৃণমূল কংগ্রেসের অবদান নেই?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদীর সমালোচনা করলেও মাঝে মাঝেই বিজেপি আরএসএসের প্রতি তার দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলেন। কখনও তিনি বাজপেয়ীর প্রশংসা করেন কখনও বা আদবানির। এক সময় তিনি এনডিএ সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। যার ফলে তিনি বা তাঁর দলের লোকরা বিজেপিকে অচ্ছুৎ মনে করেন না। আরএসএসের স্কুল গুলিকে সরকারী স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রশাসনের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে যাওয়ার মধ্যেও রয়েছে বিজেপির ভীত গাড়ার সূত্র।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যকলাপের মধ্যে রয়েছে বিজেপির বেড়ে উঠার খোরাক। তিনি এ রাজ্যে ইমাম ভাতা শুরু করেছেন, মুসলিম সভা সমিতিতে নিজে যেভাবে হিজাব পরে ‘ইনশাল্লাহ’, ‘মাশাআল্লাহ’ করেন তা কোনো ভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ সরকারের কাছে প্রত্যাশিত নয়। তাঁর এই সস্তা রাজনীতি তাঁকে সংখ্যালঘু তোষণকারী ‘মমতাজ বেগম’ এ পরিণত করে দিয়েছে। যেটাকে প্রচারের আলোয় এনে বিজেপি মানুষকে কাছে টানতে পেরেছে।অনেকের ধারণা এসব কিছুই মমতার গেম প্লান।

বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা জুড়ে যে রাজনৈতিক সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে তাতে বিজেপির পালে হওয়া লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ বুথে নির্বাচন হয়নি। বাকি গুলিতে নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং প্রশাসন যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে জিতে যাওয়ার যে খেলা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দল অবাধে করে চলেছে তাতে সাধারণ মানুষ বিকল্প খুঁজবেনই। কেন্দ্রের শাসক দল হিসেবে বিজেপি মানুষের কাছে বিকল্প হয়ে উঠে আসছে।

লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও এমন কিছু অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেছে যা থেকে অনেক প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে বসিরহাটের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে তৃনমূল কংগ্রেস প্রার্থী করেছে নুসরাত জাহানের মত এমন একজনকে যাকে অন্তর থেকে মেনে নেওয়া কোন মুসলমানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, তাঁর পেশা, তাঁর চিন্তা চেতনা ও ব্যক্তিত্ব কোনো কিছুই তাকে এই কাজের জন্য ফিট বলে মনে হয়না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী এসব না জেনেই তাঁকে প্রার্থী করে বসলেন! বসিরহাটের ইতিহাস অন্তত সে কথা বলেনা।

বসিরহাট এক দিক থেকে বাংলার মুসলিম সমাজের কেন্দ্র। ফুরফুরার পর বসিরহাটকে বেশি মানুষ চেনে।অন্যদিক থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও এখানে থাবা গাড়তে বরাবরই সক্রিয়। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হিসাবে এটা তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করে রেখেছিলেন যে কয়জন তাঁদের অন্যতম হাজী নুরুল ইসলাম। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত সৈনিক হিসাবে কাজ করে এসেছেন। গতবার তাঁকে হঠাৎ করে বসিরহাট থেকে টেনে জঙ্গিপুরে প্রার্থী করা হয় তখন অনেকেই অবাক হয়ে ছিলেন। একি নিছক তৃণমূল কংগ্রেসের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব না দিদির বিজেপিকে সুবিধা করিয়ে দেওয়ার খেলা।

বসিরহাটে প্রার্থী করা হয়েছিল এডভোকেট ইদ্রিস আলীকে। তিনিও এই এলাকায় সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নখ দাঁত বের করতে দেননি। বার বার উস্কানি দেওয়া সত্বেও এ অঞ্চলে বড় কিছু দুর্ঘটনা ঘাটেনি। ইদ্রিস আলীর কাজ নিয়েও জনগণের মনে কোন প্রশ্ন নেই। তাহলে হঠাৎ তাকে বাদ দিয়ে কলকাতা থেকে অনভিজ্ঞ নুসরাতকে টেনে আনা হল? শুধুমাত্র বিজেপি জুজু দেখিয়ে আমি যাকে দেব তাকেই ভোট দিতে হবে। এই মানসিকতা কেন? যারা নুসরাত কে পছন্দ করবেনা তারা অন্য কিছু ভাবতে যাবে। এই ভাবে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হবে আর তাতে আখেরে কার লাভ সে তো বোঝাই যাচ্ছে।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী পারতেন না এখানে কোন ভালো প্রার্থী দিতে? নাকী ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন শিরদাঁড়া সোজা কোন মানুষকে তিনি দেখতে পাননা?

আসলে ছেলে ধরা বুড়োর মত পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে বিজেপির ভয় দেখিয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হচ্ছে। আখেরে এর ফল কিন্তু ভালো হবেনা।

MD Nuruddin

লেখক- শিশু সাহিত‍্যিক