মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: ভারতের সংবিধানে ভারতকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্ম পালন এর স্বাধীনতা এখানে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত। অর্থাৎ ভারতের প্রতিটি নাগরিক স্বাধীনভাবে ধর্ম গ্রহন করার, পালন করার, ধর্ম বা বিশ্বাস প্রচার করার, অধিকার পাবে। এটা মৌলিক অধিকারের মধ্যে সামিল তাই রাষ্ট্র সর্বদা নাগরিকের এই  অধিকার সুরক্ষীত রাখার ব্যাপারে দায়বদ্ধ থাকবে। কোথাও কারো দ্বারা নাগরিকের এ অধিকার ব্যাহত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য রাষ্ট্রকে তৎপর হতে হবে। এটাই ভারতীয় সংবিধানের নির্দেশ। ভারতের এই ধর্মীয় স্বাধীনতা বিশ্বের দরবারে ভারতের মর্যাদা উন্নত করেছে। সভ্য ও উন্নত দেশগুলির তালিকায় ভারত সবসময় শীর্ষে অবস্থান করেছে। কিন্তু ইদানিংকালে ভারতের এই ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ।

সম্প্রতি ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। এই রিপোর্টে ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর পূর্বে এদেশে সংখ্যালঘুদের আঘাত আসেনি তা নয়। বরং এদেশে স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘুরা বরাবরই নির্যাতিত হয়ে এসেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই নির্যাতনের মাত্রা সীমা অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে সরকারের ভূমিকা এখানে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে ভারতে ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ৯টি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ আইন করে  স্বাধীনভাবে মানুষের ধর্ম গ্রহণ ও পালনের অধিকারকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। এখানে কোন  নাগরিক কোন ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে  করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বলাই বাহুল্য এটা ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর সুস্পষ্ট আঘাত। শুধু তাই নয় এটা সংখ্যালঘুদের উপর সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য বিস্তারের সুষ্পষ্ট প্রমান।

ওই মার্কিন রিপোর্টে দেখানো হয়েছে এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পছন্দ মত খাদ্য গ্রহণ করার অধিকারকেও খর্ব করা হয়েছে। ভারতের ২৯ টি রাজ্যের মধ্যে ২৪ রাজ্যে গো হত্যা নিষিদ্ধ। এখানে মানুষের রান্নাঘর এমনকি ফ্রীজ পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হয় গো মাংসের সন্ধানে। গো মাংস খাওয়ার, বহন করার, বা রাখার অপরাধে গনপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বারবার। এমনকী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সন্দেহ বসত মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে।

ভারতে গণপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। বলা হয়েছে সরকার গনপ্রহারের হাত থেকে নাগরিকের জীবন বাঁচাতে অসহায়ভাবে ব্যর্থ। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কোথাও গোরক্ষকদের দ্বারা, কোথাও চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা বাড়ছে। এই নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা বন্ধ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বরং সরকারের নীরবতা ও নির্লিপ্ততা উগ্রতা ও হিংসাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইনের শাসন তেমন নজরে পড়ছেনা।

শাসক দলের নেতা মন্ত্রীদের বক্তব্য হিংসা ঘৃণার পরিবেশকে উস্কে দিচ্ছে। এখানে এনজিও দের কাজ করার অধিকারকেও সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। অনেক এনজিওর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিচালিত প্রতিষ্ঠান গুলিকে মাইনরিটি স্ট্যাটাস প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও আমলাদের গড়িমসি সংখ্যালঘুদের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে।

এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ইতিহাস ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। ইতিহাস বিকৃত করে, বিভিন্ন জায়গায় নাম পরিবর্তন করে ভারতে মুসলমানদের ইতিহাস ঐতিহ্য মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে এলাহাবাদ, আহমেদাবাদ, মুঘল সরাই, ইত্যাদি মুসলিম ঐতিহ্য সম্বলিত নাম পাল্টে ফেলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মুসলিম আমলের স্থাপত্য শিল্প সম্পর্কেও মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টে যে রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে তাতে দেখানো হয়েছে ২০১৫-২০১৭ সালে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণের ঘটনা ৯ শতাংশ বৃদ্ধি  পেয়েছে। দুই বছরে ৮২২ টি হিংসার ঘটনায় ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছে ২৩৮৪ জন।

মার্কিন রিপোর্টে এ দেশের খ্রিস্টানদের উপর আক্রমনের কথাও  বলা হয়েছে। ২০১৭ এখানে ৭৩৬ টি খ্রিস্টানদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৬  সালে খ্রিস্টান দের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৩৪৮ টি। অর্থাৎ এখানেও হিংসা ঊর্ধ্বমুখী  দলিত ও আদিবাসীদের উপর আক্রমনের ঘটনাও দিনের পর দিন বাড়ছে।

দেশ জুড়ে হিংসার ঘটনা ঘটলেও রাজনৈতিক ভাবে এর মুকাবিলা করার কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছেনা। বরং রাজনৈতিক দলগুলি ঘোলা জলে মাছ ধরতে তৎপর। বিশেষ করে শাসক বিজেপি হিংসা ছড়িয়ে মেরুকরণের রাজনীতি করতে এই অবস্থা কে জিইয়ে রাখতে চায়।
এদিকে ভারতের বিচার ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষতা রক্ষার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন মামলায় অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে, মাঝে মাঝে রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারকে ভর্ৎসনা শুনতে হচ্ছে।

বিচার ব্যবস্থা এখনো কিছুটা আসা জাগিয়ে রাখলেও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ছাড়া সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা কমবে বলে মনে হয় না। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রাবিশ কুমার, এই রিপোর্টের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “বিদেশি কোন সংস্থার এদেশের মানুষের সম্পর্কে এই ধরণের ধারণার কোন ভিত্তি নেই।”