দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, টিডিএন বাংলা ডেস্ক : শুক্রবার পেশ হওয়া বাজেট আরও একগুচ্ছ জনমোহিনী জুমলা যা আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের মুখে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে তৈরী। তিনটি বড় ব্যয় বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে আজ- ২ হেক্টর পর্যন্ত জমির মালিক কৃষকদের জন্য সহায়ক আয় ৬০০০ টাকা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা পেনশন এবং বছরে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যক্তিগত আয়ের উপর কর ছাড়- শুনতে খুব বড়সড় লাগলেও প্রকৃত অর্থেই খুব সামান্য।

কৃষকদের পরিবার পিছু প্রতি মাসে ৫০০ টাকা সহায়ক আয়ের ঘোষণা (অর্থাৎ পাঁচজনের সংসার হলে মাথাপিছু দৈনিক ৩ টাকার বেশি বরাদ্দ নেই) ‘কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা’র পূর্ববর্তী ঘোষণাকে এক মশকরায় পরিণত করলো। তাছাড়া লিজ ও ভাগচাষীদেরকে এই এই যৎসামান্য সহায়ক আয়েরও বাইরে রাখা হয়েছে, যার ফলে কৃষিক্ষেত্রের প্রকৃত উৎপাদকদের সিংহভাগই এই ঘোষণা থেকে কিছুই পাচ্ছেননা। উপরন্তু সার ও খাদ্যের উপর ক্রমাগত ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়া (২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে এই দুটি ভর্তুকির পরিমাণ যথাক্রমে ২.৮৫% ও ৬.৯৭% থেকে কমিয়ে ২০১৯-২০ তে করা হল ২.৬৯% ও ৬.৬২%) গ্রামীণ সংকটকে আরো দুর্বিসহ করে তুলবে।

অসংগঠিত ক্ষেত্রের একজন শ্রমিক যে এখন কুড়ির কোটায়, তার ষাট বছর বয়সে ৩০০০ টাকা পেনশনের প্রতিশ্রুতি- আদতে বর্তমানে তাকে প্রতি মাসে প্রিমিয়াম দেওয়া শুরু করতে হবে- এছাড়া আর কিছুই জানান দিচ্ছেনা। বেতনভুক কর্মচারীদের কিছু অংশ- যাদের বাৎসরিক আয় ২.৫ লাখ থেকে ৫ লাখের মধ্যে, যখন কিছু কর ছাড় পাবেন (যাদের আয় ৫ লাখের উপরে, তাদের এখনও ২.৫ লাখ- ৫ লাখ আয়ের স্ল্যাব অনুসারে আয়কর দিতে হবে), তখনও আসল কর ছাড় অতি ধনীদের জন্যই সংরক্ষিত রাখা হল, দেশের আর্থিক বৈষম্য ক্রমশ বেড়ে চলা সত্ত্বেও যাদেরকে কোনও সম্পত্তি কর কিম্বা বর্ধিত কর দিতে হয়না।

‘ভারতে চাকরী প্রার্থীরাই আজ কর্মসংস্থানের সৃষ্টিকর্তা’ – এরকম একটা আত্মম্ভরী ঘোষণা ছাড়া কর্মসংস্থানের ব্যাপারে এই বাজেট স্পষ্টতই নীরব। ব্যাপক বেকারির কবলে পড়া দেশের যুবকদের সাথে এটা একটা বিরাট প্রবঞ্চনা। নোটবন্দীর ফলশ্রুতিতে সামগ্রিক কর্মহীনতার হার ২% থেকে ৬.১% দাঁড়িয়েছে (১৫-২৯ বছর বয়সীদের জন্য এই হার গ্রামীণ পুরুষদের ক্ষেত্রে ২০১১-১২ তে ৫% থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে ২০১৭-১৮তে ১৭.৪%, গ্রামীণ মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪.৮% থেকে ১৩.৬% হয়েছে এবং শহুরে যুবক ও যুবতীদের জন্যেও এই হার ততোধিক, যথাক্রমে ১৮.৭% ও ২৭.২%)। কাজের স্থায়ীকরণ ও ন্যূনতম মজুরি- ভারতের বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পে নিযুক্ত ক্রমবর্ধমান বিরাট সংখ্যক শ্রমিক, যাদেরকে কার্যত সামান্য পারিশ্রমিকের ভলান্টিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তাদের তোলা এই দুটি প্রধান দাবি সম্পর্কেও এবারের বাজেট সমানতালেই নীরব।

প্রতিরক্ষা খাতে যে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা সরকার বলছে তা আদতে গ্রামীণ বিকাশ, সমাজ কল্যাণ ও কেন্দ্রীয় অনুদানমূলক বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পের প্রায় সমপরিমাণ অর্থবরাদ্দ কমানোর (২০১৮-১৯ সালে যথাক্রমে ৫.৫%, ১.৬৯% ও ১২.৪১% থেকে ২০১৯-২০তে যথাক্রমে ৪.৯৯%, ১.৭৭% ও ১১.৭৭%) বিনিময়ে হয়েছে।

নির্বাচনের বছরে পেশ করা বাজেট গুলো বরাবর অন্তর্বর্তী চরিত্রের হয়েছে, কিন্তু এই সরকার পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রকাশের সমস্ত নিয়মাবলীকেই বেপরোয়াভাবে কাজে লাগিয়েছে এমনকি শেষ হতে চলা সরকারী নির্দেশিকা গুলিকেও। ২০১৪ থেকে চালানো বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অর্থনৈতিক কার্যকলাপের বিষয়েও বাজেটে সম্পূর্ণ নীরব থেকেছে এই সরকার।

জুমলানীতি নামে জনমানসে পরিচিত বর্তমান সরকারের অর্থনীতি সবধরনের বড় অর্থনৈতিক সূচকের বিচারেই জনজীবনে একটা তীব্র অনিশ্চয়তা ও গভীর অবক্ষয় নামিয়ে এনেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনধারণকে বড় সংকটের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। প্রাক-নির্বাচনী এই বাজেট যা কেবল অর্থনীতির নেতিবাচক ও নিম্নগামী ধারাগুলোর আশঙ্কাই তৈরী করছে তাকে দেশবাসী আসন্ন নির্বাচন গুলিতে অবশ্যই পরাস্ত করবেন অর্থনীতির নতুন প্রেক্ষাপট তৈরী করার লক্ষ্যে এবং কর্পোরেটদের লালসা ও স্যাঙাতি পুঁজিবাদের সেবা করার পরিবর্তে আম জনতার বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের দিকনির্দেশ করবেন।
(লেখক সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক)