দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, টিডিএন বাংলা: 

● দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হবে

লিটার পিছু উৎপাদন শুল্ক ও  সেস উভয়ই ১টাকা করে বাড়িয়ে পেট্রল ও ডিজেলের আরও মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে এই বাজেটে। ফলে পণ্য পরিবহন খরচা ও যাত্রীভাড়া বেড়ে যাবে। সাধারণ জনতার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। সোনা বা অন্যান্য আমদানিকৃত ধাতুর ওপর আবগারি শুল্ক ২.৫% বৃদ্ধি এবং আমদানিকৃত বই ও ছাপাখানার দ্রব্যাদির ওপর আবগারি শুল্ক ৫% বাড়িয়ে দেওয়া সমস্ত সেক্টরেই মুদ্রাস্ফীতি ঘটাবে।

● মধ্যবিত্তের জন্য নিরাশা

আয়কর সহ কোনও কিছুতেই কোনও রিলিফ দেয়নি মধ্যবিত্তকে। রিয়াল এস্টেট ব্যবসাকে গতি দিতে গৃহঋণে সামান‍্য রিলিফ দেয়া হয়েছে। ৪৫লাখ টাকা পর্যন্ত মূল‍্যের গৃহক্রয়ের জন‍্য গৃহঋণে করছাড়ের পরিমাণ ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩.৫ লাখ টাকা করা হয়েছে।

● সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ ত্বরান্বিত করবে

এয়ার ইন্ডিয়া সহ সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ইউনিট বিলগ্নিকরণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। রেলওয়ে বিলগ্নিকরণের পরিমাণ ঘোষণা হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা; বীমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের মাত্রা ঘোষিত হয়েছে ১০০%। সুতরাং এই বাজেট সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের কোম্পানিগুলির বেসরকারিকরণ আরও ত্বরান্বিত করবে। ‘ওয়ান নেশন ওয়ান পাওয়ার গ্রিড’ ঘোষণা এবং জল ও গ্যাসের জন্য আলাদা আলাদা গ্রিড(বিতরণ জালিকা) স্থাপন এই দুই জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কর্পোরেট কোম্পানির হাতে তুলে দেবে।

● দাসত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র দেবে, বেকারত্ব আর বৈষম্য বাড়াবে

শ্রম আইনে পরিবর্তনের কথা বলেছে বাজেট। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়া ও সমষ্টিবদ্ধ দরকষাকষি করার অধিকার খর্ব করার লক্ষ্যে এই পরিবর্তন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রসঙ্গে বাজেটে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি বা এনআরইজি (১০০ দিনের কাজ)এর মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা প্রসঙ্গেও নেই একটি শব্দ। এই বাজেট কর্মহীনতা ও বৈষম্যকে আরও গভীর করে তুলবে। এই বাজেট শ্রমিক বিরোধী।

● কৃষককে প্রতারণা

কৃষকের জন্য বাজেটে কিছু নেই। অথচ কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে আর খরা পরিস্থিতির চক্করে আর্তনাদ করছে। কৃষির কর্পোরেটকরণ ও শস‍্যবীজের বাজারের ৮৫%এরও বেশী অংশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির কব্জা থাকার বাস্তবতায় মোদি সরকার ঘোষণা দিয়েছেন ‘০% খরচে কৃষিকাজ’! কৃষকদের সাথে এ এক নিদারুণ রসিকতা। উৎপাদনশীল কৃষকদের ১০,০০০টি গোষ্ঠি গঠন করার ঘোষণাও তাদের সাথে প্রতারণা। কৃষক সমাজের প্রত্যাশার প্রতি এবারের বাজেট এক জবরদস্ত ধাক্কা। কৃষকেরা আশা করেছিলেন যে ঋণমুক্তির লক্ষ্যে এবং স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশগুলি লাগু করতে সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেবে। ১৫৯২টি উন্নয়ন অঞ্চলে ‘জল শক্তি অভিযান’ ঘোষণা এবং ‘জল জীবন’ প্রকল্পে ২০২২ সালের মধ্যে প্রত্যেকটি ঘরে পানীয় জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি এই সরকারের আরেক মিথ‍্যাচার।

● ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (MSME) নিরুৎসাহিত করা আর কর্পোরেট ও বিদেশী পুঁজিকে শক্তি দেয়া

একদিকে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩% ও ৫ কোটির উর্দ্ধে হলে অতিরিক্ত ৭% আয়কর ধার্য করা হয়েছে সারচার্জের মাধ‍্যমে। ফলে কর্পোরেট নয় এরকম মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে করের বোঝা বাড়বে, অন্যদিকে মোদি সরকার কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে ২৫% এ নিয়ে এসেছে। এইভাবে কর্পোরেট পুঁজির কব্জা শক্ত করা হয়েছে।

● ব্যাঙ্কগুলির ফাঁকফোকর আড়াল করা

একদিকে সরকার দাবি করছে যে ব্যাঙ্কগুলির অনুৎপাদক সম্পদ (NPA) বড়ো মাত্রায় কমেছে এবং  ব্যাঙ্কগুলি ঋণগ্রস্ততা কাটিয়ে উঠেছে। উপরন্তু এই বাজেটে  ব্যাঙ্কের লেনদেন কর আরও বাড়ানো হয়েছে। তথাপি বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে ৭০,০০০ কোটি টাকা দেয়ার বন্দোবস্ত উপরে উল্লিখিত সরকারী দাবির প্রকৃত বাস্তবতাকে দেখিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে ব্যাঙ্কগুলি থেকে কর্পোরেট কোম্পানিদের হাতিয়ে নেওয়া টাকা সরকার নীরবে পূরণ করে দিচ্ছে জনগণের দেওয়া ট্যাক্সের টাকা থেকে। আর এভাবেই আড়াল করা হচ্ছে কর্পোরেট ও ব্যাঙ্ক মিলে ‘অনুৎপাদক সম্পদ’ নতুন ঋণে বদলে দেয়ার খেলাটিকে।

● অর্থনৈতিক সমীক্ষার বাস্তবকে লুকিয়ে রাখা

ভারতীয় অর্থনীতির অবস্থা সম্পর্কে পূর্বতন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণিয়ামের প্রকাশিত সত্যকে লুকিয়ে ফেলার ছক এই বাজেট। মোদি-১ জমানার অর্থনৈতিক সমীক্ষা বিদেশী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে সুস্পষ্ট পতনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পূর্বতন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা উদ্ঘাটন করেছিলেন যে মোদি সরকার দ্বারা প্রকাশিত জিডিপির বৃদ্ধির হিসেব বাস্তবের হিসেব থেকে ২.৫% বেশী দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ মোদি সরকারের দেখানো ৭% নয় বাস্তবে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৪.৫%। সুতরাং বর্তমান জিডিপি ২ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ডলার হিসেবে উপস্থিত করা এবং পরবর্তী ৫ বছরে তা বাড়িয়ে ৫ লক্ষ কোটি ডলারে বৃদ্ধি করার সরকারী ভবিষ্যদ্বাণী দেশের জনগণকে বোকা বানানো ছাড়া আর কিছু নয়।