সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস, টিডিএন বাংলা: ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিজ্ঞাপিত করে জনগণের মতামত আহবান করা হয়। বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় প্রণব মুখার্জির নামে। তিনি তখন স্বরাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান। উদ্বাস্তু সংগঠন ও নেতারা সেই সময় থেকে এই প্রস্তাবিত বিলের বিরোধিতা শুরু করে। ৩/৪ মাস পর বিলটি রাজ্যসভায় পেশ হয় ১৮ ডিসেম্বর, ২০০৩ তারিখে। বিলটি সর্বসম্মতভাবে পার্লামেন্টে পাশ হয়। বিরোধী দলনেতা ড. মনমোহন সিং ও শংকর রায়চৌধুরী একটা সংশোধনী আনেন কিন্তু তা মানা হয় নি, ভোটাভুটি কেউ দাবি করেন নি।

২০০৩ সালের সংশোধনীতে অনেক বিষয় আছে। উদ্বাস্তুরা তার মধ্যে তিনটি ধারা/সেকশন নিয়ে আপত্তি তোলে এবং তা পরিবর্তন করার জন্য ১৬ বছর ধরে লাগাতার সংগ্রাম করে চলেছে, যার মধ্যে মতুয়াদের লড়াই যথেষ্ট প্রচারিত ও পরিচিত। এই দীর্ঘ সময়কাল ধরে কোন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন বা পরিচিত কোন শক্তি বি জে পি আমলে তৈরি এইসব আইনের বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন তোলেনি, কোন আন্দোলন করেনি। UPA তার ১০ বছরের শাসনকালে এইসব আইনের ধারা পরিবর্তন করতে কোন উদ্যোগ নেয় নি। যদিও মতুয়া-উদ্বাস্তুরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন করেছে, ডেপুটেশন দিয়েছে, আলোচনা করেছে, আন্দোলন করেছে। এই দীর্ঘ পর্যায়কাল ধরে কিছু মুসলিম সংগঠন ও নেতা উদ্বাস্তুদের যথেষ্ট সমর্থন ও সহযোগিতা করলেও, আর উল্লেখযোগ্য কোন সংগঠন উদ্বাস্তুদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে নি।

বি জে পি আমলে তৈরি আইনের তিনটি ধারা হলো— (১) সারাদেশে বাধ্যতামূলকভাবে এন আর সি করার নির্দেশ দেওয়া ১৪এ ধারা। (২) জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার শর্তযুক্ত করা।— বাবা-মা উভয়ে ভারতের বৈধ নাগরিক নাহলে কোন সন্তান এই দেশে জন্মগ্রহণ করলেও সে জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিকত্ব পাবে না। (৩) অনুপ্রবেশকারী সংজ্ঞা নির্ধারণ করা ধারা ২(১)(বি) ধারা।

মনে হয় এর মধ্যে সবচেয়ে অমানবিক ও অযৌক্তিক ধারা হলো জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার শর্তযুক্ত করা। কা-তে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার শর্তমুক্ত করা হলো না ; তার বিরুদ্ধে বর্তমান আন্দোলনকারীদের মুখে একটি শব্দ উচ্চারিত হলো না। উদ্বাস্তুরা কিন্তু এই ধারার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি সুপ্রিমকোর্টে মামলাও করে। তাদের যুক্তি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব শর্তাধীন করা মূল সংবিধান বিরোধী। এই দাবি ও লড়াই শুধু উদ্বাস্তুদের জন্য নয়, সবার জন্য। অন্য কোন দল বা মানবাধিকার সংগঠন এই কাজে আজও এগিয়ে আসেনি। মামলায় আরো কিছু বিষয় আছে, মনে থাকলে প্রয়োজনে পরে তা যথাস্থানে লিখবো। মামলাটি এখন সুপ্রিমকোর্টে ৫ বিচারকের সংবিধান বেঞ্চে আছে। আরও ৯/১০ টি পার্টি এই মামলায়— যারা সবাই অসমের।

বাকি অন্য দুটি ধারা ১৪এ এবং ২(১)(বি) নিয়ে চলছে বর্তমানের আন্দোলন।

২(১)(বি) ধারায় অনুপ্রবেশকারী সংজ্ঞা দেওয়া হয়। তাতে যা বলা হয় তার মূল কথা বেআইনিভাবে কেউ (হিন্দু, মুসলমান, শিখ যেকেউ) ভারতে ঢুকলে বা আইনিভাবে ভারতে এসেও অনুমতির সময়সীমা পার হয়ে যাবার পর ভারতে থেকে গেলে— এই উভয় অংশের মানুষ অনুপ্রবেশকারী এবং এইসব মানুষের ভারতের নাগরিকত্ব পাবার অধিকারী নয়।

এই আইন পাশ করে বি জে পি ও সঙ্ঘ পরিবার প্রচার শুরু করে যে হিন্দুরা শরণার্থী আর মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী। এই মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে উদ্বাস্তুরা সাধ্য মত সত্য কথা প্রচার করে। যে কেউ জানেন যে, বেআইনিভাবে ভারতে এসেছেন মূলত হিন্দুরা। আর হিন্দু দরদের মুখোশধারী বি জে পি এই আইনের দ্বারা আসলে হিন্দুদের অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করে। আরো সঠিকভাবে বললে তারা আসলে দলিত হিন্দুদের সর্বনাশ করতে এই আইন তৈরি করে। কারণ একটু দেরিতে আসা উদ্বাস্তুরা মূলত দলিত হিন্দু।— হয়তো এই কারণে বা অন্যকোন অজানা কারণে বি জে পি-র এই অন্যায় ও মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলো, বুদ্ধিজীবীশ্রেণী, মানবাধিকার সংগঠন ও গোটা ভদ্রোলকশ্রেণী ১৬ বছর নীরব।

আমরা জানি— ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের কারণে কিছু মুসলমান ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যায়। আর অনেক হিন্দু, শিখরা পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসেন, আজও এসে থাকেন। এটাই দেশভাগের কারণে মানুষের দেশান্তরণের স্বাভাবিক গতি। বি জে পি দীর্ঘকাল ধরে প্রচার করে আসছে যে, লাখ লাখ এমনকি কোটি সংখ্যার বেশি বাংলাদেশি মুসলমান এই রাজ্য, অসম ও দেশের অন্যান্য রাজ্যে এসেছেন আগামীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে এই দেশ দখল করার পরিকল্পনা নিয়ে! উদ্বাস্তুরা তাদের এই দুরভিসন্ধিমূলক প্রচার ও তত্ত্বের বিরোধিতা করে থাকে নানা পথে। অন্য যারা আজ সক্রিয় তাদের কিন্তু এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে এতকাল তেমনভাবে সরব হতে দেখা যায় নি।

উদ্বাস্তুরা মনে করে বাংলাদেশি মুসলমানরা ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য আসেন না। যদি কিছু গরিব মানুষ কাজের খোঁজে আসেনও, তারা কাজ করেন, আবার ফিরে যান। তাই তারা নাগরিকত্ব নিয়ে ভাবেন না, দাবি করেন না। যুক্তিযুক্ত কারণে কোন সংগঠনও আজও এই দাবি করে নি। তাই মুসলমানদের বাদ দেবার কথা বলা ঠিক নয়। এটাই হলো বাস্তব অবস্থা। বাংলাদেশি মুসলমানদের নাগরিকত্বের ইস্যু একটা কাল্পনিক বিষয়।

এর পাশাপাশি যে প্রশ্নটি থেকে যায় তাহলো সাম্প্রদায়িকতার বিষয়, সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রশ্ন। আমার মনে হয় যেখানে বাংলাদেশি মুসলমানরা কোন পার্টি নয়, সেখানে তাদের প্রতি অবিচার-অন্যায়ের প্রশ্ন না তোলা ভালো। তুললেই বরং বি জে পি-র মেরুকরণের সুবিধা হয়। বাংলাদেশ থেকে কাতারে কাতারে মুসলমান অনুপ্রবেশের ভুল ও মিথ্যা তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়। এই সুযোগ তাদের একবার করে দিলে ভারতীয় মুসলমানদের তারা বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেবার কাজে উৎসাহ পাবে। ভারতীয় মুসলমানদের বিষয়টি ভাবতে হবে। হটাৎ মুসলমান দরদীরা শেষ বিচারে তাদের সর্বনাশের কারণ হবে কিনা!

আমাদের সংবিধানের ১৪ ধারার কথা বলা হচ্ছে। এই ধারায় ভারতে বসবাসকারী কেউ (নাগরিক ও বেনাগরিক) যেন আইনের সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এখানে লক্ষ্য করার যে এই আইন ভারতে বসবাসকারীদের আইনের চোখে সমানভাবে দেখার কথা বলা হয়েছে। তাই যেসব হিন্দ এখন বাংলাদেশে আছেন তারা এই ধারার সুবিধা পাবেন না,এই ১৪ ধারার উল্লেখ করে তাদের প্রতি অবিচার হলো বলা যাবে না। তেমনি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী ভারতে নেই বলেই কা-তে মুসলমানদের বাদ দিলেও তা সংবিধানের ১৪ ধারা লঙ্ঘন হয় না। তবে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব হিন্দু, শিখ ভারতে এসেছেন ও বসবাস করছেন তাদের কা-এর অন্তর্ভুক্ত না করা ১৪ ধারার লঙ্ঘন, একথা কেউ বলতেই পারেন।

আমার এইসব কথায় যদি কোন ফাঁক থেকেও যায়, তাহলে তা পূরণ করার জন্য নিচের তথ্যগুলি উল্লেখ করেছি। দেশভাগের পর গান্ধীজি বলেছিলেন— পাকিস্তানের হিন্দু-শিখদের কথা ভারত সরকারকে ভাবতে হবে। আমার মনে হয়— তিনি মুসলমানদের নাম অনুল্লেখ রাখলেন বলে কেউ এই কথাকে সম্প্রদায়িক বলবেন না। ড. আম্বেদকর ১৯৫০ সালে তার পদত্যাগপত্রের ব্যাখ্যমূলক পত্রে বলেছিলেন— কাশ্মীরের থেকে বেশি উদ্বেগজনক হলো পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের অবস্থা ( বইটা এখনি হাতের কাছে নেই, তাই শব্দটা বলতে পারছি না, কিন্তু বিষয় হিন্দু)। আমাদের সরকারের উচিত এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা। প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, নেহেরু— সবাই পাকিস্তানের হিন্দু-শিখদের কথা বলেছিলেন। তাদের দেশান্তরিত হয়ে ভারতে আসার ফলে উদ্ভূত সমস্যাদির সমাধানের কথা বলেছিলেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। খানিকটা করেছিলেন। বাকিটা নিয়ে আজকের সমস্যা। তাদের এইসব ঘোষণা আজ পর্যন্ত কেউ সাম্প্রদায়িক ঘোষণা নলেছেন বলে শুনিনি। আমি হিন্দু, মুসলমান, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র-যুব—সবার কাছে বিষয়টি ইতিহাস ও বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে বিচার করার জন্য অনুরোধ করবো।

আমি অনুরোধ করবো ড. মনমোহন সিং ও শংকর রায়চৌধুরী ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাজ্যসভায় যে দাবি করেছিলেন তা পড়ে দেখার জন্য। শব্দ যাই থাকুক আইনে যে ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন তা হিন্দু-শিখদের জন্য, মুসলমানদের বাদ রেখেছিলেন। মুসলমানদের বাদ রাখার জন্য মুসলমানরা তাদের কথায় ক্ষুব্ধ হন নি, যুক্তিযুক্ত কারণেই তারা ক্ষুব্ধ হন নি। আজও মুসলমানরা সোচ্চারে বলছেন যে, তারা দেশান্তরিত হয়ে আসা হিন্দু, শিখদের নাগরিক বলে ঘোষণা করা হোক।

আমি দি ইমিগ্রান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) আইন, ১৯৫০-এর দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফের শেষ অংশ সবাইকে পড়ার জন্য অনুরোধ করবো। শব্দ নিয়ে তুলকালাম না করে করে দেখুন যে, দেশভাগের শিকার হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ দের কিছু বিশেষ সমস্যা ও সুবিধা স্বীকার করা আছে ওই আইনে। আইনটির নামে অসম শব্দ থাকলেও আইনটি সারাভারতের জন্য এবং পার্লামেন্ট তা প্রণয়ন করে। আইনে যদি কোন ব্যাখ্যার ঘাটতি বলে মনে হয়, পার্লামেন্টের ডিবেট পড়ুন, পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১৪এ ধারার বিরুদ্ধে মতুয়া-উদ্বাস্তুরা আপত্তি জানায়। এই আপত্তি যে শুধু উদ্বাস্তুদের দাবি নয়, অন্যান্যদের স্বার্থ জড়িত উদ্বাস্তুদের আন্দোলন শুরুর ১৬ বছর পর তা দেশের মানুষ বুঝতে পারছেন!

প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব শর্তযুক্ত করায় এবং ২(১)(বি) ধারায় উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করায় উদ্বাস্তুদের সমূহ বিপদ। কারণ এই আইন পরিবর্তন না করে যদি এন আর সি বা নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হয়, তাহলে উদ্বাস্তুদের নাম বাদ পড়বে, তারা বেনাগরিক হিসাবে চিহ্নিত হবেন।

শুধু নাগরিকপঞ্জি থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষগুলি বাদ পড়বেন তা নয়, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম— যারা উদ্বাস্তু পরিবারে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করছে ও করবে, তারাও ভারতে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে গন্য হবেন। ভারতে তৈরি হবে এক দেশবিহীন জনগোষ্ঠী।— এমন একটি ভয়ংকর আইন ও পরিস্থিতির পরেও ১৬ বছর ধরে কোন প্রতিবাদ ধ্বনিত হলো না!

মতুয়া-উদ্বাস্তুরা ঠাকুরণগর, কলকাতা, দিল্লিতে বারবার অনশন করেছেন, বহু ধর্ণা, জেলভরো আন্দোলন, রেল অবরোধ বড় বড় জমায়েত, লিফলেট, বুকলেট— গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সব অস্ত্র তারা ব্যবহার করেছে। শুধু এই রাজ্যে নয়, দেশ জুড়ে এই আন্দোলন হয়েছে। প্রচার মাধ্যম নীরব!

দাবি উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব, উদ্বাস্তুদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে ঘোষণা, নিঃশর্ত নাগরিকত্ব। তার আগে কোনভাবে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা যাবে না। এই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব শর্তযুক্ত করা, ২(১)(বি) ধারা এবং ১৪এ ধারা তৈরি করার পর কংগ্রেস নেতৃত্বে UPA ১০ বছর কেন্দ্রের ক্ষমতায়।

এই আইন তৈরি করার পর তা কার্যকরী করার সুযোগ বি জে পি পায় নি। এই সময়ে উড়িষ্যায় বি জে পি-বি জে ডি যৌথভাবে সরকার তৈরি করে। কেন্দ্রের আইন ও রাজ্যের ক্ষমতা ব্যবহার করে বি জে পি উড়িষ্যা থেকে অনেক মানুষকে বাংলাদেশি অজুহাতে পুশব্যাক করে ( লোকগুলোর মধ্যকার কিছু নাম ও তথ্য বিস্তারিত আমাদের পুস্তিকায় পাবেন) করা হয়। ওই রাজ্যের কেন্দ্রাপাড়া জেলার মহাকালপাড়া ব্লকে ১৫৫১ জন উদ্বাস্তুকে বাংলাদেশি অজুহাতে দেশছাড়ার নোটিস (নোটিসের ভাষা আমাদের বুকলেটে দেখুন) দেওয়া হয়। এর মধ্যে একজন বর্ণ হিন্দু বা মুসলমান নন। সবাই নমো-মতুয়া।

দিল্লি-বোম্বেতে বাংলায় কথা বললে লুঙ্গি উঁচু করে দেখা হয়েছে, মুসলমান হলে বাংলাদেশি বলে পুশব্যাক করার চেষ্টা হয়েছে।— যাদের প্রায় সবাই ভারতীয় মুসলমান। বি জে পি শাসিত রাজ্যে এসব হয়েছে, কেন্দ্রে UPA, তারা উদ্বাস্তুদের আইন পরিবর্তনের দাবিতে কান দেয় নি।

বাংলার ক্ষমতায় বামফ্রন্ট—যারা নীতি নৈতিকতায় ফেরেস্তা ও বাকপটু! মুখ্যমন্ত্রী মমতা দেবীসহ এইসব বিরোধীদের কীর্তি শুনুন। এরা এখন বলছেন যে, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড থাকলেই নাকি নাগরিক! এরা সব ভন্ডদের গুরুমশায়! আর এদের প্রচারে অনেক সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করছেন যে, আইনত অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত উদ্বাস্তুরা নাকি ভারতের নাগরিক! যারা বলছেন ২(১)(বি) ধারার কোন দাম নেই বা কার্যকারিতা নেই, তারা কা-কে কেন দাম দিচ্ছেন! এটা যদি ভণ্ডামি না হয়, তাহলে তো ভন্ড শব্দ বিলোপ করতে হয়।

শুরু করতে হয় মরিচঝাঁপি দিয়ে, সেটা ছেড়ে রাখছি। যা জানি তার সবটা এখানে লিখছি না। বুকলেটে দেখে নিতে পারেন। এই বুকলেটগুলি ২০০৯/২০১০ সালে লেখা। আর এ কথাও জানিয়ে রাখি যে, আমরা সব ঘটনা জানি না। প্রকৃত অবস্থার সামান্য কিছুমাত্র আমরা জানি ও বুকলেটে উল্লেখ করেছি।—– ২০০৬ সালে এই রাজ্যে ১২৯৮০০০ জন ভোটারের নাম কেটে বাদ দেওয়া হলো। অজুহাত– এদের মধ্যকার অধিকাংশ নাকি আদতে বাংলাদেশি (আনন্দ বাজার ২৩.০২.২০০৬)। এটাতে কী প্রমান হয়? ভোটার তালিকায় নাম মানেই ভারতীয়? এই সময় কেন্দ্রে কিন্তু বি জে পি ছিল না। মনে করুন— নদিয়ার নমো সাংসদ আলোকেশ দাসকে ৫০ বছর আগে থেকে ভারতে বসবাসের কাগজপত্র ও অন্যান্য নথি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষককে দেখিয়ে পার পেতে হয় বলে খবরে প্রকাশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে চাকরি করলে বা এম এল এ/এম পি মানেই ভারতের নাগরিক— এই যুক্তি UPA আমলেও মানা হতো না। চাকরি করছেন এরমধ্যে পুলিশ রিপোর্ট জানালো চাকুরে বাবু বাংলাদেশি, এই অবস্থায় সুইসাইড করার একাধিক ঘটনা এই রাজ্যে ঘটেছে। তাই চাকরি করলেই নাগরিক, এটা আইন নয়। শুধু বি জে পি আমল নয়, সব আমলেই।

মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেববাবুর সচিবালয় থেকে নদিয়ার পুলিশ সুপারকে ৪২৩ জনের একটি তালিকা পাঠিয়ে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে ও রিপোর্ট পাঠাতে বলা হলো। ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হলো বাংলাদেশী বলে। আর রিপোর্টে বলা হলো— তাদের মধ্যকার প্রায় সবাই ভোটার, রেশন কার্ড আছে ; কেউ ভারতীয় নাগরিক নয়(আনন্দ বাজার ৩০.০৩.২০০৬ এবং ০৬.০৪.২০০৬)। কৃষ্ণনগরের যাত্রাপুর ৩৪০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় বাংলাদেশি বলে। বর্ধমানের গুসকরাতে ৮৫ জনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি বলে পরোয়ানা বেরোয়। ৩ জন গ্রেফতার হয়ে ৯ মাস জেল খাটে, মামলা চলছে। হুগলির বলাগড়ে গ্রেফতার হয়। মেদিনীপুরের গড়বেতায় বাংলাদেশি বলে গ্রেফতার হয়।—বহু এমন ঘটনা। কাগজে লেখা হয় এই রাজ্যে ২০০৫ সালের আগেই ৩০০ জনকে বাংলাদেশি বলে গ্রেফতার করা হয়। এরা সবাই হিন্দু। এসব হয় ২০০৩ সালের নাগরিক আইন সংশোধন করে উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করার পর। বি জে পি আমলে তৈরি আইন প্রয়োগ করা হয়। কেউ বিরোধিতা করে নি। সবাই যে পার্লামেন্টে মিলিজুলি এই আইন প্রণয়ন করেছিল!

পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ধরতে টাস্ক ফোর্স তৈরি র কাজ শুরু হয়। ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির টাকা বরাদ্দ করে কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্য সরকার পেট্রাপোলে ওই ক্ষ্য করার পরিকল্পনা করে। কাগজের কাটিংটি পাচ্ছি না, নাহলে আনন্দ বাজারে খবরের তারিখ লিখে দিতে পারতাম। বুদ্ধদেব বাবু ঘোষণা করলেন, ” উদ্বাস্তু আগমনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসের ভারসাম্য বদলে গেছে, তাই আর উদ্বাস্তুদের বরদাস্ত করা হবে না।

১৭.০২২০০৬ তারিখে আনন্দ বাজার লেখে মমতা দেবী উদ্বাস্তু বিতারণ ও তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেবার দাবিতে সাংসদ পদে ইস্তফা দেন। গাইঘাটায় বি ডি ও এবং বনগাঁয় এস ডি ও অফিসে বাংলাদেশিদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে বাদ দেবার জন্য বার বার ডেপুটেশন দেয় আমরা দেখেছি, কাগজে বেরিয়েছে এই খবর। লোকসভায় মমতা দেবী কী করেছিলেন, তা দেশবাসী জানেন। আরো পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা দেবী ২২ অক্টোবর, ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতীয় উন্নয়ন পরিষদের সভাতে আভাসে অনুপ্রবেশকারী সমস্যার উল্লেখ করেছেন।—- তাই এইসব বিরোধীরা উদ্বাস্তুদের সর্বনাশের মূল্যে দলীয় স্বার্থ দেখছেন, এই কথা ভাবা যুক্তিযুক্ত নয় বলে বলা যায় না। বসঙলার বিরোধীরা মুসলমানদের স্বার্থের কথা বলছেন। সাচার কমিটির রিপোর্ট বলে দেয় বামেরা কতটা মুসলমান দরদী। গত ৮/৯ বছরের পরিবর্তন পন্থীদের জমানায় মুসলমানদের অভিজ্ঞতা তারা ভালো জানেন। পাওনা হলো শুধুই ধাপ্পা। আর এই অবস্থায় কা-এর আতংক ছড়িয়ে ভোট ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা। তবু চাই তিনি ভোট ধরে রেখে বি জে পি-কে হারিয়ে দিন, মুসলমানরা বি জে পি-কে হারাতে ভোট দিন ; কিন্তু তৃণমূলকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নয়। হয়তো তারাও আমার মতই ভাবছেন।

২০১৬ সালের ১৫ জুলাই বি জে পি সরকার নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল, ২০১৬ পেশ করে। আর অসমে এন আর সি-র কাজ চলতে থাকে। প্রায় নির্বিগ্নে কাজ চলে। যেটুকু কথা শোনা গেছে তা অসমে, আর উদ্বাস্তুরা যা বলেছে, বলার চেষ্টা করেছে।

আমাদের সংগঠন জে পি সি-তে সাক্ষ্য দেবার ডাক পায়। আমি, উত্তর প্রদেশের নিত্যানন্দ মল্লিক এবং ছত্রিশগড়ের মন্মথ বিশ্বাস জে পি সি-তে উপস্থিত হয়ে উল্লিখিত তিনটি বিষয়ে বিলে সংশোধনী চাই। হিন্দু, শিখ উল্লেখ না করে উদ্বাস্তু বা দেশভাগের শিকার শব্দের ব্যবহার চাই। ভিত্তিবছর উল্লেখ করে উদ্বাস্তুদের নাগরিক ঘোষণা করার দাবি জানাই, আবেদন করার গোলক ধাঁধা সৃষ্টির বিরোধিতা করি। বিলে উল্লিখিত তিনটি শর্তের বিরোধিতা করি। ওই শর্ত যে আসলে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব না দেবার জন্য তা বলি। পরিষ্কার করে বলি এই বিল উদ্বাস্তুদের প্রতি প্রতারণা। ২০১৬ সাল থেকে সারা দেশ জুড়ে সাধ্যমত এই কথা প্রচার করে বি জে পি-র উদ্বাস্তু দরদী মুখোশ খুলে দেবার কাজ করে যাচ্ছি।

বিরোধী দলগুলি, মানবাধিকার সংগঠন বা কোন সংগঠন এই পর্যায়ে কোন কথা বলেনি বললেই চলে।অসমের বিষয়টা কিছুটা আলাদা। তবু এই সব দলের যে সব সাংসদ জে পি সি-তে ছিলেন, তাদের দাবির মধ্যে দলের মনোভাব খানিকটা বোঝা যায়। বিশেষ করে তৃণমূল ও সি পি এম দলের মনোভাব। কারণ তাদের সাংসদ দলের বাইরে কথা বলবেন, এটা হয় না। কংগ্রেস হয়তো খানিকটা অন্যরকম।

জে পি সি-র সুপারিশ যে আলাদা, সেটা আমরা জানি। ওটা বি জে পি-র মত, সংখ্যার জোরে। আমি কয়েকজনের নোটস অফ ডিসেন্ট নিয়ে বলছি। দ্বিমত পোষণ করে চিঠি দেন সৌগত রায়, মো: সেলিম, প্রদীপ ভট্টাচার্য, অধিররঞ্জন চৌধুরী, সুস্মিতা দেব।

সৌগত বাবুর আপত্তি ৬ টা সম্প্রদায়ের নাম আলাদা করে বলায়, বিকল্প প্রস্তাব নেই। সেলিম সাহেব তিন দেশের পরিবর্তে সব দেশ থেকে সবার জন্য অবারিত দ্বার দাবি করেন। প্রদীপবাবু নাগরিকত্ব দেবার দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ চান ও একটা ভিত্তি বছর চান। অধীর বাবু ১৪ ধারার অবমাননা নিয়ে লেখেন, উদ্বাস্তুদের জন্য কোন বিকল্প প্রস্তাব নেই।

সুস্মিতা দেব ঐতিহাসিকভাবে দাবিদার উদ্বাস্তুদের জন্য নিঃশর্ত দাবি করেন। তিনি লেখেন এই বিলে নাগরিকত্ব দেবার কথা নেই। তিনি আরো লেখেন—যাদের নাগরিকত্বের কথা বলে এই বিল আনা হয়েছে তাদের নাগরিকত্বের সমস্যার সমাধান এই আইন করবে না।তিনি ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আসা মূল ভারতীয়দের (ইন্ডিয়ান অরিজিন) শর্তহীন নাগরিকত্ব চেয়েছেন তার চিঠিতে।

আমি মনে করি সুস্মিতা দেব তার চিঠিতে যে সুর বেঁধে দেন, এই প্রচার করলে বি জে পি-কে বিপাকে ফেলা যেত, বি জে পি- র ধাপ্পা উদ্বাস্তুদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যেত। তা না করে তৃণমূল, সি পি এম ও অধীর বাবুর দেওয়া ভুল পথ ধরে প্রচার করে বি জে পি-র মেরুকরণের কাজে সহায়তা করা হলো, এখনও সেই কাজ চলছে।

এসব চিঠি এবং বিলের আলোচনায়, সংসদের বিতর্ক শুনলে/দেখলে বোঝা যায় উদ্বাস্তুদের জন্য কোন দল কোন বিকল্প প্রস্তাব রাখে নি। কেবলই বাতিল কর, বাতিল কর বলে গেছে সবাই। অথচ বিলটির উদ্দেশ্য ও কারণ বলা হয়েছে উদ্বাস্তুদের অনুপ্রবেশকারী তকমামুক্তি ও নাগরিকত্বের পথ খোলা।

কি আছে এই বিল অর্থাৎ ক্যাবে বা কা-তে? বলা হয়েছে ২(১)(বি) ধারায় দেশে যারা অনুপ্রবেশকারী হয়ে আছেন তার মধ্যে তিন দেশ থেকে আসা যেসব অমুসলিম অনুপ্রবেশকারী ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসেছিলেন, তারা আর অনুপ্রবেশকারী নয়।

বিলটি ফালতু এই কারণে যে, এই বিলের সুবিধা নিয়ে কোন উদ্বাস্তু নাগরিকত্ব পাবে না। কারণ আইনে জুড়ে দেওয়া তিনটি শর্ত পূরণ কঠিন কাজ এবং আবেদনপত্র পরীক্ষা করে দেড়-দুই কোটি মানুষকে নাগরিকত্ব দেওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার ও অধিকাংশ গরিব-নিরক্ষর উদ্বাস্তুর পক্ষে এই অর্জন কার্যত অসম্ভব।

আইনটি নিরীহ এই জন্য যে, তা কিছু মানুষকে অনুপ্রবেশকারী তকমা থেকে মুক্তি দিয়েছে এবং আইনটি একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকে স্বীকৃত। সেই গন্ডি ২০১৪ সাল, এই সীমা এই আইন টপকাতে অপারগ। এমনকি তার আরেক সীমাবদ্ধতা এই যে, আইনটি ভারতীয় হিন্দু এবং মুসলমান, কারুর কোন ভালো বা মন্দ করার ক্ষমতা রাখে না।

দেশে যখন দীর্ঘকাল ধরে ” ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সবাইকে নাগরিক ঘোষণা করতে হবে “–এই দাবিতে আন্দোলন চলছে তখন নো ক্যাব, নো এন আর সি স্লোগানের আর কোন প্রয়োজন থাকে না। এটা কার্যত হয়ে দাঁড়ায় আন্দোলন বিভক্ত করার পদক্ষেপ। চমক সৃষ্টি করে মানুষকে বিপথে পরিচালিত করা। উদ্বাস্তু আন্দোলন চেপে দেবার কৌশল।

কোন সন্দেহ নেই বর্তমান অবস্থায় বি জে পি-র নেতৃত্বে এন আর সি হলে বহু মানুষের, বিশেষ করে মুসলমান, আদিবাসী এবং দলিত মানুষের বিপদের সম্ভাবনা। অসমের অভিজ্ঞতাও তাই। এই বিপদ আসলে কিছু আইন ও আইনের অপব্যবহারের জন্য।

আইনের এক সমস্যা হলো ভিত্তিবছর নিয়ে। অসমে ভিত্তিবছর ১৯৭১ । এই ভিত্তি বছর ২০১৪ হলে এবং তার সঠিক প্রয়োগ হলে সম্ভবত ১৯ লাখ মানুষের এই সমস্যা হতো না।

অসম বাদে দেশের বাকি রাজ্যে ভিত্তি বছর ১৯৪৮ সাল। এখানেই সমস্যা। মানুষের সমস্যা এন আর সি নয়। মানুষের সমস্যা ভিত্তিবছর। ধরা যাক ২০১৪ সাল ভিত্তিবছর। মনে হয় না তাতে মানুষ আতঙ্কিত হবেন। ২০১৪ সালের আগের কাগজ দেখাতে পারলে যদি এন আর সি-তে নাম ওঠে তাহলে মানুষের বিশেষ সমস্যা হবে না। একই সাথে যদি অঞ্চল প্রধানের সার্টিফিকেট স্থায়ী বাসিন্দাপত্র হিসাবে গৃহীত হয়, সমস্যা কী?

সেজন্য আমরা বলছি এন আর সি প্রক্রিয়া এভাবে সরলীকরণ। আইন ধরে আইনকে মান্যতা দিয়ে।

আর তা নাহলে ১৪এ ধারা বাতিলের আওয়াজ তুলতে হবে। এন আর সি মানব না, বলবো মৃত দেহের উপর দিয়ে এন আর সি হবে ; অথচ সংসদে১৪এ ধারার বিরুদ্ধে কোন কথা বলা হবে না, এটা চালাকি। তৃণমূল, সি পি এম, কংগ্রেস— সবাই যখন একই লাইনে চলছে, তখন এখানে কিন্তু আছে! সে জন্য বাস্তব সম্মত দাবি হবে আমরা যা বলছি—স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সবাইকে নাগরিক ঘোষণা করার দাবি। সবাইকে নাগরিক ঘোষণার অর্থ কার্যত কাগজপত্র দেখানোর জটিলতা আর থাকে না।

নো এনআরসি স্লোগান সরকার যদি মেনে নেয়, তাহলে কি উদ্বাস্তুদের সমস্যার সমাধান হয়? হয় না। কারণ তা হলো স্থিতাবস্থার স্লোগান, এখন যেমন আছে, তাই থাকবে। এই লেখায় আগে উদ্বাস্তুদের কিছু সমস্যার উল্লেখ করা হয়েছে। তা থেকে যাবে— উদ্বাস্তুদের গ্রেফতার, ভোট কেটে দেওয়া, দেশ ছাড়ার হুমকি এসব নিয়ে ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে কাল কাটাতে হবে। আইনের বিরোধিতা নেই, অথচ নো এনআরসি— এর অর্থ ডিলেড এনআরসি বা বিলম্বিত এনআরসি। এটা হয়তো তাই। সেজন্য নো এনআরসিপন্থীদের আন্দোলনের পরেও দেশবাসীর এনআরসি-র হয়রানির বিপদ কিন্তু থেকেই গেল।

আমার মত মানুষ যারা পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে এখানে আসতেন, তারা যশোর বোর্ড, ঢাকা বোর্ড, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে পাস করে কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতেন। কোন সমস্যা ছিল না।

বাংলাদেশ থেকে আমার মত মানুষেরা ভারতে এসে আবেদন করে নাগরিকত্ব অর্জন করতে পারতেন এবং সে দেশের শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র দেখিয়ে চাকরি পেতে পারতেন। ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বরের একটা সরকারি নির্দেশকে অজুহাত করে বাংলাদেশ থেকে আসা মানুষকে হয়রানি করা হত ঠিকই কিন্তু আইন বানিয়ে উদ্বাস্তুদের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয় নি। যারা নিরক্ষর, চাকরি করার মত যোগ্যতা ছিল না, তারা ধীরে ধীরে এই দেশে থিতু হয়েছিলেন। তাদের সন্তানদের অনেকে এখানে পড়াশুনা করে চাকরি করছেন। ভোটার তালিকায় ধীরে ধীরে নাম উঠেছে সাধারণভাবে বা নানা অসাধু উপায়ে। তারা ভেবেছিলেন যে, তারা এদেশের নাগরিক হয়ে গেছেন, এদেশের একজন হয়ে গেছেন।

ইতিমধ্যে নাগরিকত্ব দেবার ক্ষমতা নর্থ ব্লকে কেন্দ্রীভূত করা হলো। তারপর ২০০৩ সালে বি জে পি জমানায় সব দল সর্বসম্মতভাবে সমস্ত উদ্বাস্তুকে অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করে আইন তৈরি করা হলো এবং বলা হলো এই আইনে ঘোষিত অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবে না। তারপর থেকে নানা সমস্যায় আছে উদ্বাস্তুরা, যার কিছু বর্ণনা, উদাহরণ আগে লেখা হয়েছে।।১৬ বছর ধরে কেউ কোন কথা বললেন না।

উদ্বাস্তুদের ভোটার কার্ড হয়, রেশন কার্ড হয়, চাকরিও হয় ; কিন্তু নাগরিক মানা হয় না। ওইসব কাগজপত্র দেখিয়ে পার পায় না তারা। কারণ আইন পাস কাটিয়ে টাকা দিয়ে ও অন্যান্য অসাধু উপায়ে তারা এসব করে থাকে। তাদের প্রতিদিন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। তারা এখন বেআইনি কাজকেই স্বাভাবিক বলে মনে করেন। বাংলাদেশে বড় ক্লাস পাস করে এখানে আবার এসে নিচু ক্লাসে ভর্তি হয়, অন্যায়ের বাবাকে বাবা বানিয়ে ভোটার কার্ডে নাম তুলতে হয়। কোন কোন সময়ে বাবার নামের অন্য মানুষ খুঁজে বেড়াতে হয়। কোনভাবে বাবা মা বেশি বয়সে ভোটার হলেন। ছেলে চাকরির জন্য মনোনীত হলো। পুলিশ তদন্তে এসে বলে— ২১ বছর বয়সে না হয়ে বাবা ৩০/৪০ বছর বয়সে ভোটার হলেন কেন?—উদ্বাস্তুদের এসব জীবন যন্ত্রনা কয়জন বিপ্লবী জানেন? জানেন না, তারা কিতাব পড়ে সব জেনে যান!

বলা হচ্ছে এন আর সি ও ক্যাব/কা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এটা বিরোধীরা শিখেছেন অমিত শাহের কাছে। ওই যে তিনি বললেন— আগে কা পরে এন আর সি। ব্যস! বিরোধীরা তার কাছে শিখে নিলেন। বিরোধীরা অমিত শাহের কোন কথা বিশ্বাস করেন না কিন্তু এটা চোখ বন্ধ করে মেনে নিলেন। কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছনে ছুটে চলেছেন।

অসমে ক্যাব/কা যখন ছিল না, তখন এন আর সি শুরু হয় নি? ডিটেনশন ক্যাম্প হয় নি? ডি ভোটার হয় নি? বেনাগরিক করে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় নি? আর ১৪এ যদি বহাল থাকে কা বাতিল হলেও এন আর সি করতে সমস্যা কি?

অমিত শাহ আগে কা, পরে এন আর সি বললেন মেরুকরণ করার লক্ষ্যে। বোঝাতে চাইলেন— কা দিয়ে হিন্দুদের সুরক্ষা দেওয়া হবে, মুসলমানদের পাঠানো হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। তার এই বক্তব্য হল হিন্দু ভোট এককাট্টা করার জন্য। বিরোধীরা অমিত শাহের বক্তব্য নস্যাৎ করার চেষ্টা না করে কা-কে দানবীয় আইন আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে জয় করার লাইন নিলেন। মুসলমানরা আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নামলেন। পর পর অনেক গুলি ঘটনায় মুসলমানদের উপর চরম অবিচার হয়েছে। সবগুলি ঘটনায় পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অগ্ন্যুৎপাত ঘটাতে শুরু করলো। রাজ্য প্রশাসন দুই দিন চুপ থাকলো। মুসলমানদের ক্ষোভ বিক্ষোভ ভুল পথে ঢুকিয়ে দিয়ে চেপে ধরে সমর্থন আদায়ের পথ নিল। এই সময়ে আলিয়া মিলিয়া মুসলিম বিশ্ব বিদ্যালয়ে বি জে পি-র পুলিশের বর্বরতা সারাদেশের ছাত্র, যুব, বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে রাস্তায় নামিয়ে দিল—যেখানে কা শুধুই অজুহাত। আন্দোলনকারী এইসব শিক্ষিত মানুষের বড় অংশ জানেন কি কা খায় না গায়ে মাখার জিনিস! — বি জে পি বিরোধী এই আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের স্যালুট জানাই। কিন্তু মিথ্যা ও ভুল ইস্যুর উপর গড়ে ওঠা আন্দোলনের দৌড় সীমিত হতে বাধ্য।

প্রকৃতপক্ষে কা বাতিল করার দাবি আসলেই এক দানবীয় পদক্ষেপ। বিশেষ করে কা যদি সুপ্রিমকোর্টে বাতিল হয়ে যায়, তাহলে উদ্বাস্তুদের কফিনে শেষ পেরেকটি পোতা হয়ে যাবে। উদ্বাস্তুরা চিরকালের জন্য অনুপ্রবেশকারী হয়ে যেতে পারেন। এবং এমন এক চক্রান্তের আশংকা নেহাত কষ্ট কল্পনা নয়।

উত্তর-পূর্ব ভারতে আসলেই বি জে পি এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে। এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য তারা সুপ্রিমকোর্টে হেরে শহীদের মর্যাদা লাভের চেষ্টা করতে পারে। আর বি জে পি-র মোকাবিলা করতে এবং উদ্বাস্তুদের জয় করার জন্য বিরোধীদের সংসদে বিকল্প প্রস্তাব দেবার সুযোগ ছিল ; কিন্তু তারা সে পথে যেতে চায় নি, আজও তারা উদ্বাস্তুদের পক্ষে একটি বাক্য উচ্চারণ করেনি। তারা যে উদ্বাস্তুদের খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে, তা বোঝা যায়।
(লেখক: বাঙালি উদ্বাস্তু হিন্দু আন্দোলনের প্রবীণ নেতা)