‘দেখলাম সেই জল ওয়ালা মুখ কালো করে এসে গামছা পেতে দিল আর সেই গামছায় বেঁধে নিল সেই বাসি আর অপমান যুক্ত বিরিয়ানি। ওর কিছু মনে হয়নি , কিন্ত আমার সারা শরীর জ্বলে গিয়েছিল দোকানদারের বাক্যের অভিঘাতে। জল ওয়ালাকে ডেকে বলেছিলাম – তুই আর কুত্তা সমান । তুই না নিলে কুত্তাকে দিয়ে দেবে ! এমন কথা শোনার পরেও ওই বিরিয়ানি তুই নিতে পারলি !’ লিখছেন সাহিত্যিক  মনোরঞ্জন ব্যাপারী-

টিডিএন বাংলা : সে দিনের বই মেলায় তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে আমার কিছু কথা ।
প্রতি দিন প্রতি মুহুর্তে অনুভব করি কী বিচ্ছিরি একটা জীবন আমার । আমি যখনই মুখ খুলি একটা বিতর্ক হয়েই যায়। যদি কিছু লিখি বিতর্ক হয়ে যায় । আজ পর্যন্ত ফেসকুকের কোন পোষ্ট, সভা সেমিনারের আমার কোন বক্তব্য নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়নি এমনটা স্মরনে আসে না ।

এবারের বই মেলার সেমিনারে তেমনই একটা তুমুল বিতর্ক হয়ে গেল, যার রেশ এখনও চলছে । আশা করা যায় , আগামী দিনেও চলবে বলে মনেহয় । এবারের কলকাতা বই মেলায় দলিত সমাজের দুই প্রান্তের দুজন প্রতিনিধি ছিলাম আমরা । চেন্নাই থেকে কাঞ্চা ইলাহিয়া আর বাংলা থেকে আমি । কাঞ্চা সাহেব তার বক্তব্যে বলেছেন [ আমি ইংরাজি জানিনা , আমাকে এমনটা বলা হয়েছিল ] যে প্রত্যেকটা দলিত মানুষের ইংরাজি শেখার উপর জোর দেওয়া উচিৎ । এমন কি উনি এমনও দাবী করেন যে ইস্কুলে প্রাথমিক স্তর থেকেই মাতৃভাষার সঙ্গে ইংরাজি শিক্ষা চালু করা দরকার । তিনি এও বলেন যে তিনি তার প্রথম বই ইংরাজিতে লিখেছিলেন বলেই অতি অল্প সময়ে দেশ এবং বিদেশে ছেয়ে যেতে পেরেছেন । ইংরাজির প্রয়োজনিয়তা গভীর ভাবে বুঝেছিলেন বলেই বি আর আম্বেদকর সাহেব তার সমস্ত রচনা ইংরাজিতে লিখেছেন , ইত্যাদি ।
আমার বক্তব্য ছিল তা থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন বা আলাদা । এমন নয় যে এক দলিত সমাজের নক্ষত্র বলেছেন বলেই তার সঙ্গে আমার সহমত পোষন করতে হবে । তেমন কোন বাধ্য বাধকতাকে আমি স্বীকার করি না । আমার মনে হয়েছিল তিনি সঠিক বলছে না । তাই আমি তার বিরুদ্ধে বলে ছিলাম ।

আমি সব সময় এটা খুব জোরের সঙ্গে বলে থাকি যে ‘ ক্লাশের মধ্যে কাষ্ট আছে , আবার কাষ্টের মধ্যেও ক্লাশ আছে’। আমার জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি দিয়ে যেটা জেনেছি , সেই বি আর আম্বেদকর সাহেবের সময় থেকেই দলিত সমাজের সমস্যা নিয়ে আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা সবাই সমাজের উঁচু তলার লোক । দেখতে গেলে বি আর আম্বেদকর সাহেব ও প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেই এগিয়ে থাকা [ ক্রিমিলেয়ার] শ্রেনীর । যে কারনে তিনি দলিত দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করে গন আন্দোলন গড়ে তোলার চাইতে বিদ্বান শিক্ষিত মানুষের সহযোগিতায় আইন আদালতের লড়াইয়ে অনেক বেশি জোর দিয়েছিলেন । চৌদার পুকুর অভিযান হোক কি পুনাচুক্তি, দেখতে গেলে এর কোনটার দ্বারাই সাধারন- নিম্নস্তরের দলিত মানুষের জীবনের সমস্যার সমাধানের কোন সুযোগ ছিলনা ।

দলিত তথা দরিদ্র মানুষের সমস্যা মোট ছয়টা– খাদ্য বস্ত্র শিক্ষা বাসস্থান চিকিৎসা আর সামাজিক সম্মান । দলিত সমাজের যারা নেতা তাদের যে ভাবেই হোক প্রথম পাচটা সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, বাকি আছে মাত্র একটা , সেটা সম্মান । তারা মাত্র সেটা নিয়েই মঞ্চে মুখ খুলছে, কাগজের পাতায় লিখছে। তারা বলতে চাইছে , আমরা শিক্ষিত বাবু ভদ্র হয়ে গেছি , এবার উচ্চবর্ন সমাজ আমাদেরও তোমরা তোমাদের সমকক্ষ বলে স্বীকার করে নাও আর বিনা সংকোচে আমাদের সঙ্গে ‘রুটি বেটির’ সম্পর্ক পাতিয়ে নাও। এই টুকু পেয়ে গেলেই তাদের ক্ষোভ আক্রোশ শান্ত হয়ে যেত।

কিন্ত সাধারন যে দলিত মানুষ সে সম্মান চায় না , সম্মানের কথা তার মাথায় আসেই না । আমি দেখেছি যে ‘বাবু’ বাবার বয়সী কোন রিকশা চালককে তুই তোকারি করে কথা বলে সেই বাবুই যখন রিকশা চালককে এক দু টাকা ভাড়া বেশি দেয় রিকশা চালক ভক্তিতে গদ গদ হয়ে যায় । এর কারন ওই এক দু টাকায় সে আর খানিকটা চাল বেশি কিনতে পারবে । অনাহার বড় কষ্ট দায়ক, তা থেকে কিছু ত্রান পেতে পারবে ।

আমার মনে পড়ছে অনেকদিন আগের একটা কথা । সেটা ছিল এক দুর্গা পুজার সময় । একজন দলিত সমাজের মানুষ দোকানে দোকানে জল দেয়। তার একটা বাধাধরা খদ্দের আছে যার বিরিয়ানির দোকান । খুব নামী দোকান যে কারনে সে কোন বাসি পচা মাল বিক্রি করে না । সেদিন তার অবিক্রিত কিছু বিরিয়ানি বেচে গিয়েছিল। জল ওয়ালাকে দেখেই সে হেঁকে উঠল-এই রে কালকের চারপ্লেট মত বিরিয়ানি আছে নিয়ে যা-। বিনীত স্বরে জলওয়ালা বলে ,দাদা ওই সামনের দোকানে জলটা দিয়ে আসি- তারপর নেব। বলে দোকানদার- অনেকক্ষন তোর জন্য দেরী করেছি , বাসন গুলো মাজবে । নিবি তো নিয়ে যা , না হলে কুকুরকে দিয়ে দেব ।
দেখলাম সেই জল ওয়ালা মুখ কালো করে এসে গামছা পেতে দিল আর সেই গামছায় বেঁধে নিল সেই বাসি আর অপমান যুক্ত বিরিয়ানি। ওর কিছু মনে হয়নি , কিন্ত আমার সারা শরীর জ্বলে গিয়েছিল দোকানদারের বাক্যের অভিঘাতে। জল ওয়ালাকে ডেকে বলেছিলাম – তুই আর কুত্তা সমান । তুই না নিলে কুত্তাকে দিয়ে দেবে ! এমন কথা শোনার পরেও ওই বিরিয়ানি তুই নিতে পারলি !

কাতর গলায় বলে সে- দাদা রে , আমারে যে অপমান কচ্ছে সে কি আর আমি বুঝিনি ! কিন্ত বুঝে কি করবো বল দিনি ? পুজো পাজার দিন- এট্টু ভাল মন্দ বাচ্চা গুলোরে খেতি দিতি পারি নাই। আজকে বিরিয়ানি গুলো নিয়ে গেলি ওঁরা কত্ত খুশি হবে । সেই ভেবে সব অপমান সহ্য করে নিলুম ।
এই হচ্ছে দলিত দরিদ্র সমাজের মানুষ, অসহায় অক্ষম অপমানিত । আমি এই শ্রেনির মধ্য থেকে উঠে এসেছি এই মানুষের কথা বলতে । মান অপমান নিয়ে যাদের ভাবার সময় নেই মাত্র অনাহার থেকে মুক্তির চিন্তায় কাতর । এই যে মানুষ, আমার মানুষ এরা তাদের সন্তান সন্ততিকে পেট ভরে খেতেই দিতে পারেনা , তাহলে ইস্কুলে পাঠাবে কি করে ? পাঠায় চায়ের দোকানে গেলাস ধুতে , পাঠায় কোন বাবুর বাসায় চাকর খাটতে। আর যদি বা ইস্কুলে পাঠাতে পারে কেউ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরুতে পারে না । চার পাচ ক্লাশ পড়বার পরই ছেদ পড়ে যায় লেখা পড়ায়। তাহলে এরা ইংরাজি শিখবে কি করে ? যদি প্রাথমিক থেকেই একটা বিদেশী ভাষা শেখার চাপ বাচ্চার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সে না পারবে ওই ভাষা রপ্ত করতে না পারবে তার মাতৃ ভাষাটাও ঠিক মত শিখে উঠতে । এর চাইতে সে যদি ভাল করে মাতৃভাষাটা শিখে নিতে পারে জীবনের অনেক কাজে আসতে পারে ।

তাই আমি বিরোধিতা করেছি কাঞ্চা ইলাহিয়ার। বলেছি- সে যাদের ক্ষমতা আছে তারা ইংরাজি কেন , চাইলে হিব্রু পলি ভাষাও শিখতে পারে । কিন্ত সর্ব সাধারনের জন্য ওই ভাষা জোর করে চাপিয়ে দেবার দরকার নেই ।
ইংরাজী ভাষা বাবু শ্রেনীর ভাষা, ইংরাজি ভাষা ক্ষমতার ভাষা। আমি তো নানা প্রদেশে গিয়ে দেখি যারা গড় গড় করে ইংরাজি বলতে লিখতে পারে তাদের মর্যাদা অনেক বেশি । জানি সে ভাষা রপ্ত হলে দলিত বাবুদের মর্যাদা আর ক্ষমতায়ন বৃত্ত অনেক বড় হয়ে যাবে । কিন্ত আমি সে ভাষা নিয়ে লড়াই করবার কথা ভাবতে তখন পারবো যখন আমি যে শ্রেনীর মানুষ যাদের কথা বলার জন্য আমার উঠে দাঁড়ানো তাদের আগের পাচটা সমস্যা থেকে মুক্ত করে দিতে পারবো । এখন আমাদের সবার আগে সেই লড়াই লড়তে হবে । খাদ্য চাই বস্ত্র চাই , বাকি বাদ তার পরে।
(লেখক সাহিত্যিক ও দলিত নেতা)