টিডিএন বাংলা ডেস্ক: স্বাধীনতার বহু যুগ আগে থেকেই বিভিন্ন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক ভারতের একটা অসাম্প্রদায়িক কাঠামো গঠন হয়ে এসেছে এবং স্বাধীনতার পরে দু-একটা ঘটনা বাদ দিলে সেটা নিরবচ্ছিন্নভাবেই চলেছে। স্বাধীনতার পরে সুদীর্ঘ সময় জুড়ে ভারতের এই ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বিগত তিন-চার বছরে। যে সব হিন্দু মৌলবাদী শক্তি আজ এক জায়গায় সংগঠিত হয়ে দেশের শাসন ক্ষমতা উপভোগ করছে তাদের অপ্রকাশ্য আসল দাবি হলো – ভারতকে সরকারিভাবে ‘হিন্দু’ রাষ্ট্রের তকমা দিতে হবে। এই অপ্রকাশ্য আসল দাবির সপক্ষে যাতে জনমতের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টাই এরা নানা ছলেবলে কৌশলে করে চলেছে। কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তির এই প্রস্তাব মানতে গেলে ভারতের সংবিধানের মূল স্তম্ভটিকেই একদিন ভেঙে ফেলতে হয় – যাতে একটি বহুমাত্রিক, সহিষ্ণু, ধর্মনিরপেক্ষ দেশের কথা বলা আছে। শুধুমাত্র এই বৈশিষ্ট্যের ওপর দাঁড়িয়েই স্বাধীনতাপূর্ব ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিচালিত হয়ে এসেছে এবং দেশ স্বাধীন হয়েছে।

আধুনিক ভারতের গঠনে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটির অবদান অপরিসীম। যখন ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত ভাগ হলো, তখন পাকিস্তান নিজেদের ‘ইসলামিক’ দেশ ঘোষণা করল কিন্তু ভারত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ দেশ হলো। আইনগতভাবে এই পার্থক্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল ব্যাপ্তির। দেশ পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে এটির প্রয়োগ গুরুত্বের দাবি রাখে। যেমন, উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেশের শাসক প্রধানকে মুসলিমই হতে হবে, কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে সেরকম কোনও বিশেষ ধর্মের ব্যক্তির দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু এই গুরুত্ব শুধুমাত্র দেশপ্রধান নির্বাচনের ক্ষেত্রেই আটকে রাখলে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি আবার আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়বে। কারণ ভারতের মতো বিশাল দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে হলো বিভিন্ন ভাষাভাষী ও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলনস্থল। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতা হলো একটা বৃহৎ চিন্তার, চেতনার স্তর। কোনও ক্ষুদ্র চিন্তার স্তরে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োগ কখনোই আটকে থাকতে পারে না।

ভারতের প্রতি পাঁচজন পিছু চারজন হিন্দু – একথা যেমন সত্যি, আবার তেমন এটাও সত্যি মুসলিম জনসংখ্যার নিরিখে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশ ভারত। ফলে ভারতকে শুধুমাত্র হিন্দুর দেশ হিসাবে দেখতে চাওয়াটা নেহাতই মূর্খামি যা তথ্য পরিসংখ্যানেরও পরিপন্থী। ভারতের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতেও হিন্দু মুসলিম একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আবার ধর্মীয় বহুত্ববাদ শুধুমাত্র হিন্দু মুসলিমেও আটকে নেই। এদেশে বিশাল সংখ্যক অন্য ধর্মের মানুষ যেমন শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ, পারসিরা আছেন। আবার অন্যদিকে যারা ‘নাস্তিক’ মানুষ, তারাও আছেন। যদিও তাদের গণনা এদেশে হয় না। ভারতের সংবিধানের প্রণেতারা এটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন যে রাষ্ট্র যেন কোনও বিশেষ জাতি বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে। অতীত ভারতের বহুত্ববাদের ইতিহাসকে স্মরণে রেখেই তারা বুঝেছিলেন যে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি ছাড়া এদেশকে এবং এদেশের সংবিধানকে আর কোনও শব্দে আখ্যায়িত ও বিশেষিত করা যায় না।

আবার ভারতের ধর্মীয় বহুত্ববাদ বলতে কিন্তু শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মের সাথে অন্যান্য ধর্মকেই বোঝায় না। এখানে হিন্দু ধর্মের ভেতরেও অনেক পথ ও মত রয়েছে। হিন্দু ধর্ম নিজেই পুরোপুরিভাবে বহুধা বিভক্ত। এই বিভক্তি শুধু বর্ণবাদ বা জাতপাতে সীমাবদ্ধ নয়, হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন আলাদা আলাদা ধর্মীয় ভাবধারার প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যাদের চিন্তা ভাবনা একে অপরের সাথে মেলে না। তবে বর্তমানের ‘এক হিন্দুত্ব’ বা হিন্দু ধর্মকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার প্রচারটা সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক আবিষ্কার। হিন্দু শব্দটা আসলে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মকে বোঝানোর চেয়ে একটা অঞ্চলকে বিশেষিত করত যেটা প্রাচীনকালে সিন্ধু নদের তীরবর্তী এলাকাকেই বোঝাত। এই রেশ ধরে মধ্যযুগ পর্যন্ত একটা সময় ভারতীয় মুসলিমদের ‘হিন্দাভি মুসলিম’ বলা হতো। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনের সূচনাকালেও বহু নথিতে ভারতীয় মুসলিমদের ‘হিন্দু মুসলিম’ এবং খ্রিস্টানদের ‘হিন্দু খ্রিস্টান’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে উল্লেখ করা হতো কারণ অঞ্চলের বিশেষণ হিসেবে । দুঃখের বিষয় , আসল ইতিহাসের জায়গায় এখন আর এস এস-এর নিজস্ব সৃষ্ট ইতিহাস প্রাধান্য পাচ্ছে সরকারি আনুকুল্যে।

আজ ৭২ বছর পেরিয়ে যাওয়া স্বাধীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা তিনটে আলাদা আলাদা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এক, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। দুই, উগ্র জাতীয়তাবাদ । তিন, কাল্পনিক ও পৌরাণিক কাহিনির ইচ্ছাকৃত প্রয়োগ যা যুক্তিবাদের বিরোধী।

ভারতে বর্তমানের উগ্র হিন্দুত্ববাদী শাসকদলের কর্মসূচির মধ্যে ফ্যাসিবাদের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন নির্দিষ্ট কোনও ধর্মের বিরুদ্ধে মানুষজনকে সংগঠিত ভাবে খেপিয়ে তোলা। সংবিধানকে কোনোরূপ মান্যতা না দিয়ে শাখা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে ধর্মীয় সশস্ত্রকরণ ও হিংসাত্মক কাজকর্ম। সমাজের সর্বস্তরে ইচ্ছাকৃত গুজব ছড়িয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলা। এর সাথে যুক্ত রয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার। স্বাধীনতার পর থেকে বরাবরই ভারতীয় ভোটাররা মূলত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিই তাদের দায়বদ্ধতা দেখিয়েছেন, হিন্দু মহাসভার মতো দল থাকা সত্ত্বেও। পরবর্তীকালে জনসঙ্ঘ ঘুরে তৈরি হওয়া বর্তমানের শাসক বি জে পি কিন্তু তার দুই পূর্বসূরির চেয়ে এই উগ্র ভাবধারা প্রচারের কাজে অনেক বেশিমাত্রায় সফল। উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের একটা মুসলিম বিরোধী প্রচার সবসময়েই থাকে সেটা হলো ভারতে থাকা মুসলিমরা ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের প্রতিই নাকি বেশি বিশ্বস্ত। যদিও এই হাস্যকর প্রচারের কোনও তথ্যপ্রমাণ কোনোদিনই নেই। উলটোদিকে দেশভাগের সময়েই এক বিশাল সংখ্যক মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ পাকিস্তানের মায়া ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় ভারতে থেকে যান। কারণ তারা তাদের জন্মভূমিতেই থাকতে পছন্দ করেছেন। ভারতবর্ষে সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে কূটনীতিক, সরকারি কেরানি থেকে শুরু করে পদস্থ শীর্ষকর্তা সব বিভাগেই মুসলিমরা তাদের দেশভক্তির ছাপ রেখেছেন যেমন হিন্দু, শিখ, পারসি ইত্যাদি অন্যান্য ধর্মের মানুষ রাখেন।

উগ্র হিন্দু মৌলবাদী এই গ্রুপগুলো বর্তমানে ভীষণরকম ব্যস্ত দেশের ইতিহাসকে তাদের নিজেদের মতো ব্যাখ্যা দিয়ে হাজির করার কাজে। স্কুলের ইতিহাস বইগুলোকে পরিমার্জিত করে অতীতের মুসলিমদের অবদানকে ছেঁটে ফেলতে বা তাদের খাটো করে দেখাতে তারা উদ্যোগী। এখন যদি কিছু জায়গায় হিন্দু মধ্যবিত্ত সমাজ হঠাৎ করে ইতিহাসের মুসলিম সম্রাটদের অত্যাচারের কথা বারবার বলতে থাকেন তার মানে এই নয় যে অতীত ইতিহাস নতুন করে আবিষ্কার হলো। এটার প্রধান কারণ হলো এইসব হিন্দু মৌলবাদীরা খুব সূক্ষ্মভাবে তথ্যের সাথে কাল্পনিক ঘটনা মিশিয়ে সেগুলো প্রচার করছে। এটা শুধুমাত্র অদ্ভুতই নয়, দেশের ইতিহাসের প্রতি, ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতাও। দুশো বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ রেল স্টেশনের নাম পালটে দেওয়া থেকে শুরু করে শহর গ্রামের নতুন নামকরণ এইসব কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতে বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার প্রয়োজনে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি। সাম্প্রদায়িকতা রোধে সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষকেই দৃঢ় সংকল্পে এগিয়ে আসতে হবে। সেই দেখে সরকারও পরবর্তীতে তৎপর হতে বাধ্য। বর্বর সর্বনাশা হিংসার ঘটনা তখনই ঘটে যখন সেটা সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলা হয়। সাময়িকভাবে মনে হতে পারে যে এটা আইন ও প্রশাসনিক সমস্যা ও দুর্বলতা কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে এটাই মারাত্মক আকার ধারণ করে। কারণ লড়াইটা সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিরুদ্ধে, তাদের সেই ভুয়ো হিংস্র প্রতিক্রিয়াশীল তত্ত্বের বিরুদ্ধে। এই তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াইকে জাগ্রত করতে গেলে ভারতের সেই অতীত ঐতিহ্যকে পুনর্জীবিত করতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে, চর্চা করতে হবে বহুত্ববাদকে, ভারতের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রকৃত উজ্জ্বল ইতিহাসকে।

ভারতে এখন যে উগ্র সাম্প্রদায়িক জাতিবাদের উত্থানের দিন চলছে তার প্রভাব একটা নির্দিষ্ট গণ্ডি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। প্রথমত,এখনও ভারতের হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ উগ্র মৌলবাদের বিরুদ্ধেই কথা বলে। দ্বিতীয়ত, ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক বৈচিত্রের সহিষ্ণুতার কাছেও এই উগ্র মৌলবাদীদের মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, ভারতের যুক্তিবাদী ঐতিহ্যর একান্ত নিজস্ব একটি গতিধারা আছে, যার কাছে হিংস্র মতবাদ বেশিদিন টেকে না। চতুর্থত, ভারতের জনগণের যারা সংখ্যাগুরু সেই নিম্নবর্ণের মানুষ তাদের নিত্য অভাব, ক্ষোভ, বঞ্চনায় এক অন্য ধরনের রাজনৈতিক চাহিদা নিয়ে থাকে, যেটা এই উগ্র হিন্দু মৌলবাদীদের চাহিদার সাথে কোনোদিনই মিলবে না।

(বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্যের লেখাটি গণশক্তি থেকে নেওয়া)