মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: এই ভারত সম্প্রীতির ভারত, এই ভারত সংহতির ভারত, এই ভরাত মিলনের ভারত , এই ভারত সকলকে আপন করে নেওয়ার ভারত, এই দেশে সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নেই, এদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদের ঠাঁই নেই, ধর্মের নামে মানুষ খুন মানছিনা মানবোনা ইত্যাদি স্লোগান শোনা যাচ্ছে দেশ জুড়ে বেশ কিছুদিন থেকে। যখন আখলাক খুন হয়, যখন পেহলুখানকে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, রোহিত ভেমুলা,চুনি কোটাল অঙ্কর বারিবাদ, পায়েল তাকবীর দের মত প্রতিভাধর গবেষক দের উপর দিনের পর দিন যখন মানসিক নির্যাতন চালিয়ে ধীরে ধীরে আত্ম হত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য করা হয়, যখন তাবরেজ আনসারী আর সানাউল সেখদের মত তরতাজা যুবকদের প্রহার করতে করতে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করা হয়, তারপরও যখন তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয় তখন গর্জে ওঠে দেশ, গর্জে ওঠে মানবতার একটি অংশ। দুঃখিত, লিখতে পারলামনা “গর্জে ওঠে সারা দেশ, গোটা দেশ বাসী”।এটা দিনের আলোর মত স্পষ্ট যে ভারত বর্ষে টার্গেট করা হয়েছে দলিত, আদিবাসী ও মুসলিম সমাজকে। হিংসা ,ঘৃণা, আর উগ্রতার এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে যে দলিত আদিবাসী ও মুসলিমদের প্রতি এমন নিষ্ঠুর, নির্মম আচরণ করা হচ্ছে যে আচরণ হিংস্র বন্য পশুর সঙ্গেও করা যায়না।

ঝাড়খণ্ডের তাবরেজ আনসারিকে তার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এসেছিল তার বন্ধুরা। বন্ধুত্বের বিশ্বাসের কারণে তাদের প্রতি বিন্দু মাত্র সন্দেহ হয় নি তাবরেজের।নিজের বাইকের চাবি তাবরেজের হাতে দিয়ে বন্ধুরা আড়াল হয়ে যায়। পরিকল্পিত ভাবে উগ্র জনতা এসে ঘিরে ধরে তাবরেজকে।শুরু হয় গণপ্রহার।ভীড় যত বাড়তে থাকে ততই একজন বাইক চোরের গণপ্রহারের দৃশ্য উপভোগ করতে থাকে আম জনতা।

না তাবরেজ আনসারীর সঙ্গে কোন ত্রিকোণ প্রেমের লড়াই ছিলনা তার বন্ধুদের।না ছিল কোন ব্যাবসা বা বৈষয়িক সম্পর্কের রেষারেষি। তাহলে বন্ধু হটাৎ এরকম নির্মম নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো কেনো?

দ্বিতীয়ত, যে ভীড় একজন বাইক চোরকে নির্মমভাবে প্রহৃত হতে দেখছে সেই ভীড়ের মনে কেনো এ প্রশ্ন জাগলো না যে একজন বাইক চোরকে “জয় শ্রী রাম”বলতে এভাবে বাধ্য করা হচ্ছে কেন?বাইক চুরির সঙ্গে এই স্লোগানের কী সম্পর্ক?

পুলিশ প্রশাসন এর ভূমিকা তো আরো ন্যাক্কারজনক।তারা একটা ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে হাতকড়া পরিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল থানায়।অবশেষে সারাদিন পর যখন তার বাড়ীর লোকজন, তাঁর স্ত্রী ও শাশুড়ি থানার সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হল তখন তাদেরকেও হুমকী দেওয়া হল। তাবরেজের নিকট আত্মীয়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, তাদেরকে বলা হয় তোমরা এখুনি কেটে পড় নইলে তোমাদের সঙ্গেও অনুরূপ আচরণ করা হবে।ভয় পেয়ে সরে পড়ে তারাও। তার স্ত্রী ও শাশুড়ী হাল না ছাড়ায় পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
সেনাউলের সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করা হয়। কিন্তু বাংলার কুলীন রাজনীতি, সফিস্টিকেট মিডিয়া, আর কৌশলী বুদ্ধিজীবীদের দৌলতে তা অনেকটা ধামা চাপা দেয়া সম্ভব হয়েছে।অর্থাৎ ঝাড়খন্ড তাবরেজকে চোর প্রমান করতে না পারলেও কিন্তু সেনাউলের ক্ষেত্রে বাংলা অনেকটা সফল।

অবশ্য এই ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ করতে বসা বক্ষমান আলোচনার উদ্যেশ্য নয়।আমি শুধু সেই হৃদয়বান ,মহৎ, উদার ভারতবাসির নিকট একটা প্রশ্ন রাখতে চাই বিনয়ের সঙ্গে।আমি জানতে চাই ভারত বর্ষের আজন্ম লালিত যে সহনশীলতার শিক্ষা তা সবই কী অর্থহীন।বিবেকানন্দের বাণী “জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর” একথা কী ভূল না যাদের কথা এতক্ষন ধরে তুলে ধরলাম তারা জীবের পর্যায়েই পড়েনা? নাকী এসব লাইন শুধু বইয়ের পৃষ্টা সুশোভিত করা আর সভামঞ্চে আলোকিত করার জন্য? পরমত সহিষ্ণুতা যদি শ্রীরাম কৃষ্ণের ধর্ম হয় তাহলে সেই শ্রীরাম ভক্তরা আজ কোথায়? অহিংসা পরম ধর্ম কাদের? যদি তা বুদ্ধের বাণী হয় তাহলে দেশ ব্যাপী দুনিয়া ব্যাপী এই হিংসার বিরুদ্ধে গর্জে উঠবে কে?

যারা বলেন ভারতবর্ষ চিরকাল সম্প্রীতি আর ভালোবাসার দেশ ছিল আমি হয়তো তাদের সাথে একশত ভাগ একমত হতে পারবোনা।কেননা এদেশের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেগে আছে হিংসা বিদ্বেষের লাল রক্ত।কিন্তু এদেশে চিরকাল ছিল হিংসার পাশাপাশি অহিংসার দেওয়াল।হিংসা এখানে শেষ কথা বলেনা।শেষ কথা বলে প্রেম প্রীতি ভালো বাসা।

এদেশে অশোক অস্ত্র ত্যাগ করে রাজ ঋষি তে পরিণত হন।ইংরেজের গুলির মুকাবিলায় এখানে গান্ধীজি অহিংসা সত্যাগ্রহ পালন করেন, এখানে বিবেকানন্দ ডাক দেন মুচি, মেথর, চান্দাল, আমার রক্ত আমার ভাই।সেই ভ্রাত্বিত্ব বিজয় লাভ করে হেরে যায় হিংসা ঘৃণা বিদ্বেষ।
প্রশ্ন আমার এখানে আমরা সেই ভারত কে বিদায় দিতে বসেছি? আমরা কী এখন নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শ্রীরাম কৃষ্ণদের ছেড়ে, গডসেদের ভক্ত হয়ে গেলাম? অহিংসার পূজারীদের কাছে একথা গুলি আমার জানতে ইচ্ছে করে।