জানে আলম, টিডিএন বাংলা: তিন বছর ধরে ডিএ নিয়ে সরকার ও তার কর্মচারীর মধ্যে তর্ক-বির্তক অব্যহত। নাছোড় দুই পক্ষই। প্রসঙ্গত, বকেয়া ডিএ নিয়ে ২০১৬-র ২১ নভেম্বর অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (স্যাটে) মামলা হয়। এ মামলা করেছিল রাজ্য সরকারি কর্মীদের দু’টি সংগঠন (কনফেডারেশন অব স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ এবং ফোরাম ইউনিট)।

সংগঠনের বক্তব্য হল, পঞ্চম বেতন কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্য ২০০৮ সালের ১ এপ্রিল ডিএ দেওয়া শুরু করে। কথা ছিল ২০১০ সে সমস্ত বকেয়া মেটানো হবে। কিন্ত তা না করে ২০১৩ তে ডিএ বন্ধ করে দেয় এবং কখন ৬% কখনও ১০% ডিএ দেওয়ার ফলে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি রাজ্য কর্মীরা ৮৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা পেতেন। তখন কেন্দ্র তাদের কর্মচারীদের ১২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়েছিল। কেন্দ্র-রাজ্য মহার্ঘ্য ভাতার বৈষম্য তৈরী হয়। উপরন্তু কেন্দ্র সপ্তম বেতন কমিশন লাগু করে। ঐ কমিশনের সুপারিশ অসম, বিহার, ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রেদেশ, গুজরাট, ছত্রিশগড়, হরিয়ানা সহ বহু রাজ্য কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চম বেতন কমিশনের বেঁধে দেওয়া ডিএ মেটাচ্ছে না। ডিএ বৈষম্য নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি অন্য রাজ্যে কর্মরত রাজ্য সরকারি কর্মীরা কেন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের সমহারে ডিএ পাবেন অথচ এরাজ্যে কর্মরতরা বঞ্চিত হবেন? বকেয়া ডিএ পাওয়ার জন্য কর্মী সংগঠনের তরফ থেকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তদের কাছে লিখিত আবেদন জানান। সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।

সংগঠন দুটি অবাধ্য স্যাটে মামলা দায়ের করেন। ২০১৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি স্যাটের বিচার পতি অমিত তালুকদারের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়- ডিএ দয়ার দান। ডিএ দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে সরকারের উপর। সেই রায় নিয়ে বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়। আদালতের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ মার্চে হাইকোর্টে মামলা করে একাধিক কর্মী সংগঠন। ১৩ জুলাই প্রবীণ আইনজীবী সর্দার আমজাদ আলী তার বক্তব্যে জানান, ডিএ দাক্ষিন্য নয়- এটা সরকারি কর্মীদের অধিকার। পরে ২৮ আগস্ট সরকার হাই কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানয় সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ চাওয়া কোনও বৈধ অধিকার নেই। ডিএ কোনও দয়ার দান নয়। মহার্ঘভাতার অধিকার আইনি অধিকার। রোপা আইন অনুযায়ী একজন রাজ্য সরকারি কর্মচারী ডিএ পেয়ে থাকেন। ডিএ মামলায় রায় ঘোষণা করে সাফ জানাল কলকাতা হাইকোর্ট।

এই ডিএ আসলে কী ? এর পুরো কথা Dearness Allowance। ডিএ মানে মহার্ঘ ভাতা।
মহার্ঘ ভাতা হল সরকারি কর্মচারী,পাবলিক সেক্টর কর্মচারী (পিএসই) এবং পেনশনকারীদের দেওয়া জীবদ্দশায় সমন্বয় ভাতা। জনগনের মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কমানোর জন্য ডিএ ভারতীয় নাগরিকের মৌলিক বেতন শতাংশ হিসাবে গণনা করা হয়।

Dearness Allowance চালু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এটি এক সময় “প্রিয় খাদ্য ভাতা” নামে পরিচিত ছিল। প্রাথমিকভাবে ডিএ কে মজুরি পুনর্বিবেচনার জন্য কর্মচারীদের দাবির প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল, তবে পরে এটি কনজিউমার প্রাইস ইন্ডেক্সের সাথে যুক্ত ছিল। নিয়ম অনুযায়ী সর্বভারতীয় দ্রব্যমূল্য সূচকের উপর ভিত্তি করেই মহার্ঘভাতা নির্ধারণ করার কথা জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গেই বাড়বে ডিএ।

মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কর্মচারীর অবস্থান অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, মর্যাদা ভাতা অনুযায়ী গণনা করা হয়। এভাবে নগর, আধা-শহুরে বা গ্রামীণ খাতে তাদের উপস্থিতির ভিত্তিতে ডিএ কর্মী থেকে কর্মচারী পরিবর্তিত হয়। উল্লেখ্য, অতীতে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীদের কাছে ডিএ পরিশোধ করার বিষয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বাধীনতার আগে থেকে সরকারি কর্মীরা ডিএ পেয়ে আসছেন৷ ফলে এখন তা না দেওয়াটা অন্যায়-আদালতের বক্তব্য।

বহু প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালে পুজোর আগেই ডিএ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ১৫ শতাংশ হারে ডিএ বৃদ্ধির বিজ্ঞপ্তি জারি করা হল। তবে তাতেই মিটল না ফারাক। ২০১৯ জানুয়ারি তে বাকী মেটানো কথা ছিল। ফের ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ২৫% ডিএ ঘোষণা করা হয়। যা মূলত ১০% অন্তবর্তীকালীন ভাতা (IR) তুলে দেওয়া হয়। এবং তার পরিবর্তে ৭% ধরে তা ১৮% নতুন ভাতার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। সরকার মতে এই ২৫% ভাতা বৃদ্ধি ফলে কেন্দ্র থেকে ফারাক ৪৮% নেমে ২৩% দাঁড়াল।

এই ভাতা ঘোষণায় কর্মী সংগঠন ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানায়, খুব বড় ফাঁকি হচ্ছে। কেন্দ্রের সাপেক্ষে এখনো ৪১% ডিএ বকেয়া থাকবে । বকেয়া ডিএ বেতন কমিশন নিয়ে আন্দোলন রত অবস্থায় রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয়শঙ্কর সিনহা বলেন, ‘আজ আমরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় তিনশো অফিসে ৪১ শতাংশ হারে ডিএ প্রদান ও দ্রুত পে কমিশনের সুপারিশ প্রকাশ করার দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছি। মহার্ঘ ভাতা নিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের আরও ধৈর্য ধরতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আরো বলেন, মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। রাজ্যবাসীর জন্য খাদ্যসাথী, কন্যাশ্রী, সবুজসাথী, সমব্যথীর মতো প্রকল্পগুলো চালু করেছে সরকার।”

রাজ্য সরকারি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া ডিএ ও ষষ্ঠ বেতন কমিশন চালু নিয়ে দীর্ঘদিনের তিতিবিরক্ত। স্যাটে মামলা ও তার রায়কে রায়কে চ্যালেঞ্জিং কলকাতা হাইকোর্টে মামলা। পাশাপাশি রাজ্য সরকারি কর্মী-শিক্ষক-পুলিশকর্মীদের নানান দাবি দাওয়া ক্ষোভ ছিল। তাঁরা বেশিরভাগই ভোট দেন পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে। কাজেই পোস্টাল ব্যালটে বিজেপির ঝুলি ভরার অর্থ টিএমসি-র বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বড় অংশের অনাস্থা। পে কমিশন চালু ও কেন্দ্র হারে বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিলে হয়তো সরকারী কর্মীদের ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত হবে বলে আশা করছেন কর্মীরাই।