ড: নুরুল ইসলাম, টিডিএন বাংলা, কলকাতা: পশ্চিমবাংলায় গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট তৈরী হয়েছে সময় ও পরিস্থিতির দাবী মেনে। ২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ ও রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলার মুসলমানরা যেন শীতঘুম থেকে কিছুটা জেগে উঠল। এতদিন বামেদের প্রচারিত ” বাংলায় বামেরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে দেয়না এবং মুসলমানরা একমাত্র বামশাসনে নিরাপদ ” – এরকম একধরনের আফিমের নেশায় বুঁদ হয়েছিল। ফলে তারা দেখতে সক্ষম হয়নি যে, তলে তলে দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে রাজনৈতিক সংঘর্ষের নামে সুকৌশলে হাজার হাজার মুসলমানকে খুন করা হয়েছে। শিক্ষা ও চাকরীতে চরম বঞ্চনা। চাকরীতে তাদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় তলানীতে ঠেকেছে। সাচার কমিটি তাদের দূর্দশাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। ফলে বাংলার মুসলমানরা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। হল নন্দীগ্রাম আন্দোলন । মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যাকে মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বাধীকার আন্দোলন বলে গ্রহন করলেন বাংলার বেশীরভাগ মুসলমান। মমতা ব্যানার্জী পরে সেই আন্দোলনে ভাগ বসালেন। দীর্ঘদিনের মেইন স্ট্রীম পলিটিক্সের নেতৃত্ব হওয়ার কারনে মমতা সেই আন্দোলন হাইজ্যাক করলেন। বঞ্চিত হলেন সিদ্দিকুল্লাহরা। যদিও ততদিনে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান মমতার পাশে । চৌত্রিশ বছরের জগদ্দল বাম শাসনকে পরাস্ত করে বাংলায় পরিবর্তনের সরকার এল মমতার নেতৃত্বে।

মুসলমানরা ভাবল এবার বোধহয় সুদিন আসবে। ক্ষমতায় আসার এক থেকে দেড় বছরের মাথায় মমতা ঘোষণা করলেন, বাংলায় মুসলমানদের জন্য ৯৯ শতাংশ কাজ করে দিয়েছেন। বাস্তবে দেখা গেল, কাজের কাজ কিছু হয়নি, তিনি মুষ্টিমেয় কিছু ইমামের জন্য মাসিক ২০০০ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছেন, তাও আবার মুসলমানদের ওয়কাফের টাকায়।

কিছু সাধারণ সকলের জন্য প্রকল্প, যেমন, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, গীতাঞ্জলী প্রকল্পকে মুসলমানদের জন্য বিশেষ প্রকল্প বলে চালানোর চেষ্টা হল।

স্বাধীনতার ৭২ বছর পর ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বৃহৎ জেলা মুর্শিদাবাদে কোন বিশ্ববিদ্যালয় হল না। সংখ্যালঘুরা সেখানে শিক্ষা দীক্ষায় , জীবন জীবিকার নিরীখে, অনুন্নয়নে আগে যে তিমিরে ছিল মমতার আমলেও সেই তিমিরে রয়ে গেল ।

সারা রাজ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ। মাদ্রাসাগুলোর বাম আমলের ‘ অনিলায়ন’ ফিরে এল ‘ মমতায়ন’ হয়ে। ওবিসি সংরক্ষণ হল, কিন্তু তার বাস্তবায়ন হল কিঞ্চিৎ।

অন্যদিকে সংখ্যালঘু তোষনের প্রচারের প্রভাবে প্রমাদ গুনল সাম্প্রদায়িক শক্তি। রাজ্যে আর এস এসের শাখার সংখ্যা তড়তড় করে বাড়তে লাগল শাসকদলের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে। অনেকগুলো ‘একল ‘ স্কুল অনুমোদন পেল। বাংলায় শিক্ষার গৈরীকিকরণের পথ প্রশস্ত হল। সাম্প্রদায়িক শক্তির হাতে নিহত হল ইমামের ছেলে। এ ধরণের ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও সদর্থক ভূমিকা তেমন পরিলক্ষিত হল না। বরং , বিজেপি আর এস এসের চেয়ে খাঁটি হিন্দু প্রমানের জন্য শাসক দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেল।

ইতিমধ্যে মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী মমতার মন্ত্রীসভার মন্ত্রী। ফলে মুসলমানরা বুঝলেন, তাদের রাজনৈতিক স্বাধীকার অর্জন সিদ্দিকুল্লাহর নেতৃত্বে আর সম্ভব নয় ।

এরকম এক পরিস্থিতিতে বাংলার বেশীরভাগ সংখ্যালঘু রাজনৈতিক , অরাজনৈতিক নেতৃত্ব ,বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হয়ে গঠন করলেন ” গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট” । ওয়েলফেয়ার পার্টি অফ ইন্ডিয়া, বহুজন মুক্তি পার্টি,
ভারতীয় জাগরণ মঞ্চ, এস ডি পি আই, ভারতীয় ন্যায়বিচার পার্টি, অরাজনৈতিক বৃহত্তর সংগঠন সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন সহ প্রায় সকলে এই জোটের অন্তর্ভুক্ত হলেন। লক্ষ্য, ” দলিত ও সংখ্যালঘুদের নিজস্ব নেতৃত্বে রাজনৈতিক স্বাধীকার অর্জন “। কারন কংগ্রেস, সিপিআইএম ও বামেরা এবং তৃণমূল কংগ্রেস তাদের বহু আকাঙ্খিত সেই রাজনৈতিক স্বাধীকার থেকে বঞ্চিত করেছে। সেইসব দলে থাকা মুসলমান নেতারা দলের নির্দেশ ছাড়া সংখ্যালঘুদের পক্ষে একটিও কথা বলতে অক্ষম। তাই এটি বিকল্প ভাবনা।

পাশাপাশি , দীর্ঘদিন অধিকারবঞ্চিত আম্বেদকরবাদী, এস সি এস টিদের নেতৃত্বাধীন কিছু দল এই জোটে যোগ দিলেন। বহুজন মুক্তি পার্টির মতো সর্বভারতীয় দল পরে এই জোটে যোগ দিলেন।

এরকম এক এক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট আসন্ন লোকসভা নির্বাচন বেশ কিছু আসনে লড়াই করছে। অত্যন্ত সীমিত আর্থিক সামর্থের মধ্যেও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রতি সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসম্প্রদায় , কৃষক শ্রমিকদের ও দলিতদের চরম ক্ষোভ ও বঞ্চনাকে সম্বল করে নির্বাচনে এই জোট লড়াই দিচ্ছে। শাসকদল যাতে বিজেপি জুজু দেখিয়ে মুসলমানদের ভুল বুঝিয়ে ঐক্যজোট প্রার্থীদের পরাস্ত করতে না পারেন সেজন্য গোড়া থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছে। বেছে বেছে সেইসব আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে যেখানে জোট প্রার্থীদের পক্ষে সংখ্যালঘু মুসলমান , দলিত ও বঞ্চিত মানুষদের ভোট পড়লেও বিজেপি কোনভাবেই বিজয়ী হবে না।

মূল্যবোধ ভিত্তিক সর্ব ভারতীয় দল ওয়েলফেয়ার পার্টির পক্ষ থেকে শেষ পর্যন্ত দু জায়গায় প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জঙ্গীপুর ও কোচবিহারে। বহু বছর ধরে বঞ্চিত অন্যতম সংখ্যালঘু প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে প্রার্থী ওয়েলফেয়ার পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জাতীয় স্তরের সমাজসেবী, রসায়ন বিজ্ঞানে পি এইচ ডি প্রাপ্ত , বিশিষ্ট সাংবাদিক ডঃ এস কিউ আর ইলিয়াস।

গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট যাদবপুর , তমলুক , মথুরাপুর ও দার্জিলিংয়েও প্রার্থী দিচ্ছে । যাদবপুরে তাদের প্রার্থী বেনজির খাতুন। বাংলা বিষয়ে এম, এ বেনজির খাতুন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সম্ভবনাময় প্রার্থী। তাঁর অন্যতম আর একটি পরিচয় হল , দক্ষিন বারাসত কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ও বাংলার মুসলমান এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব , দক্ষিন চব্বিশ পরগনায় অত্যন্ত সুপরিচিত প্রয়াত অধ্যাপক আলহাজ রওশন আলির কন্যা।

তমলুকের প্রার্থী সেখ হামিদুল হোসেন। তৃণমূলের রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে, বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের প্রার্থী হয়েছেন তিনি। সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশানের মতো অরাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সব সময় মানুষের জন্য কাজ করে এসেছেন।

মথুরাপুরে জোট প্রার্থী রাজেন্দ্র প্রসাদ নস্কর । মথুরাপুরের নালুয়ার বাসিন্দা রাজেন্দ্র প্রসাদ ঐ কেন্দ্রের দলিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের কাছে একটি পরিচিত মুখ। ইতিপূর্বে তিনি বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছেন।

দার্জিলিংয়ে জোটের প্রার্থী একদম ঝকঝকে এক তরুন মুখ ওয়াজেদ আলী। শিক্ষাগতযোগ্যতা স্নাতক ও পেশায় কলকাতার একজন ব্যবসায়ী দার্জিলিং লোকসভার ভূমিপুত্র তিনি।

সোসালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া ( এস ডি পি আই) একটি সর্বভারতীয় দল। সারাদেশে তাঁরা 30 টির মতো সিটে প্রার্থী দিচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গে 3 টি সিটে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন। অন্যতম প্রার্থী হলেন তায়েদুল ইসলাম যিনি এস ডি পি আইয়ের রাজ্য সভাপতি ও মুর্শিদাবাদের ভূমিপুত্র।

জোটের অন্যতম শরিক বহুজন মুক্তি পার্টি সারাদেশে 400 বেশী সিটে প্রার্থী দিচ্ছেন । পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের ঐক্যজোটের প্রার্থীদের সমর্থন করবেন ও অন্যান্য কয়েকটি সিটি আলাদা প্রার্থী দেবেন বলে সম্প্রতি কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক প্রেস মিটে একথা জানিয়েছেন ঐ দলের সর্বভারতীয় সভাপতি গুজরাটবাসী মান্যবর মাতাঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গে তাদের পর্যবেক্ষক ভাঞ্জিভাই রাঠোর।

সব মিলিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

(লেখক: অধ্যাপক ও লেখক)