দার্জিলিংয়ের চা পৃথিবী বিখ্যাত, অথচ সেই চা শ্রমিকরাই অনাহারে মারা যায়!

সম্পাদকীয়, টিডিএন বাংলা :

‘উঠলো ঢেউ
জানেনা কেউ
কী আছে তলায়
পাঁক না প্রবাল।’

-কবি শঙ্খচিল এর ছোট্ট এই কটি পংক্তির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বর্তমান ভারত, বিশেষ করে বাংলার রাজনীতি। নির্বাচনের ঢাকে কাঠি এখনও সেই অর্থে পড়েনি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বেজে গেছে যুদ্ধের দামামা। মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য তোলপাড় করে ব্রিগেড ভরিয়ে দিলেন। গোটা ভারত থেকে অ-কংগ্রেসি অ-বিজেপি নেতাদের জড়ো করে বুঝিয়ে দিলেন বিরোধী জোটের নেতৃত্বের অন্যতম দাবীদার তিনিও। মুহুর্মুহু বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ এবং কেন্দ্রে বিজেপি মুক্ত সরকার গড়ার আহবান জানালো  তৃণমূলের ব্রিগেড।

বিজেপি সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও হিংসা বিদ্বেষের রাজনীতি করে দেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। উন্নয়ন ও গঠনমূলক কর্মসূচির ধার না ধরে জঘন্য ধর্মীয় উস্কানির অস্ত্র প্রয়োগ করে দেশকে রাসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা না করে জি.এস.টি.বা নোট বাতিলের মত বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। পরিকল্পিত ভাবে দেশের টাকা বিদেশে রপ্তানি করে সাধারণ মানুষের সর্বনাশ করেছে। দলের লোকের পকেট আর পার্টি ফান্ডে টাকার পাহাড় জমা হয়েছে। এই টাকা দিয়ে তারা কিনে নিতে চায় আগামী লোকসভা নির্বাচনে জেতার সার্টিফিকেট।দাঙ্গা লাগিয়ে, যুদ্ধ বাধিয়ে, ই ভি এম হ্যাক করে যেনো তেন প্রকারে তারা জিততে মরিয়া।

সুতরাং এই বিজেপি কে ঠেকাতে জোট বাঁধার মরিয়া চেষ্টা করা একান্ত জরুরি। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উদ্যোগ প্রশ্ন বিদ্ধ হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে। প্রথমত অ-কংগ্রেসী জোট মানেই তো বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা মায়াবতীর মত আঞ্চলিক নেতাদের উচ্চাকাংখা শেষ পর্যন্ত নিজেদের খেয়ো খেয়িকেই প্রকট করে তুলবেনা? তৃণমূলের ব্রিগেড সমাবেশের পর বরং খুশিই হয়েছিল বিজেপি। আসলে কংগ্রেসকে দুর্বল করাই বিজেপির টার্গেট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সযত্নে সেই কাজটাই করে দিচ্ছিলেন। ব্রিগেডের পর বিজেপির প্রতিক্রিয়া ছিল এই ধরণের জোট কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসলে প্রতিদিন একজন করে প্রধানমন্ত্রী হবে।

সে যাই হোক, ভোট যত এগোতে থাকবে এই ধরণের জোট পাল্টা জোট চলতেই থাকবে। কিন্তু জনগন দেখতে চাইবে প্রত্যেকের আপন আপন ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ও অবস্থান কী। যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লীতে যদি গণতন্ত্র চান তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কতটা গণতন্ত্র আছে সেটাই অন্যতম বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত। অন্তত এতটুকু চেতনা প্রত্যাশা করে গণতন্ত্র। গো রক্ষার নামে মানুষ মারা নিঃসন্দেহে অন্যায় তাই বলে বিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিকে তো সমর্থন করা যায়না। রাজ্যে কর্ম সংস্কৃতির পরিবেশ এখনো সেই তিমিরে। নতূন কর্মক্ষেত্র সৃস্টি করার কোনও উদ্যোগ বা লক্ষণ তো দেখা যাচ্ছেনা।

রাজ্যের লাখ লাখ মানুষ এখনও কর্মের সন্ধানে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলার ভোটাররা ভিন রাজ্য থেকে যখন একের পর এক লাশ হয়ে ফিরে আসছে তখন কী শাষক দলের লজ্জায় মাথা হেট হওয়া উচিত নয়? সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে গঠন মূলক কিছু না করে শুধু ঘোলা জলে মাছ ধরার মানসিকতা কল্যাণকর হতে পারেনা। এই সরকার একটি টার্ম অতিক্রম করে দ্বিতীয় টার্মে । এখনো বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের গল্প শুনানো চলছে। যতই আস্ফালন করা হোক না কেন অলক্ষে তাদেরও যে অনুরূপ ইতিহাস তৈরি হচ্ছে সেদিকে কারো বোধ হয় খেয়াল নেই। শুধু সিন্ডিকেট, আর তোলা বাজি দিয়ে যে রাজ্য চলবেনা এটা শাসক দলের বোঝা উচিত। তা নাহলে শুধু ভাষণ দিয়ে রাজ্য থেকে বিজেপিকে রোখার ভাবনা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুর্শিদাবাদে এখনো একটিও বিশ্ব বিদ্যালয় নেই, মুসলমানদের একান্ত নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আলীয়া বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে সংখ্যালঘুদের নির্মূল করে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকা করা হচ্ছে। মাদ্রাসা সার্ভিস, স্কুল সার্ভিস, প্রাথমিক সর্বত্রই আরাজকতা। রাজ্যে সরকারী প্রতিষ্ঠানে গুন মান সম্পন্ন শিক্ষা আসা করা কল্পনা বিলাস ছাড়া আর কিছু নয়। শুধু মদের দোকান খোলা, পুজো প্যান্ডেলে চাঁদা দেয়াকে কী উন্নয়ন বলে? উন্নয়নের এ কাজকে  উপেক্ষা করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রতিহত করা যাবেনা। যুব সমাজকে ধরে রাখতে গেলে তাদের খোরাক দিতে হবে। শুধু জুজু আর ডান্ডা দিয়ে কাজ হবেনা একথা মাথায় রাখা দরকার।

তৃণমূলের ব্রিগেড এর পরপরই বিজেপির মাঠ দখলের লড়াই মোদী, আমিথ, রাজনাথ থেকে শুরু করে যোগী আদিত্যনাথ পর্যন্ত পাড়ি জমাচ্ছে রাজ্যে। সেখানেও বাংলার উন্নয়নের কথা দূর অস্ত। শুধুই উস্কানী আর উস্কানী।কখনো মতুয়া সমাজ তো কখনো আদিবাসী, আবার কখনো শরণার্থী বাঙালিদের নিয়ে রাজনীতির জল ঘোলা করার চেষ্টা। বিজেপি নেতাদের মুখের উপর যখন জবাব দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন তারা আবার ঝুলি থেকে বের করেছে সেই সি বি আই তাস। এবার রাজনীতির ময়দান পুরো জমজমাট। রাজ্যের পুলিশ কর্তার বাড়িতে সি বি আই হানার প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক তৎপরতা ও মুখ্যমন্ত্রী হয়েও ধর্ণার মত রাজনৈতিক প্রতিবাদের পথ বেছে নেওয়া সত্যিই নজীর বিহীন।

এই রকম এক টানটান উত্তেজনার মাঝে আবার সিপিএম এ নব যৌবনের আগমন।দীর্ঘদিন পর তারা ব্রিগেড ভরতে পেরেছে। দিকে দিকে পার্টি সুসংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু এই ব্রিগেডও কী আশা জাগাতে পারবে নতুন ভোটারের মনে। এখানেও সেই আক্রমন পাল্টা আক্রমণ করে ঘোলা জলে মাছ ধরার চেষ্টা।

দুর্ভাগ্য যে রাজনৈতিক দল গুলোর সাথে সাথে মিডিয়াও ঘোলা জলে মাছ ধরতে ব্যাস্ত। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দিশাহীন রাজনীতিকে দিশা দেওয়ার বিষয়টি ভূলতে বসেছে প্রচার মাধ্যমের বড় অংশ। মহারাষ্ট্রের কমলা বিশ্বের বাজার দখল করলেও দার্জিলিং এর কমলা তা পারেনা কেন? অথচ গুনমানে তো দার্জিলিং অনেক এগিয়ে। পরিকল্পনা আর পরিকাঠামো কবে হবে? দার্জিলিং এর চা পৃথিবী বিখ্যাত। অথচ সেই চা বাগানের শ্রমিক অনাহারে মারা যায় কেন?

ধান, চাল থেকে শুরু করে সরিষা, আম সব মার্কেটে কেন ভিন রাজ্যের ব্যাবসায়ী দের দাপাদাপি। বাংলার চাষিরা কী এখনও সেই দাদনের বোঝা টানতেই থাকবে? এই চক্রব্যূহ থেকে তারা বের হবে কবে? সেই কাজ করার জন্য কোন দলের কী পরিকল্পনা রয়েছে তা দেখা দরকার। জনগন যদি সচেতন না হয়, তারা যদি প্রশ্ন করতে না শেখে তাহলে রাজনৈতিক দল গুলি গুলিয়ে মাছ ধরতেই থাকবে। রাজ্যের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন কোনোদিন হবেনা।

সুতরাং সস্তায় মাত করার পথ ছেড়ে গঠন মূলক রাজনীতির পথে এগোতে সকলকেই সচেতন হতে হবে।

মুহাম্মদ নূরুদ্দীন
(শিশু সাহিত্যিক)