মুহাম্মদ নূরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা: জাতীয় নাগরিক পঞ্জির নামে এখন রাজনীতির বাজার গরম। বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দল গুলি এর থেকে ভরপুর ফায়দা তুলতে মাঠে নেমেছে। বিগত লোক সভা নির্বাচনে কল্পনাতীত ভাবে ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল অনেকটা সংকটে পড়েছিল। কিন্তু এই ইস্যুতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সাহসী অবস্থান দলকে অনেকটা ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।তাই তৃণমূল সুপ্রিমো কোনভাবেই এই ইস্যুকে ঠান্ডা হতে দিতে চাননা। অমিত শাহ, দিলীপ ঘোষরা যতই হুঙ্কার ছাড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার চেয়ে বেশি গলা চড়িয়ে অভয় দেন মানুষের। বিজেপির সাম্প্রদায়িক তাস এ ক্ষেত্রে খুব বেশি কাজ দিচ্ছে না।
ইতিমধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলায় এন আর সি হবেনা। তাঁর এই দৃড় ঘোষণায় অনেকেই সাহস পেয়েছেন, অনেকেই আবার ভরসা রাখতে পারছেন না।আগামী বিধান সভা নির্বাচনে যদি তৃণমূল ক্ষমতায় আসতেই না পারে তাহলে মমতার এ হুঙ্কার কাজে আসবেনা। কিন্তু মানুষের আস্থা ফেরাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কম করছেননা।ইতিমধ্যে বিধান সভায় সর্ব দলীয় বৈঠক ডেকে তিনি এন আর সির বিপক্ষে বিল পাশ করিয়ে নিয়েছেন। তবে মোদি অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি যখন জানালেন এন আর সি নিয়ে কোন কথা হয়নি তখন অনেকটা আশাহত করেছে সাধারণ মানুষকে। বিরোধীরাও এনিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। মুহাম্মাদ সেলিম তো কটাক্ষ করে বলেই ফেললেন ” দিদি কী তাহলে দিল্লীতে গিয়েছিলেন ম্যানেজ করতে? অমিত মমতা কী তাহলে একই লাইনে চলছেন? ” ইত্যাদি ।
আসামে এন আর সির ছোবলে আসলে ক্ষত বিক্ষত হয়েছে, সংখ্যালঘু মুসলিম, আদিবাসী দলিত, মতুয়া নাগা, উপজাতি সকলেই। তাই ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে সব শ্রেনির মানুষকে। পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যে ডজন খানেক মানুষ প্রাণ দিয়েছে। বিজেপি সাধারণ মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করছে আসাম এ যা হয়েছে বাংলাতে তা হবেনা। তারা শুধু মুসলমানদের তাড়াবো বলে আবার সেই বিভেদের রাজনীতি তে হাওয়া দিতে চাচ্ছে।

বিজেপির সস্তা কথায় চিড়ে ভিজবে কীনা তা সময় বলবে। কিন্তু রাজ্যের মতুয়া, দলিত, আদিবাসী সমাজের বুক দুরু দুরু করতে শুরু করেছে। তারা ভালো ভাবেই জানে কাগজ পত্রে যতই অসংগতি থাকুক মুসলমান রা এদেশের ভূমি সন্তান। কিন্তু বাংলা দেশ থেকে আসা মানুষের দলে উল্লেখ যোগ্য কোন মুসলমান থাকবেনা এটা স্বাভাবিক। বিজেপি তাদেরকে যতই আশ্বাস দিক না কেনো ২০১৬ সালে সংসদে যে বিল পেশ করা হয়েছিল তার সামান্য রদ বদল করেও যদি আবার পেশ করা হয় তাহলে ওপার থেকে আসা শরণার্থী দের বাঁচার উপায় নেই বললেই চলে। কেননা, ওই বিল পাশ হলে প্রতিটি শরণার্থী কে প্রমান করতে হবে যে তারা ধর্মীয় অত্যাচার এর কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। একথা প্রমান করতে পারা এক রকম প্রায় অসম্ভব। তা নাহলে, তারা যে দেশের নাগরিক ছিলেন তার নাগরিকত্বের প্রমান পত্র পেশ করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও উভয় সংকটে পড়ার ভয় রয়েছে। বিদেশের নাগরিকত্বের প্রমান দেওয়ার পর এদেশে আসার উপযুক্ত প্রমান পেশ করতে না পারার পরিণাম যে কী হতে পারে তা ভেবে অনেকেই আতঙ্কিত।
সস্তা সাম্প্রদায়িকতার গুলি খাইয়ে বিজেপি হয়তো ম্যানেজ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু ইতি মধ্যে শুরু হয়েছে নানান সচেতনা কর্মসূচি। ধীরে ধীরে মানুষের চোখ খুলছে। এত সহজে আর মানুষকে বোকা বানিয়ে ধোকা দেওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কেন্দ্রের শাসক দল সেটা বোঝেনা বললে ভুল হবে। তাই এখন তারা নতুন রণকৌশল সন্ধান করতে তৎপর।
এখন দেখার বিষয়, বিজেপির প্রলোভনের মুকাবিলায় তৃণমূলের সোজা সাপ্তা, দুর্বল ক্যাডার ভিত্তিক রাজনীতি কতটা কার্যকর হয়। এদিকে সিপিএম, কংগ্রেস এখনও ছাপ ফেলার মত কোন কাজ করতে পারছেনা । মানুষের এই বিপদে সিপিএম যেভাবে পাশে দাঁড়াতে পারত তারা তা করতে পারবে বলে মনে হচ্ছেনা। সিপিএম এখনও সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির ঊর্ধে উঠতে পারছেনা। তাদের এখনও টার্গেট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারা বিজেপিকে রাজ্যের জন্য বিপদজনক মনে করতে পারছেনা। রাজ্যের মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে কীভাবে মোহাম্মদ সেলিমরা যে অস্তিত্ব ধরে রাখবেন তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হচ্ছেনা। অনুপ্রবেশ প্রশ্নে এই মার্ক্সবাদী দলটিও কম সাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দেয়নি। বাংলাদেশ থেকে আসা রিফিউজি দের সব রকম অবৈধ সুযোগ সুবিধা দিয়েছে তারা শুধু ভোট পাবার আশায়। অথচ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলের গন মানচিত্র পাল্টে দেওয়ার জন্য মুসলিম দের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন। মাদ্রাসা গুলিতে সন্ত্রাসের ঘাঁটি তারা দেখতে পেলেন।আজও তাদের সে মানসিকতা কতটা পাল্টেছে বলা মুশকিল।
তারা এখনো নিজেদের দুর্বলতার সঠিক কারণ ধরতে পেরেছে বলে মনে হয়না। তাদের একমাত্র রাগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রতি তাদের রাগ স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনীতি তো রাগ গোসার জায়গা নয়। সঠিক আত্ম বিশ্লেষনের মধ্য দিয়ে নিজেদের সংশোধন করতে না পারলে অবস্থার পরিবর্তন হবেনা। মানুষকে শুধু জুজু না দেখিয়ে প্রকৃত সমস্যার ব্যাপারে মনোনিবেশ করে তার সমাধানে মানুষের পাশে দাঁড়ালে তবেই না মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসবে।

বর্তমানে দেশের সামনে ভয়ংকর বিপদ।সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধে উঠে বৃহত্তর শত্রুর মুকাবিলায় সকলে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে না পারলে ক্ষতি সকলের।