বিশেষ প্রতিবেদন, সামাউল্লাহ মল্লিক : ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯২ ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা একটি তারিখ। ২৪ বছর আগে ডিসেম্বরের কুয়াশা ঘন এক সকালে ভারত ঘুমিয়েছিল, ঘুমিয়েছিল ভারতবাসী। কেউ জানতনা তাদের জন্য সকালের চায়ের সঙ্গে অপেক্ষা করছে একটি ঘৃণ্য সংবাদ। বাবরি মসজিদ আর নেই। থামিয়ে দেওয়া হয়েছে কোটি কোটি ভারতীয় মুসলমানদের হৃদয়ের স্পন্দন। সেই বাবরি মসজিদ যার জন্য শুধু মুসলিমরা না গর্ব করত সমগ্র দেশবাসী। হায়রে আমার মহান ভারত !  কী মহান মোদের ধর্ম। শুধু একটু বিভেদ সৃষ্টির জন্য এই ঘৃণ্য কাজ। সমগ্র বিশ্ব একত্রে বলে উঠেছিল সেদিন ছিঃ ছিঃ ছিঃ !

এইদিনে কিছু উগ্র হিন্দু উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। ভারতের মত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফল ভুগেছিল শুধুমাত্র মুসলমানরাই। এই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে প্রায় ৩৫৬টি শহরে দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয়। এই দাঙ্গায় প্রান হারায় হাজার হাজার মানুষ এবং আহত হয় লক্ষাধিক, যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিল মুসলমান।

এই ঘটনার ১০ দিন পর সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনমোহন সিং লিবারহানের নেতৃত্বে ‘লিবারহান কমিশন’ গঠন করা হয়। এই কমিশন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ৮ কোটি টাকা খরচ করে তাদের ৯০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। এই ১৭ বছরে মোট ৪৮ বার রিপোর্ট জমা দেয়ার সময় বৃদ্ধি করা হয়। পার্লামেন্টে প্রতিবেদন পাঠ হওয়ার আগের দিন অর্থাৎ ২৩ নভেম্বর ২০১০ ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কমিশনের রিপোর্ট ফাঁস করে দেয়, যার ফলস্বরুপ ২৪ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরাম পার্লামেন্টে রিপোর্টটি পড়ে শোনালে তুমুল হৈচৈ শুরু হয়। এমনকি হাতাহাতির ঘটনা পর্যন্ত ঘটে।

কমিশনের এই রিপোর্টে মোট ৬৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, এল কে আদভানী, মুরলি মনোহর যোশি, উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং যাদব, অশোক সিংঘাল, প্রবীণ তোগাড়িয়া, কে এস সুদর্শন, গোবিন্দাচার্য, সংঘ পরিবারের সাবেক নেত্রী উমা ভারতী, শিব সেনা প্রধান বাল ঠাকরে, বিনয় কাটিয়ার, গিরিরাজ কিশোর প্রমুখ। কমিশন জোর গলায় বলে, বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আদভানী বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পরিকল্পনা জেনেও তা ঠেকানোর তেমন কোন পদক্ষেপ নেননি। রিপোর্টে আরো বলা হয়, মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত এবং বাজপেয়ী, আদভানী, যোশিসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতাকে ‘ভুয়া উদারনৈতিক’ আখ্যায়িত করে বাবরী মসজিদ ধ্বংসে ইন্ধন যোগানোর জন্য সরাসরি দোষারোপ করা হয়। রিপোর্টে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের কড়া সমালোচনা করা হয়। মসজিদ ধ্বংসের সময় যেসকল উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ অফিসার নীরবতা পালন করেছিলেন তিনি তাদেরকে অন্যত্র বদলি করেছিলেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিন্দুদের মতে, অযোধ্যার একটি মন্দির ধ্বংস করে ১৫২৮ খৃষ্টাব্দে তদস্থলে বাবরী মসজিদ নির্মাণ করা হয় এবং এ স্থানটি হিন্দুদের দেবতা রামের জন্মভূমি বলেও তারা দাবী করে। বাবরি মসজিদ নিয়ে ১৮৫৩ সালে প্রথম হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয়। ১৮৮৫ সালে হিন্দুরা মন্দির নির্মাণের চেষ্টা করলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ৭৫ জন মুসলমান নিহত হন। ১৮৫৭ সালে হিন্দুরা বাবরী মসজিদের কিছু অংশ দখল করে পূজার জন্য একটি বেদী নির্মাণ করে। ১৯৩৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মসজিদের দেয়াল এবং একটি গম্বুজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দেশ ভাগের পর ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর মধ্য রাতে হিন্দুরা মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করে রাম ও সীতার মূর্তি স্থাপন করে। ১৯৮৪ সালে ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ মসজিদের তালা খুলে দেয়ার জন্য তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী ফয়যাবাদের যেলা জজ সেখানে হিন্দুদের পূজা করার অনুমতি প্রদান করেন এবং তালা খুলে দেয়ার নির্দেশ দেন। এ রায়ের ফলে মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে ‘বাবরী মসজিদ এ্যাকশন কমিটি’ গঠন করে। ১৯৮৭ সালের ১৪ জানুয়ারী পালন করা হয় কালো দিবস। ১৯৮৯ সালে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রভৃতি উগ্রপন্থী হিন্দু দল বাবরী মসজিদস্থলে রামমন্দির নির্মাণের ঘোষণা দেয়। ২ নভেম্বর বিশ্ব হিন্দু পরিষদ পতাকা উড়িয়ে বাবরী মসজিদ দখল করে। ১৯৯০ সালে আদভানী বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির নির্মাণের ঘোষণা দেয় এবং অযোধ্যা অভিমুখে রথযাত্রার আয়োজন করে। এরপর ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা হয়। মসজিদটির কোন ক্ষতি সাধন না করার ব্যাপারে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ সত্ত্বেও প্রায় দেড় লাখ উগ্র হিন্দু সেদিন তা গুঁড়িয়ে দেয়। সে সময় সেখানে ৫০ হাজার ভারতীয় পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

কুলদীপ নায়ার লেখেন ‘সংবিধানকে রক্ষা করার সার্বিক দায়িত্ব সরকারের। মসজিদ ধ্বংস করার আগে নরসিমা রাও সহজেই এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। পক্ষকাল আগে থেকেই সেখানে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির ঘোষণা প্রস্ত্তত করে রাখা হয়েছিল। মন্ত্রীসভায় বিষয়টি অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীসভার বৈঠক ডাকেননি। এর অর্থ হচ্ছে, তিনি এ ব্যাপারে পরোক্ষ সম্মতি বা চোখ বুঁজে থেকে সহায়তা দিয়েছেন। অবশ্য নরসিমা রাও তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, দলের লোকদের চাপের মুখে তিনি যথাসময়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারেননি’।

২০০২ সালের ৫ মার্চ এলাহাবাদ হাইকোর্ট ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ সংস্থাকে বাবরী মসজিদ এলাকায় খননকাজ চালানোর নির্দেশ দেয়। ২০০৩ সালে সংস্থাটি আদালতে ৫৭৪ পৃষ্ঠার জরিপ রিপোর্ট পেশ করে। বিজেপি সরকার তখন ক্ষমতায় থাকায় আদালত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করেনি। যদি হিন্দুদের দাবী সত্য প্রমাণিত হত তাহলে নিশ্চয়ই রিপোর্টটি প্রকাশ পেত। প্রখ্যাত ভারতীয় ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সুরুজ বানের মতে, ‘এএসআই-এর জরিপ রিপোর্টে একথা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাবরী মসজিদের জায়গায় রামমন্দির ছিল না’। তাছাড়া বাবরী মসজিদের ধ্বংসস্তূপে ৫৫টি গর্ত খোঁড়া হলেও সেখানে কোন রামমন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি বাবরী মসজিদের চৌদ্দটি প্রস্তরস্তম্ভও প্রমাণ করে যে,  এখানে  কোন  মন্দির ছিল না।  আবিষ্কৃত অধিকাংশ স্তম্ভের দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ ফুটের (১.৭৩ মিটার) সামান্য বেশী। গোড়ার দিকের ব্যাস সাত ইঞ্চি থেকে সাড়ে দশ ইঞ্চি। চৌদ্দটির মধ্যে একটির গোড়ার ব্যাস ১ মিটার। ড. আর. এস. শর্মা উল্লেখ করেছেন যে, এ প্রকার স্তম্ভ অধিক ভার বহনক্ষম হতে পারে না। এজন্য মধ্যযুগের মন্দিরের পক্ষে অন্তত ৭ ফুট উচ্চতার প্রয়োজন।
বাবরী মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের রুই কাতলারা সেদিন যে সাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার।

                                        সূত্রঃ

১) উইকিপিডিয়া।
২) Kuldip Nayar, Politics of Babri Masjid, The Daily Star, 27th November, 2009।
৩) ড. শর্মার মূল ইংরেজী গ্রন্থের বঙ্গানুবাদ : রামমন্দির না বাবরী মসজিদ (ঢাকা : মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রিসার্চ একাডেমী, ২০০৭)।
৪) মাসিক আত – তাহরীক, ৪র্থ সংখ্যা জানুয়ারি ২০১০।