জানে আলম, টিডিএন বাংলা:  ১০০ থেকে মাত্র ৮ কম। নম্বরটি ৯২। যা শতাংশের তুলনায় যথেষ্ট গরিষ্ঠ। তবুও!  ৯২ শতাংশ  নম্বর পেয়েও অনার্স অমিল। হ্যাঁ ঠিক তাই। উচ্চ মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষায়  ৯২ শতাংশ নম্বর অর্জন করেও লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে ইংরেজি অনার্স মিলছে না। এহেন নম্বরের বহরে স্নাতকে ভর্তির তালিকা ঘিরে  হা-হুতাশ। এই হা হুতাশ একটি বা দুটি কলেজে নয়। খোদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪২টি কলেজের অধিকাংশেই লক্ষনীয়। প্রথম দফার মেধা তালিকা প্রকাশ হতে না হতেই স্নাতকে ভর্তি ঘিরে হতাশার সঞ্চার। এই হতাশার আবেশে কলকাতার ছাড়িয়ে বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ে ভাবি সান্মানিক স্নাতক পড়ুয়ারা আবেশিত। পাস করা  শিক্ষার্থীর ওপর  প্রচণ্ড মানসিক চাপ। প্রত্যেকেই পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়।

বর্তমানে পড়ুয়াদের এত বেশি নম্বর দেওয়া হয় যে বিষয় ভিত্তিক পূর্ণমানের চেয়ে তারা দু-এক নম্বর কম। ফলে ভর্তির মেধা তালিকায় স্কোরের লড়াই। ভালো কলেজ গুলি আবেদনের কাট অফ মার্কস অনেক বাড়িয়ে রেখেও স্বস্তিতে নেয়। কাট অফ মার্কসের চেয়েও অনেক বেশি নম্বর পাওয়া পড়ুয়ারা আবেদন করছে। প্রথম দফার ভর্তি তালিকায় ৮০ শতাংশ মানে লেটার মার্কস পেয়েও যারা মেধা তালিকায় ডি লিস্ট। তাঁরা কি খুবই খারাপ মেধার পড়ুয়া? আসন সংখ্যা সীমিত?  তাঁদের মনে প্রশ্ন – এত নম্বর পেয়েও কি ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ মিলবে না?  ভালো কলেজে ভর্তি! সে গুড়ে বালি!

বিভিন্ন কলেজর বিষয় ভিত্তিক কাট আপ নম্বর আশির উর্দ্ধে। লেডি ব্রেবোর্নে গণিত ৮০ হলেও ইংরেজি ৯২ , বঙ্গবাসী ভূগোল ৯০ জুলজি ৮০,  জয়পুরিয়া কলেজ ফিজিক্স ৮৫ বাণিজ্য ৮৫, জ্যোতিষ রায় কলেজ জুলজি ৮৬ ইংরেজি ৮২ । বঙ্গবাসী কলেজে ৯০ শতাংশ নম্বর পেয়েও ভূগোলে, জ্যোতিষ রায় কলেজে ৮৬ শতাংশ নম্বর পেয়েও জুলজি তে ভর্তি হতে না-পারা পড়ুয়া সংখ্যার তালিকা দীর্ঘতর । হেরম্বচন্দ্র কলেজে বিকম (অনার্স) প্রথম তালিকায় শেষ নামটি যাঁর, তাঁর শংসাপত্রে ৮৮ শতাংশ স্কোর। আর লেডি ব্রেবোর্ন গণিতে ও বঙ্গবাসী কলেজের জুলজির  ক্ষেত্রে ৮০ তেই ইতি। ফলে ভর্তি হতে না-পারা পড়ুয়ার সংখ্যা অনেক।

নম্বরের আধিক্যের ফলে আজ কলেজে ভর্তি ঘিরে হতাশার প্লাবন। বাংলায় সিবিএসই ও আইএসসি কে টেক্কা দৌড়। ছাত্রছাত্রীকে এত বেশি নম্বরের দেওয়ার ফলে খুব ভালো, ভালো এবং মাঝারি মানের পড়ুয়া মূল্যায়ন করা কঠিন। পাশাপাশি ভর্তি সংকট বর্তমান। পড়ুয়াদের প্রাপ্ত নম্বরের ঢলের ধাক্কায় প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই সহজ কথা নয়। ফলে মেধা তালিকা থেকে ছিটকে যাচ্ছে প্ৰকৃত মেধাবীরা। স্বাভাবিক কারণেই পড়ুয়া ও অভিভাবক মহল উৎকণ্ঠায়।

তবে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কারন রাজ্য জয়েন্টের ফল এখনো বেরোয়নি। পাশাপাশি প্রেসিডেন্সি ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে প্রবেশিকা পরীক্ষা হয়নি। জয়েন্টের ও  প্রবেশিকা পরীক্ষা ফল প্রকাশের পর  সায়েন্সে বিষয়ে পরের দফায় কাট আউট কিছু টা নামলেও  নামতে পারে। কিন্তু  কলা ও বাণিজ্যের পড়ুয়াদের পাশাপাশি  মাঝারি ও সাধারণ মানের ছাত্রছাত্রীদের কলেজ ও পছন্দের বিষয় পেতে বেগ পেতে হবে। এই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলেরও।

মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে মে মাসে। বিভিন্ন মাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেল, বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের ফল আকাশ ছোঁয়া হয়েছে। এও জানা গেল, এই চরম ভালো ফলের মূল কারণ-জাতীয় স্তরের বোর্ড গুলির সাথে পাল্লা। আর এই পাল্লা দিতে গিয়ে আজকাল বাংলায় পরীক্ষায় মুড়ি মুড়কির মতো নম্বর দেওয়ার হিরিং উঠেছে। তাতে শিক্ষার মান মাঠে মারা যাক। তাতে কি ? ভালো রেজাল্ট তো মিলছে। তাহলে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য কি পরীক্ষায় ভাল ফল করানো,  নাকি মনুষত্ব অর্জন করা?

পরীক্ষায় ভালো নম্বর তোলা মানেই শিক্ষার্থীর সফলতা! সব সময় কিন্তু তা হয়না। ভালো ফল তোলা মানে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ভালো তাও বলা যাবে না। মার্কস তোলার হার ঊর্ধ্বগতি। শিক্ষার মানের বিষয়টি সেই গতি নিশ্চিত করে না, খতিয়ে দেখা দরকার, শিক্ষার মান কতটা বেড়েছে। পাসের হার বেড়েছে নাকি কমেছে, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। মূল বিবেচ্য হলো শিক্ষার মানের বিষয়টি। অনস্বীকার্য যে, বিশ্বায়নের এই যুগে সবক্ষেত্রেই পরীক্ষায় ঢালাও নম্বর শিক্ষার্থীরা কাঙ্খিত যোগ্যতা অর্জন না করেই ভালো ফল করছে। তারা যদি মনুষত্ব অর্জন না করে। তাহলে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একি হাল? এ ভালো ফলের আনন্দ উৎসব ও সংবর্ধনা সর্বনাশ ডেকে আনবে আগামী প্রজন্মের জন্য।

আমাদের শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন। ‘‘জ্ঞান অর্জন ছাড়া পাসের উৎসব’’ অর্থ হীন। ভালো রেজাল্ট ও  শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেই বলা যাবে না যে, শিক্ষার মানোন্নয়ন হচ্ছে। তবে অনস্বীকার্য! ইতিমধ্যে শিক্ষায় যথেষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত। বটে কিন্তু, তাতে তৃপ্তির জোয়ারে গা ভাষালে হবে না।, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যের নিরসন ঘটাতে হবে। শহরের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ব্যবধান শূন্য করতে হবে। বলতেই খারাপ লাগে যে এই ডিজিটাল যুগেও এখনও পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কমছে কই? ফলে আমরা ভালো ফলাফল পাচ্ছি কিন্তু মেধাবী পাচ্ছি না। ঢালাও নম্বরে বাজারে ছেলেমেয়েরা আদৌও কিছু শিখছে কি?

মোটা অঙ্কের নম্বর কাঁধে করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পর শুর হয় ইঁদুর দৌড়। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইত্যাদি লক্ষ্যে ছুটে। সঙ্গে  বড় বড় সার্টিফিকেট। ভালো চাকরিও পেয়ে যায়। তারপর টাকা অর্জনের প্রতিযোগিতায় ভুলে যায় মানবতা। মানুষ হওয়ার গুণাবলিও  অর্জন করা একান্ত জরুরি। পাসের ফলাফল দিয়ে শিক্ষার্থীর মানবতা যাচাই কঠিন কেবল মেধা যাচাই করা যায়। আবার যারা সত্যিকার অর্থে এই অবস্থার মধ্যেও বিজ্ঞান ও গণিতে ভাল করছে, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যাগ্রিকালচার কিংবা সাধারন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল ভাল বিষয়ে ভর্তি হচ্ছে। সেখানেও কৃতিত্বের সাথে পাশ করছে। পাশ করার পর আবার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের সরকারী চাকুরিতে যোগদান করছে।

এর পেছনে সরকারের উন্নয়ন মুখী প্রকল্প যথেষ্ট।  মানবতাহীন সর্বোচ্চ স্কোর সরকারের এতসব শিক্ষা মুখী প্রকল্প কে অন্তসারশূন্য করে দিচ্ছে। আবার ক্ষমতার বাহুবলে যখন-তখন প্রশ্নপত্রের ধরন পাল্টানো, লাগাম হীন প্রশ্নপত্র ফাঁস, সরকারি সুবিধাভোগী শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য, পাঠ্যবই পরিবর্তনের নামে প্রশ্নবিদ্ধ পরিবর্তন, শিক্ষক সংকট ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিক্ষা কে মানবতা বিমুখ করে উলছে। ইহা ভালো ফলাফল অর্জন না জনকল্যাণ বাস্তবমুখীতা টের পাচ্ছে বর্তমান ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ও অন্যান্য সরকাররি কর্মকর্তা দের দেখে। দরকার কোয়ালিটি এডুকেশন।

কোয়ালিটি এডুকেশন কোথায়? ভালো নম্বর তোলা শিক্ষার্থীদের আচরনে কি সত্যিকারের মানবতা লক্ষনীয়? এরা কি বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর ছোটদের প্রতি স্নেহশীল? না কেবল বিষয়ে ভাল হয়ে ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর  ডাক্তার হবে এবং শুধু নিজের ছা মানুষ করবে আর ডাক্তার শুধু রোগ আর ঔষধের নাম জানবে কিন্তু জানবে না সত্যিকারের মানবতা।  শিক্ষার্থীদের শুধু উচ্চ নম্বর প্রাপ্তির ব্যবস্থা ও নিশ্চয়তা  কতটা যুক্তিযুক্ত । স্কোর তুলুক! দুঃখ নেই।  কিন্তু  তার পাশাপাশি সামাজিক দক্ষতা, মানবতা, প্রয়োজনীয় মানবিক গুণাবলী ইত্যাদি গুরুত্ব দিতে পড়াতে হবে। সেই নৈতিক শিক্ষা দান করা হোক যা  সার্টিফিকেটের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার পরশ এনে দেবে। ব্যর্থতা শিক্ষার নয়, ব্যর্থতা শিক্ষার নীতি নির্ধারকদের।

শুধু ভালো স্কোর তোলা পড়ুয়াদের নিয়ে মাতামাতি করলে কম নম্বর তোলা শ্রদ্ধাশীল পড়ুয়ারা হীনমন্যতায় ভুগবে। শিক্ষা মানব মনের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিক্ষাই সেই শক্তি যা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অপশক্তি ও বিশৃঙ্খলতা দূর করতে সাহায্য করে। সে কারণে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের মূল শর্ত শিক্ষিত মানুষের হার বৃদ্ধি করা। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন বাস্তবায়িত হয় এবং শিক্ষার প্রায়োগিক উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা না হয়। কোচিং নির্ভর, প্রাইভেট নির্ভর, গাইড নির্ভর শিক্ষা নিয়ে কতদূর অগ্রসর হওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। এ সব রাহু থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধনের দিকে এগুতে হবে। তাতেই জাতির মঙ্গল হবে। আমাদের পশ্চিম বাংলা হাঁটছে স্বপ্নের পথে, হয়ে উঠছে সোনার বাংলা। বাংলা আজ আর কোন দিকে পিছিয়ে নেই। উন্নয়ননের  ঊর্ধ্বগতি ফলে অন্যদের কাছে বাংলা হয়ে উঠছে ঈর্ষণীয়।

এবারে পাশের হারে অতীতের যাবতীয় রেকর্ডকে ছাপিয়ে ৮৬.২৯ শতাংশ ছাত্রছাত্রী উত্তীর্ণ। যা গতবারের তুলনায় ২.৫৪ শতাংশ বেশি।। অবাক বিষয় যে ১৩৭জন প্রথম দশজনের মেধা তালিকায় । উচ্চ মাধ্যমিকের ইতিহাসে যা সর্বকালীন রেকর্ড। এ বার ৬০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেয়েছেন ৪২.৩৯ শতাংশ। যা গতবারের তুলনায় দুই শতাংশেরও বেশি। এক কথায় পরীক্ষার ফলাফল ঈর্ষনীয় । ফল ভাল হয়েছে মানেই  কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীরা সেই পর্যায়ের মেধাবী তা ভাবাটা সব সময় সত্য নাও হতে পারে। এত নম্বর নিয়ে পাশ করেও  মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পড়ুয়া দল।  ফলাফলের ইঁদুর দৌড়। সিলেবাসের একগুচছ বিষয়, তারমধ্যে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৯০ শতাংশ  উচ্চতর গ্রেড পাওয়া মানেই  কিন্তু পরীক্ষা পদ্ধিত কতটা মানসম্মত  বলতে পারিনা।

মানসম্মত শিক্ষা মানে কি নামিদামি কলেজ পড়া? মানসম্মত শিক্ষা মানে কি সকলে সব বিষয়ে এ প্লাস বা গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া? নাম্বার তুলার বহরে লাগাম না দিলে,  ছাত্রছাত্রীর যোগ্যতা ভিত্তিক অসামঞ্জস্য নম্বর প্রদান  খুব ভালো, ভালো এবং মাঝারি মানের পড়ুয়া মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে এবং ভর্তি ঘিরে হতাশার  পাশাপাশি দিন দিনপ্ৰকৃত মেধা অন্ষেষণ তলানিতে ঠেকবে। পরীক্ষার ফলে বেশি বেশি নম্বর প্রদান । যা বুঝা যায়, শিক্ষা ও ফল সম্বন্ধে আজকাল আমাদের মনে একটা অসন্তোষ জন্মাচ্ছে। এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষাকে আমাদের বাহন করিলাম না, শিক্ষাকে আমরা বহন করিয়াই চলিলাম।’

লেখক:
প্রধান শিক্ষক
নূর জাহানারা স্মৃতি হাই মাদ্রাসা
ফারাক্কা, মুর্শিদাবাদ