তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : এলেন বুদ্ধদেব, এলেন না কানহাইয়া, মিছিলে স্লোগানে মুখরিত সমাবেশ, উপচে পড়া ভিড়, লালে লাল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। অতএব ঘুরে দাঁড়াবে বামেরা? ব্রিগেডের পর এই প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে বাংলার বাতাসে। বামেদের ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা। তাই কানহাইয়া কুমারকেও আনার চেষ্টা করেছিলেন বাম নেতারা। কিন্তু শারীরিক কারণে তিনি শেষপর্যন্ত আসতে পারেননি। তবে অসুস্থ শরীর নিয়েই এলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দীর্ঘদিন তিনি বাড়ির বাইরে বের হননি। অসুস্থতা উপেক্ষা করেই ব্রিগেডের সমাবেশে হাজির থাকলেন। গাড়িতে বসেই শুনেলন পরের পর বক্তৃতা।
২০১৫ সালে শেষ ব্রিগেড সমাবেশে প্রাধান বক্তা ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সময় গড়িয়েছে। তিনি এখন অসুস্থ। তবু তাঁকে এনে বাজিমাত করতে চেয়েছিল বামেরা। শেষপর্যন্ত তিনি আসতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় ছিল বামেদের মধ্যেই।

শেষ রবিবার সকালে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি জানিয়ে দন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনেই ব্রিগেডে আসবেন বুদ্ধদেব। মঞ্চে উঠতে পারেননি তিনি। মঞ্চের সামনে তাঁর গাড়ি রাখা হয়। সেই গাড়িতে বসেই তিনি বক্তৃতা শোনেন। প্রায় আধঘণ্টা থাকার পর বাড়ি ফিরে যান। সভায় পাঠ করা হয় তাঁর বার্তা। ঘুরে দাঁড়ানো ডাক। সত্যিই এই ব্রিগেডে ভর করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বামেরা, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
অতীতে বিভিন্ন সময় এই ব্রিগেড বামেদের অক্সিজেন দিয়েছে। সেই কারণে বাম নেতারা দাবি করেছিলেন, কানায় কানায় পূর্ণ হবে ব্রিগেড। রাজ্য়ের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট ছোট মিছিল সকাল থেকে ব্রিগেডমুখী হয়েছে। ধামসা মাদল বাজিয়ে ছোট ছোট দল ব্রিগেডে এসেছে। যেভাবে সমাগম হয়েছে, তাতে আহ্লাদিত হতেই পারেন বাম নেতারা। তাঁদের মধ্যে উদ্দীপনার কোনো কমতি ছিল না।

বদলের ডাক দিলেন সীতারাম ইয়েচুরি। তাঁর কথায়, মোদী দেশকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাংলা ও দেশে বদল আসবেই। আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর তীব্র আক্রমণে উঠে এল জিএসটি থেকে নোট বাতিল প্রসঙ্গ। গণতন্ত্রকে হরণ করা হচ্ছে, বললেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। সবমিলিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে নিশানা করলেন পরের পর বাম নেতারা। প্রশ্ন হল, এত কিছুর পর সত্যিই কি ব্রিগেডে ভর করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বামেরা? কলকাতার ব্রিগেড। বিভিন্ন সময় সাক্ষী থেকেছে বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরার। এই ব্রিগেডকে ঘিরে বারেবারে আবর্তিত হয়েছে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতি। ১৯ জানুয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে ব্রিগেড সমাবেশ হয়। সেদিন বিরোধী জোটের ঐক্যবদ্ধ ফটোফ্রেম বিরল মুহূর্ত তৈরি করে।

জাতীয় স্তরে বিরোধীদের জোট তুলে ধরতে ব্রিগেড প্যারেড ময়দান অতীতে ইতিহাস তৈরি করেছিল। আজও যা আলোচ্য। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং তখন কংগ্রেস ভেঙে জনমোর্চা তৈরি করে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের এক মঞ্চে আনার প্রধান কারিগর হয়ে উঠেছেন। লালুপ্রসাদ যাদবের পরামর্শে জ্যোতি বসু বিরোধী নেতাদের নিয়ে ১৯৮৮ সালের ২ জুলাই ব্রিগেডে ভিপি সিংকে সম্বর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেই মঞ্চে ছিলেন বিজেপির শীর্ষ নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ীও। বিশাল জমায়েতে ভিপিকে মাঝখানে রেখে হাতে হাত রেখে জোট গড়েছিলেন জ্যোতি বসু ও বাজপেয়ী। দেশের রাজনৈতিক অ্যালবামে হাজার ছবির ভিড়ে এই মুহূর্ত হারিয়ে যায়নি। স্থান সেই ব্রিগেড, যাকে কেন্দ্র করে সেদিন তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বারেবারে ব্রিগেডে সভা করেছেন, ব্রিগেড ভরিয়েছেন। বামেদেরও এমন ইতিহাস আছে। মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূলনেত্রী হওয়ার আগে যুব কংগ্রেস সভানেত্রী থাকাকালীন একার চেষ্টায় ব্রিগেডে সিপিএম বিরোধী সভা করে নজর করেছিলেন তিনি। বামেদের পালে এখন ভাটার টান। বামেরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলবে। যদি কিছুটা গতি পায় তাঁদের অবরুদ্ধ চাকা, তাহলে এই ব্রিগেডেই আজকের দিনে লেখা থাকবে আর একটা ইতিহাস।