রোকাইয়া খাতুন, টিডিএন বাংলা : বন্যা। তবে এ বন্যা রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের প্রেয়সী বন্যা নয়। এ বন্যা বিভীষিকাময়। প্রকৃতির ক্রুর আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মানব অস্তিত্ব। বাস্তুভিটে, সহায়-সম্বল হারিয়ে মানুষ হয়ে পড়ে নিঃস্ব। খাদ্য-বস্ত্র-বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনাহারে কাটতে থাকে দিন।

উচুঁনিচু ভূমিভিটে অথৈই জলে অস্তিত্বহীন। মাঠভরা ধান, সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত  দিশেহারা পানির গর্ভে আকন্ঠ নিমজ্জিত। প্রকৃতির মনভোলানো রূপ এখন আতঙ্ক স্বরূপ।

 

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব সর্বস্ব খুইয়ে যখন জীবনধারণে বিপন্ন তখন তাদের ভোটাস্ত্রে ক্ষমতায় আসীন মানুষগুলো মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে আরাম বিলাসে মত্ত। ভোটের সময় হাত জোড় করে হাসিমুখে বিনয়ের সাথে ভোট চাইতে আসা নেতারা প্রাসাদপুরীর এসি ঘরে বসে আশ্বাসবাণীর ভাওতা বুলি আওড়াচ্ছেন। মুখের কথা শুধু অমৃতবাণী হয়েই থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না বন্যা কবলিত অসহায় মানুষদের কাছে।
যেখানে সরকারের পৌঁছানো উচিত সর্বাগ্রে সেখানে সরকারের তরফ থেকে কোন সাহায্য পাচ্ছে না বলে দাবি করেন বন্যা দুর্গত মালদাবাসীরা। সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে বার বার আবেদন করেও কোনো সাহায্য তারা পাচ্ছে না। স্থানীয় প্রতিনিধিদের ডাকে কোনভাবে সাড়া দিচ্ছেন না তাদের উপরমহলের গদিতে বসা নেতা–মন্ত্রীরা। জনগণের দুর্দশার সময় রাজনীতির রং ছেড়ে বিবেকের যন্ত্রনায় অন্তত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু মানুষের রক্ষকের দায়িত্বে থাকা মানুষগুলি বিবেকের দরজায় তালা বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে এই অসহায় মানুষদের কাছ থেকে। বারবার বন্যার দাপটে ভেঙে যায় বাঁধ। মহানন্দা তার করাল গ্রাসে জীবনের স্বপ্নগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কেন এর কোন স্থায়ী সমাধান করা হয় না? এ প্রশ্ন দুর্গত মানুষ ও সাধারণের মধ্যে থেকেই যায় কিন্তু হয় না কোন সমাধান। বন্যা আসে ভেঙে দিয়ে যায় সাজানো সংসার আর সরকার থাকে নিশ্চুপ নিশ্চল। কারণ হয়ত বা বন্যাকবলিত মানুষগুলো সংখ্যালঘু।

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাত ধরে সামান্য যা ত্রান পাচ্ছে তাতে কোন রকমে খেয়ে না–খেয়ে দিন কাটচ্ছে তাদের। জীবনের বিষময় পরিস্থিতিতে বড়রা যখন তিতিবিরক্ত তখন ছোটদের অবস্থা আরও সঙ্গীন। কোলের শিশুরা পর্যাপ্ত মায়েদের বুকের দুধ পাচ্ছে না, পাচ্ছে না বিশুদ্ধ পানীয়টুকুও। জীবনযন্ত্রণায় থেকে থেকে শুধু আর্তনাদ ভেসে আসছে চর্তুদিক থেকে। ছোট শিশুদের পড়ার জন্য নেই উপযুক্ত পোশাক। ছেঁড়া–ফাটা পোশাক পরে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

 


আসন্ন ইদে নতুন পোশাকের পাওয়া তো দূর একটা ভালো পোশাকও জুটছে না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছে অনেকেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অসুস্থ রোগীদের নিয়ে দূর হাসপাতালে পাড়ি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জীবন হয়ে উঠছে বিষময়।

প্রতিবার বর্ষা আসে আর ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাদের অস্তিত্বকে। ভাঙনপাড়ের মানুষদের ভেঙে যায় মন। আবার ভূমি শুকিয়ে গেলে নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে জীবনযুদ্ধে লড়াকু এই মানুষগুলো।