মুহাম্মদ নুরুদ্দীন, টিডিএন বাংলা : সন্ত্রাস, জাতি হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সংকট।সন্ত্রাসের থেকেই জন্ম হয় সন্ত্রাসের, হিংসা পাল্টা হিংসার পথ দেখায়, বিদ্বেষ গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই সকল মানবতা বিরোধী, শান্তি বিরোধী সংহতি বিরোধী উপকরণ গুলিকে উপড়ে ফেলতে হলে যে হৃদয় বত্তা, উদারতা, মানাবিকতা ও দৃঢ়তা দরকার তা দেখাতে সক্ষম হয়েছে নিউজিল্যান্ডের প্রধান মন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন। তাই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান যথার্থই বলেছেন- নিউজিল্যান্ডকে দেখে শিখুক বিশ্ব।

হিংসা যে হিংসার জন্ম দেয় তার নিকটতম উদাহরণ সাম্প্রতিক নিউজিল্যান্ডের দুই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। খবরে প্রকাশ অস্ট্রেলিয়ান সন্ত্রাসী ব্রেন্টন মসজিদে এই নারকীয় হত্যা চালিয়েছে ২০১৭ সালের একটি হিংসার প্রতিশোধ নিতে। ২০১৭ সালের ৭ই এপ্রিল উজবেকিস্তান এর এক জঙ্গী সুইডেনের স্টকহোম শহরে গুলি চালিয়ে ৮ জনকে হত্যা করে। এই নিষ্ঠুর হত্যায় একারল্যান্ড নামক ১১ বছর বয়সের এক শ্রবণ প্রতিবন্ধী নিহত হয়। ব্রেন্টন নাকি সেই হত্যা কাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে এই হত্যা চালিয়েছে। ১৫ মার্চ ছিল সেই কিশোরের জন্মদিন। তাই জন্মদিনেই তার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায় সে।তবে কার্য কারণ সূত্র যাই হোক বিশ্ব জুড়ে পরিকল্পিত ভাবে সৃষ্টি করা ইসলাম ফোবিয়া এই ধরণের নিরাপরাধ মানুষ হত্যার অন্যতম কারণ।

আজকের জেসিন্ডা আর্ডেন যে ভূমিকা পালন করেছেন সেদিন যদি বিশ্ব নেতৃত্ব এই ভূমিকা পালন করতে পারতেন তাহলে হয়তো বিশ্ব পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য জনক হলেও প্রতিটি ছোটো বড় সন্ত্রাসী হামলার সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রাষ্ট্র নায়ক থেকে শুরু করে প্রচার মাধ্যমের বড়ো অংশ সংকীর্ন সাম্প্রদায়িক মানসিকতা ও পরিকল্পিত বিদ্বেষের আশ্রয় গ্রহণ করে। ইনিয়েবিনিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করা হয় সমস্ত হিংসার মূলে আছে মুসলমানরা। তারাই বিশ্ব জুড়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এমন কী কোন তথ্যের ধার না ধরেই দাবী করা হয় মুসলমানরা সন্ত্রাসী। এমনকি জোরে সোরে প্রচার করা হয় সন্ত্রাসের পিছনে আছে ইসলাম ও কুরআন। কুরআন নাকী সন্ত্রাসে উৎসাহী করে, তাই মুসলমানরা ধর্মীয় কর্তব্য জ্ঞান করে বিশ্ব জুড়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করে চলেছে।

নিউজিল্যান্ডের প্রধান মন্ত্রী এই অপপ্রচার ও বিদ্বেষের যোগ্য জবাব দিয়েছেন। শুধু মৌখিক সমবেদনা নয় তিনি এক একটি পদক্ষেপ নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন একজন যোগ্য সৎ মানবতাবাদী নিরপেক্ষ শাসকের কী করা উচিৎ। বিশ্বের অন্যতম এই প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সন্তান প্রসব করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি অন্য ধাতে গড়া। বস্তুবাদ আর পাশ্চাত্যের ভোগবাদী রাজনৈতিক দর্শন তাকে স্পর্শ করেনি। সন্তানের মা হওয়ায় তাঁর মধ্যে মাতৃত্ব আর মমতায় ভরপুর একটি হৃদয় আছে যা তাকে ‘মাদার অফ হিউম্যানিটি’র পর্যায় উন্নীত করেছে।

মসজিদে বর্বর হামলার পর প্রথম জুমআ’র নামাজ আদায় করেছে নিউজিল্যান্ডবাসী। সেই জুমআয় খুতবার আগে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর একটি হাদিসের উদ্ধৃতি করে বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক উদারতা, সমবেদনা এবং সহানুভূতিতে বিশ্ববাসীরা একটি শরীরের মতো। যখন শরীরের কোন একটি অংশ ব্যথা পায় তখন পুরো শরীরই সেই ব্যথা অনুভব করতে পারে।

তিনি মুসলিমদের মতো হিজাব পরেন ও তার পাশের অন্য সব মহিলারাও হিজাব পরে মসজিদে উপস্থিত ছিলেন। ক্রাইস্টচার্চের হামলার এক সপ্তাহ পর আজ সেখানকার বেশিরভাগ নারীই মাথায় হিজাব পরে নিহতদের স্মরণ করেছেন। জুমআ’র নামাজ পড়িয়েছেন ইমাম গামাল ফৌদা। তিনি বলেন, কয়েক লাখ মানুষের মনে আঘাত দিয়েছে হামলাকারী। কিন্তু আজ ওই একই স্থানে আমি ভালোবাসা এবং সমবেদনা দেখতে পাচ্ছি।

তিনি বলেন, আমাদের মন ভেঙে গেছে কিন্তু আমরা ভেঙে পড়িনি। আমরা বেঁচে আছি, একত্রে আছি। কাউকে আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে দেব না। গত সপ্তাহে আল নুর মসজিদে ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন ফৌদা। ওই হামলার পর প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন এই দিনটিকে দেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন।

হামলার পরের সপ্তাহে স্থানীয় সময়ে শুক্রবার জুমাআ’র নামাজ আদায় করেছেন মসুল্লিরা। এ সময় মুসলিমদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টার দিকে আজান এবং জুমার নামাজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এবং রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দুই মিনিট নীরবতাও পালন করেছে নিউজিল্যান্ডের মানুষ।

জেসিন্ডা অর্ডান শুধু মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতি দেখাননি। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের টেলিফোন বার্তার জবাব দিয়ে বলেছেন, আমার কোন সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আপনি আপনার ইসলাম বিদ্বেষ বন্ধ করুন।জাতি বিদ্বেষ বন্ধ করে মানবতাবাদকে তুলে ধরুন। এটাই হবে সবচেয়ে বড় সাহায্য। জেসিন্দার ভূমিকায় প্রভাবিত হয়ে মার্কিন সিনেটর ক্যালেফোর্নিয়া মসজিদে বক্তব্য রাখেন।

মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি মসজিদে মুসলমানদের সমর্থনে বক্তব্য রেখেছেন। নিউজ্যিলান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে উগ্র শ্বেতাঙ্গ কর্তৃত্ববাদী সন্ত্রাসীর গুলিতে অন্তত ৫০ মুসল্লি নিহত হওয়ার পর স্যান্ডার্স মুসলমানদের সমর্থনে এ বক্তব্য রাখলেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে স্যান্ডার্স বলেন, “এই কঠিন সময়ে আমাদের উচিত সব ধরনের ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এই অবস্থা শুধু আমেরিকাতেই দেখছি না কিংবা বিশ্বের নির্দিষ্ট কোনো অংশে দেখছি না বরং এ প্রবণতা আমরা দেখছি বিশ্বের সবখানে।”

ক্যালিফোর্নিয়া মসজিদে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখার পর স্যান্ডার্স সেখানকার ইসলামিক সেন্টার পরিদর্শন করেন। অনুষ্ঠানে মুসলিম আলেমসহ বিভিন্ন ধর্মের নেতারা ও সাধারণ লোকজন উপস্থিত ছিলেন। আগামী ২০১০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বোচনে বার্নি স্যান্ডার্স প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি ডেমোক্র্যাট দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেও প্রাথমিক ভোটে হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে যান।