মনোরঞ্জন ব্যাপারী

মনোরঞ্জন ব্যাপারী, টিডিএন বাংলা: আমার প্রচুর বন্ধু বান্ধব আছেন যারা কেউ বাঙালী নন। যারা বাংলার বাইরে থাকেন, আর হিন্দি ভাষাতেই কথা বলেন। মাঝে মাঝেই তারা আমাকে বিভিন্ন সেমিনারে নিয়ে যান। নিজের কথা বলার জন্য সম্মানীয় মঞ্চ দেন। সেখানে বাংলায় নয় , আমি হিন্দিতেই বক্তব্য রাখি। এই মাত্র মুম্বাইয়ের এক সেমিনারে যাবার আমন্ত্রণ ও প্লেনের টিকিট এসে গেল । যেতে হবে ২১ সেপ্টেম্বর। ওনারা যখন ডাকেন তখনই যাই। কারন আমি বাংলার চাইতে ভারতের অন্যপ্রদেশের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা সম্মান আদর অনেক বেশি পেয়েছি। আর- বাংলায় আমার তীব্র বিরোধী একদল মানুষ আছে কিন্ত বাংলার বাইরে – অন্য ভাষার মানুষের মধ্যে তেমন একজনও নেই। অন্তত; আমার তেমন নজরে আসেনি । ফলে তারা হিন্দি বলেন বা বাংলার বাইরের লোক সে কারনেই আমি তাদের বিরুদ্ধে নই-থাকতে পারি না।

হিন্দি আমার বাংলার মতই একটি অতি প্রিয় ভাষা । মুন্সি প্রেমচাঁদ,ফনীশ্বরনাথ রেনু , হরিশংকর পরসাই আর শ্রীলাল শুক্ল আমার প্রিয় লেখক। যিনি হিন্দি জানেন কবি হরিবংশরায় বচ্চনের ‘মধুশালা ’ পড়ে মুগ্ধ হবেন না এমন মানুষ পাওয়া ভার । কবি ভারভারা রাও আমার প্রানের মানুষ । সমাজসেবীদের মধ্যে যাদের আমি অনেকবেশি শ্রদ্ধা করি তারা হলেন স্বামী অগ্নিবেশ, মেধা পাটেকর ,অভিনেতাদের মধ্যে নাসি্রুদ্দিনশাহ, স্মিতা পাতিল, ওমপুরি, শাবানা আজমি।

আর একটা ব্যাপার- আমি তো ধরতে গেলে বাংলারই কেউ নই । আমাকে- আমার গোটা পরিবারকে তো কবেই এই বাংলা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে । এবং সেটা কোন হিন্দিভাষী করেনি । করেছে এই বাংলারই একদল ধুর্ত রাজনেতা । এখন আমার পরিচয় প্রবাসী বাঙালী। দন্ডকারন্যের ঘনঘোর জঙ্গলে- আদিবাসী মানুষদের মধ্যে আমার আবাস । তাদের ভাষা গোণ্ডি, ছত্তীসগঢ়ি ।
আমি এই বাংলায় যে সব মানুষ ইউপি বিহার থেকে এসে কলে কারখানায় খেটে সৎভাবে জীবন যাপন করেন, বাংলা ও বাঙালী সমাজ সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা অপমান করেন না, মছলিখোর বলে বাঙালীকে ঘৃনা নিন্দা করেন না, সেই সব শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে নই। আমার নেতা শংকর গুহ নিয়োগী যাদের জন্য জীবন দিয়েছেন তারা কেউ বাঙালী ছিলোনা । সব ছত্তীসগঢ়ি আদিবাসী ।
কিন্ত আমি সেই সব হিন্দিভাষীর তীব্র বিরোধী যারা আমাদের উপর জোর করে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করছে । আমি সেই সব রাজনেতাদের তীব্র বিরোধী যারা ভাষা আর বদ ভাবনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে । যারা আমাদের বাঙালী জাতিকে খন্ড বিখন্ড করে দেবার চতুর খেলা খেলছে । যারা তাদের ক্ষমতালিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য দেশভাগ করেছে- সাধারন মানুষের কথা মোটেই ভাবেনি, আর আজ দেশভাগের বলি সেই অসহায় নির্ধন নিম্নবর্ন মানুষকে বিনা অপরাধে এনআরসি নামক এক দমন মূলক আইনে এনে – জেলখানায় বন্দী করতে চাইছে । কোন শর্তেই এদের সঙ্গে কোন ‘সমঝোতা’ করা যায় না । দেশের স্বার্থে , মানুষের স্বার্থে , নিজের স্বার্থে জেহাদ ঘোষনা করতেই হবে। যে বা যারা ওই অশুভ শক্তির পক্ষে দাঁড়াবে তাদের বিরুদ্ধে লড়তেই হবে । সে আমার যতই আপন হোক জাতের হোক প্রদেশের হোক তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে । এদের ক্ষমা করা দয়া দেখানো শুধু অন্যায় নয়, ভয়ংকর পাপ হবে।
(লেখক চণ্ডাল জীবন গ্রন্থের প্রণেতা ও বিশিষ্ট দলিত নেতা। লেখকের অনুমতি ক্রমে তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে লেখাটি নেওয়া)