তিয়াষা গুপ্ত, টিডিএন বাংলা : ভারতের আকাশে কি মুক্তি খুঁজে পাবে না এই দেশের মেয়েরা? আর একটা আন্তর্জাতিক নারী দিবস চলে এল। এই দেশের বুকে কেমন আছে মেয়েরা? এই প্রশ্ন সহজ, আর উত্তরও অনেকের কাছেই জানা। দেওয়ালে কার্যত পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। ঘরে-বাইরে কোথাও ভালো নেই ভারতের মেয়েরা। অন্তত পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। উদ্বেগের পারদ বিপদ সীমার উপর দিয়ে বইছে।

মেয়েদের বিরুদ্ধে ঘটতে থাকা হিংসা সমাজের বুকে একটা কলঙ্ক। সেই কলঙ্ক ঘোচাতে বহু রাষ্ট্রেরই তেমন বিশ্বাসযোগ্য তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায় না। আর এই ব্যাপারে ভারতের অবস্থা বোধহয় সব থেকে করুণ।

তা নাহলে, যুদ্ধদীর্ণ আফগানিস্তান নয়, সিরিয়া নয়, সোমালিয়া নয়, সৌদি আরবও নয়, মেয়েদের জন্য ভারতই পৃথিবীতে সব থেকে বিপজ্জনক দেশ বলে চিহ্নিত হবে কেন?
অন্তত ‘টমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন’র সমীক্ষায় তেমনটাই তো উঠে এসেছে।

এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল ২০১১ তেও। তখনকার চতুর্থ স্থানে থাকা ভারত নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙে ২০১৮ তে শীর্ষে পৌঁছে গেছে। অবশ্য এই ‘সুনাম’ অর্জনে ভারতকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারণ সমীক্ষাই বলে দিচ্ছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ র মধ্যে ভারতে মেয়েদের প্রতি অপরাধ বেড়েছে ৮৩ শতাংশ! এবং দেখা যাচ্ছে প্রতি ঘণ্টায় চারটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

পৃথিবীতে বোধহয়, এমন কোনো জায়গাই নেই, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ। কি ঘরের ভেতরে, রাস্তাঘাটে, কি স্কুল-কলেজে, কাজের জায়গায়, কি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে। এমনকি হাসপাতালেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। এই সবের সঙ্গে আবার নবতম সংযোজন – অনলাইনের হিংসা।

এখন এমন একটি সকালও তো আসে না যে, প্রভাতি সংবাদপত্রে একই দিনে পাতায় পাতায় পুড়িয়ে মারা সহ নানা ভাবে মেয়েদের ওপর নির্যাতন এবং যৌন অত্যাচারের বিবিধ ঘটনা চোখে পড়ে না, যেখানে শিশু থেকে প্রবীণা কেউই বাদ যাচ্ছে না। সব থেকে দুঃখের যে, যাবতীয় হিংসার ঘটনা বেশিরভাগই ঘটে ঘরের মধ্যে।
জানা যাচ্ছে যে, ভারতে প্রতি ৩ জন মেয়ের মধ্যে একজনই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ঘরের ভিতর। যেমন ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্টই বলছে, গত এক দশক সময়ের মধ্যে ঘণ্টায় ৩৯ অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। এও দেখা গেছে সেই সব অপরাধের মধ্যে ৩৩ শতাংশই হল স্বামী ও তার পরিজনদের দ্বারা সংঘটিত। আর নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৮৮ শতাংশ।

যুগের পর যুগ ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের জিন বাহিত ওই হিংসা প্রবণতা পরিবারে, সমাজে নির্বিকারে বিরাজ করছে। কোনো জন-সচেতনতা, কোনো প্রচার কর্মসূচিই যেন এক্ষেত্রে নিষ্ফল।

এই ব্যাপারে আইন প্রয়োগে সরকারের ব্যর্থতার কথা যত কম বলা হয়, ততই ভালো। কারণ, দোষী সাব্যস্ত করতে পারলে তবে তো সাজা। সেটাই মুশকিল! সেই পথে যে পাহাড় প্রমাণ বাধা। অর্থসহ যত রকমের ক্ষমতা, যত ভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব, তা করা হয় অপরাধীদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য।

সমাজে যদি কিছুমাত্র মুক্ত বাতাস বয়ে যেত, তাহলে বিভিন্ন দেশের অন্তত ৬০ কোটি ৩০ লক্ষ মহিলা মনে করতেন না যে, গার্হস্থ্য হিংসা কোনো অপরাধই নয়। তা না হলে আমাদের জানতে হত না, গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে ১০ কোটিরও বেশি কন্যা ভ্রূণ হারিয়ে যাচ্ছে।

সারা পৃথিবীতে প্রায় ৬ কোটি নাবালিকাকেও বসতে হত না বিয়ের পিঁড়িতে। এবং বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বছরে যে প্রায় ৮ লক্ষ মানব পাচার হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশই হত না নারী ও বালিকা।

আর রাষ্ট্র? কী তার ভূমিকা? ক্ষমতাসীনরা তো মনে করে এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই নয়। কারণ আর যাই হোক, মেয়েদের প্রতি ক্রমবর্ধমান হিংসা অত্যাচার তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। তাই এই নিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতাই দস্তুর।

নারী দিবস আসে, আবার যায়। ৮ মার্চ সকালে খবরের কাগজের পাতায় দৃপ্ত কলম চালান অনেকেই। সংবাদমাদ্যমে নারীদের ওপর হিংসা নিয়ে ঝড় ওঠে। এই একটা দিন অন্তত টিভি চ্যানেলে মেয়েদের পক্ষে চিৎকারের সুযোগ পান অনেকে। তারপর আবার সব থিতিয়ে যায়। আবার সব একই তিমিরে।