Representative
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস

সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস, টিডিএন বাংলা: নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ পাশ হয়ে আইনে পরিণত হলো। বলা হচ্ছে এবং উদ্বাস্তুদের মধ্যে অনেকে মনে করছেন যে, এবার তারা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন। আবার অন্যদিকে মুসলমানরা ভাবছেন যে, এই আইনের জন্য তারা বেনাগরিক হয়ে যাবেন, তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে বা ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে।

আমি মনে করি এই দুই অংশের দুই চিন্তা ভুল হচ্ছে। ২০১৯ সালের এই আইনে তিনটি শর্ত রাখা হয়েছে যার মধ্যে দুটি শর্ত উদ্বাস্তুদের অধিকাংশ মানুষ পূরণ করতে পারবেন না, তাই নাগরিকত্ব অর্জন তাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে। বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য শর্ত দুটি হলো— তারা যে বাংলাদেশ বা পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন তার প্রমাণপত্র দাখিল করা এবং তারা যদি ধর্মীয় কারণে অত্যাচারের শিকার হয়ে থাকেন বা তার ভয়ে দেশত্যাগ করে থাকেন, তার প্রমাণপত্র দাখিল করা। মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক লিখিতভাবে জেপিসি-কে জানিয়েছে যে, নাগরিকত্ব পেতে হলে অবশ্যই উদ্বাস্তুদের এই প্রমান দাখিল করতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আরো জানিয়েছে যে উদ্বাস্তুদের উচিত ছিল নির্যাতিত হয়ে ভারতে এসে থাকলে এসেই তা ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিসে জানানো। যারা তা জানান নি, এখন তাদের পক্ষে ধর্মীয় নির্যাতনের কথা প্রমান করে কঠিন। তবুও কেউ যথেষ্ট প্রমাণপত্র ও এফিডেভিট সহকারে আবেদন করলে ‘র’ সেই দাবি তদন্ত করে দেখবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক লিখিতভাবে জানিয়েছে। মোদি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক আরো জানিয়েছে যে, ৩১৩১৩ জন এভাবে ধর্মীয় নির্যাতনের কথা জানিয়েছে, তাই, এই আইন বলে তারা নাগরিকত্ব পাবেন। সম্ভবত এই ৩১৩১৩ জনের প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ। এই আইন মূলত তাদের জন্য।– সেজন্য আমার মনে হয় এই আইনে বাঙালি উদ্বাস্তুরা নাগরিকত্ব পাবেন না। তাদের মিথ্যা আশা ত্যাগ করে বিকল্প ভাবনা দরকার।

অন্যদিকে, এই আইনের জন্য ভারতীয় মুসলমানরা ভয় পাচ্ছেন। তাদের ভয়ের কারণ বি জে পি নেতাদের হুংকার যে তারা অনুপ্রবেশকারী অজুহাতে মুসলমানদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবেন। আর একই সাথে কায়দা করে তৃণমূল, সি পি এম, কংগ্রেসও মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে জয় করার জঘন্য কৌশল নিয়েছে। তারা যত বলছে এই আইন ভয়ংকর, সাম্প্রদায়িক, তাই কার্যকরী হতে দেব না ইত্যাদি — তত মুসলমানরা বেনাগরিক হওয়ার আতংকে ভুগছেন, রাস্তায় নেমে পড়ছেন।

কিন্তু এই আইনের মুসলমানদের কোন ভয় নেই বা ভারতীয় হিন্দু-আদিবাদী, শিখ কারুর সুবিধা বা লাভের কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ কোনভাবে এই আইন ভারতের নাগরিকদের উপর প্রযোজ্য নয়। এই আইন শুধু ভারতের প্রতিবেশী তিন দেশ থেকে আসা অমুসলিম অনুপ্রবেশকারী, যারা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন, তাদের জন্য। এই আইনে তাদের অনুপ্রবেশকারী তকমা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র। তারা নাগরিক– এসব কিছু বলা হয় নি এবং তারা নাগরিকত্ব পাবেন না। বি জে পি তাদের ধাপ্পা দিয়ে ভোট আদায় করতে চায়। এখানে বলা দরকার এইসব হিন্দু, মতুয়াদের আইন করে অনুপ্রবেশকারী করা হয় বিজেপির অটল বিহারী মহাশয়ের রাজ্ত্বকালে।

কেউ কেউ ভাবছেন এন আর সি এবং এই আইন বোধহয় অবিচ্ছেদ্য। ঠিক তা নয়। ২০০৩ সালে এন আর সি করার আইন হয় পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে। ৫/৭ দিন আগে হওয়া এই আইনের আগেই তা কার্যকরী হয় অসমে। ২০১৯ সালের এই আইন সংসদে ফেল করলেও এন আর সি করায় কোন বাধা ছিল না। আর যারা এন আর সি করতে দেব না বলছেন, তারা কিন্তু সংসদে এন আর সি করার নির্দেশ দেওয়া ১৪এ ধারা বাতিল করার দাবি তোলেন নি। তাই তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ একটা থেকেই যায়। আর এন আর সি থেকে বাদ পড়া হিন্দুরা ২০১৯ এর আইনে নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন; মুসলমানরা ডিটেনশন ক্যাম্পে পচবেন— এসব কষ্ট কল্পনা। বাদ পড়া হিন্দুরা এই আইনের সুযোগ কী করে পাবেন! মূল ভারতীয়দের কাগজপত্র না থাকার জন্য বে নাগরিক করা সহজ কাজ বলে আমার মনে হয় না। সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে হিন্দু- মুসলমান একসাথে লড়তে হবে।

এই আইনটি কোন ভাবে ২০১৪ সালের বেড়া টপকাতে পারবে না। এবং তা ভারতীয় নাগরিকদের উপর প্রয়োগ করার কোন পথ নেই। এই আইনে বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী নামে এক কাল্পনিক জনগোষ্ঠীকে বাদ রাখা হয়েছে। যদিও আমি মনে করি হিন্দু, শিখ— এভাবে উল্লেখ না করে উদ্বাস্তু বা দেশভাগের শিকার এসব শব্দ লেখা উচিত ছিল। কিন্তু কয়লা ধুলেতো ময়লা যায় না, ওরা ওদের মত করেছে! আমি মনে করি এসব শব্দ নিয়ে আপত্তি জানিয়েও বেশি দূর না এগোনো ভালো। প্রায় দেড়/দুই কোটি মানুষ অনুপ্রবেশকারী তকমা থেকে মুক্তি পাচ্ছে, এটাকে সদর্থক ধরে তারা যাতে নাগরিকত্ব পান তার জন্য আওয়াজ তোলা উচিত এবং এভাবে বি জে পি-র উদ্বাস্তু দরদী মুখোশ উন্মোচন করা দরকার। কাল্পনিক বাংলাদেশি মুসলমান(যেহেতু কোনও মুসলিম বাংলাদেশ থেকে আসেনি এবং মুসলিমরা এখানকার ভূমিপুত্র) দরদ দেখাতে বি জে পি-র পালে হাওয়া তুলে দেওয়ার ভুল পথ থেকে বেরিয়ে আসা দরকার।
উন্মোচন করা দরকার- বি জে পি যদি সত্যি উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দিতে চাইতো তাহলে তাদের ভিত্তি বছরের আগে যারা এসেছেন তাদের নাগরিক ঘোষণা করতো, আবেদন করে নাগরিকত্ব অর্জনের গোলক ধাঁধাঁয় আটকে দিত না। সব শর্ত ইত্যাদির কথা বাদ দিলেও ভেবে দেখুন দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের আবেদন পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দিতে কত সময় লাগবে! কেউ কি জীবদ্দশায় নাগরিক সার্টিফিকেট পাবেন? অথচ অমিত শাহ বলছেন ২০২৪ সালের মধ্যে এন আর সি করবেন। তাই উদ্বাস্তুরা এন আর সি তালিকার বাইরেই থেকে যাবেন। আসলে দলিত উদ্বাস্তু হিন্দুদের নিয়ে রাজনীতির খেলা শুরু হচ্ছে।
(লেখক হিন্দু বাঙালি উদ্বাস্তু আন্দোলনের প্রবীণ নেতা ও লেখক)