সাইয়েদ আজহারউদ্দিন

সায়েদ আজহারউদ্দিন, টিডিএন বাংলা: সরকারের নীতি এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় পক্ষেরই রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করা কোন দিকে থেকেই ভুল নয়, যদি তারা ভ্রান্তির মধ্যে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, সমালোচনা সর্বদা দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের সহায়ক অঙ্গ হিসেবে পর্যালোচিত হয়ে থাকে। তবে খেয়াল রাখা উচিত শুধুমাত্র সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা কোনও কাজে আসে না, রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার আয়োজন করাও জরুরি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসতে পারে এবং কিছু সময় পর আবার চলে যেতে পারে। কোন রাজনৈতিক দলই তার অস্তিত্বের নিশ্চিত স্থায়িত্ব দিতে পারে না। তবে নীতি, আইন, বিধি সর্বদা অব্যাহত থাকে এবং এই সমস্ত বিষয়বস্তু নাগরিকদের সরাসরি প্রভাবিত বা সহায়তা করে।

করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ অংশ লকডাউনের অধীনে রয়েছে, মানব ইতিহাসে এ জাতীয় পরিস্থিতি নতুন নয়। মানব প্রজন্ম পূর্বেও এটির মুখোমুখি হয়েছিল এবং এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়েও এসে পুনরায় তার জাতিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। লকডাউন হওয়ার ফলে কৃষিকাজ, বস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি, চিকিৎসা সহ প্রতিটি খাতেই সংকটাপন্ন অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে। ইতিমধ্যে সাধারণ নাগরিকদের উপর এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে। এমতাবস্থায় সরকারী এবং বেসরকারী সংস্থাগুলির এই বিষয়ে অবশ্যই ভাবা উচিত।

সংকট পরিচালনার সমাধানগুলি নিয়ে আলোচনা করার আগে আসুন “সংকট” এর বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করি। সংকট বলতে আসলে কী বোঝায়? এটি একটি কষ্ট বা গুরুতর বিপদ বা বাধা বা করুণ অবস্থা বা প্রভাবশালী ব্যাধি।

সংকটটি কীভাবে ঘটে বা প্রসারিত হয়?

প্রাথমিক সতর্কতা সম্পর্কে রাজ্য এবং এর অংশীদারদের অসতর্কতার কারণে, প্রাথমিক পর্যায়ে সঙ্কট মোকাবেলায় সংস্থানগুলি ব্যবহার না করার ফলে অনেক সময় এই সংকট বৃহত্তর স্তরে সম্প্রসারণ ঘটে এবং এক বিরাট শোচনীয় অবস্থার প্রস্তুতি নিতে থাকে।

সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে গৃহীত ব্যবস্থাপনা:
ব্যক্তি বা সংস্থা বা রাষ্ট্রকে সমস্যাজনক সময় থেকে রক্ষা করার বা সংরক্ষণ করার জন্য অথবা সংকট সামাল দেওয়ার জন্য মানবজাতি সাধারণত যে সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা ভোগ করে তা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে। সংকট পরিচালনার সময় সংকট মোকাবেলার জন্য বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। ব্যক্তি বা সম্প্রদায় বা রাষ্ট্র যদি সংকটকে যথাযথভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ব্যর্থতা বিপর্যয় বা কঠিন বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

COVID-19 এর পরিস্থিতিকে সামনে রেখে বলা যেতে পারে, এই রকম কঠিন সংকট থেকে সম্পূর্ণ রুপে না মুক্ত হতে পারলে অথবা ব্যাপারটি গুরুত্বহীনতার সাথে অবলোকন করলে তাৎক্ষণিক ব্যথানাশকের মতো অসম্পূর্ণ অথবা অস্থায়ী ভাবে পরিস্থিতির উপশম ঘটালেও পুনরায় যখন এই সংকটাপন্ন অবস্থার আগমন ঘটবে তখন অবস্থা আরো অধিক পরিমাণে ক্ষতি যে সাধন করবে এ ব্যাপারে এক প্রকার নিশ্চয়তা দেওয়া যেতে পারে।

উত্তরণ:
১. সুরক্ষাবাদী হওয়ার পরিবর্তে সম্পদগুলি ভাগ করুন:
লকডাউনের ফলে সৃষ্ট এই কঠিন মুহুর্তে প্রতিবেশী, দৈনিক মজুরি উপার্জনকারী, বেসরকারী কর্মচারীরা এক অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে খুব সহজেই এই কঠিন অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ সম্ভব হবে।

২. সীমাবদ্ধ সরঞ্জাম সহ সংকটে সংস্কার: হযরত ইউসুফ(আঃ) বহু আগে মিশরে একটি সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি সংস্কারবাদী নীতি প্রবর্তন করেছিলেন। পরিকল্পিত কর্মসূচিটি ছিল চারটি অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে ভারসাম্য: উৎপাদন, খরচ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় বিনিয়োগ (সঞ্চয়ের অংশ)। তিনি প্রতিটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন; নীতিগত ভাবে কোন কিছুকেই অবহেলা না করে নির্ধারিত নীতি, উপায়, পদ্ধতি এবং পরিকল্পনার সময়সূচী (কার্যকর করার জন্য) সহ তিনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

মিশরের রাষ্ট্রপতি কে দেওয়া হযরত ইউসুফ(আঃ)এর এই সমাধানের উপায়ের পিছনে থাকা দর্শনটি হল, “তোমরা সাত বছর পর্যন্ত লাগাতার চাষাবাদ করতে থাকবে। এ সময় তোমরা যে ফসল কাটবে তা থেকে সামান্য পরিমাণ তোমাদের আহারের প্রয়োজনে বের করে নেবে এবং বাদবাকি সব শীষ সমেত রেখে দেবে।তারপর সাতটি বছর আসছে বড়ই কঠিন। এ সময়ের জন্য তোমরা যে শস্য জমা করবে তা সমস্ত এ সময়ে খেয়ে ফেলা হবে। যদি কিছু বেঁচে যায় তাহলে তা হবে কেবলমাত্র সেটুকুই যা তোমরা সংরক্ষণ করবে।”(আল কোরআন)

৩. কৃষিক্ষেত্রের সুরক্ষা: খাদ্য হ’ল প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা এবং এটি অনেক রাজ্যের অর্থনীতিরও মেরুদণ্ড। বৃহত্তর চাষাবাদ ছাড়াও লকডাউনের অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে জনগণকে স্বল্প স্তরে গৃহ-ভিত্তিক কৃষিকাজ শুরু করতে হবে, তা হয় শাকসব্জী, ফলমূল, শস্য ইত্যাদি। বিশেষত গ্রাম্য অঞ্চলে অনেকেরই উর্বর জমি থাকতে পারে; এটি এমন চাষের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে যা স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্যগুলিই পূরণ করার সাথে সাথে অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সোনিয়া গান্ধী পরামর্শ দিয়েছিলেন, “২১দিনের লকডাউনের এই সময় ফসল কাটার মৌসুম। মার্চ শেষে বেশিরভাগ রাজ্যে কৃষকরা ফসল কাটার জন্য প্রস্তুত হয়। ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৬০% কৃষিক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, তাই কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত খাদ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য কৃষি ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে পরিকল্পনা নেওয়া এবং তার সাথে MSP এর মাধ্যমে শস্যদানা সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ছয় মাসের জন্য কৃষকদের পুনঃপ্রাপ্তি স্থগিত রাখা যায়, নিঃসন্দেহে খুবই সহজ ভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে।

৪. ক্ষুদ্র মাপের শিল্পকে সহায়তা করা: কোভিড -৯ মহামারীজনিত কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও একটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে। সরকারের নিশ্চিত হওয়া উচিত যে এসআইডিবিআই কর্তৃক এসএমইগুলিকে অনুকূল শর্তাদির মাধ্যমে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে কী সুবিধা লাভ হতে পারে তা পর্যালোচনা করা। বৃহৎ সংস্থাগুলিও বন্ড বাজারে অর্থ জোগাড় করে এবং তা সরবরাহ করার মাধ্যমে ছোট সরবরাহকারীদের তহবিলক সচল রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যেমন ভাবে রঘুরাম রাজন (প্রাক্তন, আরবিআই গভর্নর) প্রকল্প গ্রহণ করেছেন । কৃষক, ক্ষুদ্র বিক্রেতারা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সুদমুক্ত ঋণ, লাভ এবং লোকসান ও শেয়ার হোল্ডার ইত্যাদি সমস্ত সম্ভাব্য ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে দৃঢ়তার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মহামারী পরবর্তী অবস্থা স্বল্প সময়ে মধ্যে খুব সহজভাবে স্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

৫. উপলব্ধ সংস্থানগুলির যথাযথ ব্যবহার: সময়ের প্রয়োজনের ভিত্তিতে কোভিড -১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তহবিলকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে (ক) বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল এবং উভয় রাজ্যে ও কেন্দ্রের আধিকারিকদের রাজ্য, দেশ এবং বিদেশী ভ্রমণের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ কে লকডাউন চলাকালীন অবস্থায় সরাতে হবে। (খ) রাজ্য এবং কেন্দ্র প্রকল্প প্রচারের জন্য সড়কের ধারে হেডিংগুলির জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা দ্রুত সরাতে হবে যেহেতু লকডাউনের সময় জনগণ রাস্তা চলাচল করতে অক্ষম। (গ) রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় সরকার এবং পিএসইউ দ্বারা কমপক্ষে দুই বছরের জন্য মিডিয়া বিজ্ঞাপনগুলিতে (বৈদ্যুতিন, প্রিন্ট এবং সামাজিক মিডিয়া) সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। (ঘ) পরীক্ষা পরিচালনার জন্য তহবিল প্রশাসনিক ব্যয়ের জন্য অনুমোদিত বেসরকারী স্কুলগুলিতে পরিবর্তন মাধ্যমে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের জন্য কমপক্ষে ৩০% ফি হ্রাস করা উচিত।

গ্রাম দত্তক নেওয়া. একটি গ্রামকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করা: যদি প্রতিটি বিধায়ক বা এমএলএ, সংসদ সদস্য (রাজ্যসভা এবং লোকসভা উভয়), শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সেলিব্রিটি (চলচ্চিত্র ও ক্রীড়া) এবং এনজিওর লোকেরা কমপক্ষে তিন বছরের জন্য কোনও গ্রামকে দত্তক নেন, সমগ্র দেশের মধ্যে সর্বত্র সর্বনিম্ন ১৫,০০০ গ্রাম বা এলাকা বিকাশ লাভ করতে সক্ষম হবে এবং এটি বিশ্বের কাছে একটি দুর্দান্ত উদাহরণ হতে পারে।

একইভাবে বিভিন্ন বিভাগগুলি সম্ভাব্য সমস্ত উপায়ে সঙ্কট সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারে, সন্দেহ নেই যে স্বাস্থ্য খাতকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়; প্রতিটি সম্ভাব্য সমর্থন এবং প্রয়োজনীয়তা প্রদান করা আবশ্যক। আসুন, সংকটের সময়ে একে অপরকে সমর্থন করার জন্য, আসন্ন প্রজন্মকে শান্তিপূর্ণ, বিদ্বেষ মুক্ত এবং ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করার জন্য এগিয়ে আসি।

( লেখক দিল্লির বিশিষ্ট প্ৰান্ধিক। অনুবাদ: আফরিদা খাতুন আঁখি)